নজরুল যেভাবে পর্দার আড়ালে থেকে বদলে দিয়েছিলেন সিনেমার ভাষা

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

বাংলা সিনেমার ইতিহাস আলোচনায় কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে এক ধরনের নীরবতা আছে। কবি, বিদ্রোহী সত্তা ও সংগীতজ্ঞ হিসেবে তাকে নিয়ে যত লেখা হয়, বাংলা চলচ্চিত্রের আবেগী ভাষা তৈরিতে তার ভূমিকা নিয়ে অত কথা হয় না।

অথচ সত্যিটা হলো, বাংলা সিনেমা যেভাবে প্রেমের কথা বলতে শিখেছে, যেভাবে বিদ্রোহকে দেখেছে, যেভাবে গানকে শুধু বিনোদন না ভেবে গল্পের অংশ বানিয়েছে—তার সবকিছুতেই গভীরভাবে মিশে আছেন নজরুল।

তিনি এই কাজ করেছিলেন অনেকটাই পর্দার আড়াল থেকে।

তাকে নিয়ে ভাবলে প্রথমেই সিনেমার মানুষের ছবি মাথায় আসে না। আসে কবির ছবি। হারমোনিয়ামের সামনে বসে থাকা একজন মানুষ। কখনো সুরে সুরে বিদ্রোহ লিখছেন, কখনো প্রেম, কখনো ইসলামী সংগীত, কখনো শ্যামাসংগীত। কিন্তু ঠিক এই মানুষটিই বাংলা চলচ্চিত্রকে এমন এক আবেগী শক্তি দিয়েছিলেন, যা পরে পুরো উপমহাদেশের সিনেমায় ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলা চলচ্চিত্রে প্রাথমিক পর্বে একটি স্বকীয় ভাষার প্রয়োজন ছিলো। সেই সময়ের অভিনয়ে মঞ্চনাটকের ভারও ছিল প্রবল। সংলাপ ছিল কৃত্রিম, আবেগ ছিল অনেকটা ঘোষণা করে বলার মতো। আর গান? বেশিরভাগ সময় গল্প থামিয়ে আলাদা করে বসানো হতো। যেন গল্প একদিকে, গান আরেকদিকে।

নজরুল এই বিভাজনটা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, মানুষের এমন কিছু অনুভূতি আছে, যা শুধু কথায় ধরা যায় না। প্রেমের অস্থিরতা, আকাঙ্ক্ষার কম্পন, ভেতরের দহন—এগুলোকে গভীরভাবে বহন করতে পারে কেবল সুর। ফলে তার কাছে সিনেমার গান হয়ে উঠেছিল চরিত্রের গোপন ভাষা।

বাংলা সিনেমা পরে যে গাননির্ভর আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে বিশাল এক ঐতিহ্য তৈরি করে, তার ভিত্তি গড়ে উঠছিল তখনই। ‘ধ্রুব’ (১৯৩৪) কিংবা ‘বিদ্যাপতির’ (১৯৩৭) মতো ছবিতে নজরুলের সংগীত চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থাকে বর্ণনা করেতো। সংলাপে যা বলা যাচ্ছে না, গান সেটা বলত।

নজরুলের গল্পে নির্মিত বিদ্যাপতি (১৯৩৭) সিনেমার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

আজকের দর্শকের কাছে এটা খুব স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সময়ের উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রে এটা ছিল বড় পরিবর্তন।

আবার নজরুল শুধু গানই লেখেননি। কাহিনীকার হিসেবে বাংলা সিনেমাকে নতুন ধরনের আবেগিক ভাষার সঙ্গেও পরিচিত করিয়েছিলেন তিনি।

নজরুলের আগে প্রেমের ভাষা অনেক সময় বেশি পরিশীলিত, দূর্বোধ্য ও অলঙ্কৃত ছিলো। নজরুল প্রেমকে শরীরের কাছে নিয়ে এলেন। তার প্রেমে ঘাম আছে, অস্থিরতা আছে, কামনা আছে, ধ্বংস আছে। তার প্রেমিক শুধু অপেক্ষা করে না, পুড়ে যায়। তার নারীরা নীরব না থেকে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। এই আবেগ পরবর্তী বাংলা চলচ্চিত্রের প্রেমের ভাষাকে বদলে দেয়।

খেয়াল করলে দেখা যাবে, বাংলা সিনেমার সবচেয়ে স্মরণীয় প্রেমগুলো খুবই তীব্র। সেখানে প্রেমের মধ্যে ভয় আছে, ক্ষুধা আছে, হারিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক আছে। এই আবেগের সাংস্কৃতিক ভিত তৈরি হয়েছিল নজরুলের হাত ধরেই।

নজরুল বাংলা শিল্পে আবেগকে ‘নিরাপদ’ জায়গা থেকে বের করে এনেছিলেন। এই কারণেই তিনি সিনেমার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন।

সিনেমা মূলত আবেগের শিল্প। ক্যামেরা মানুষের মুখের যত কাছে যায়, আবেগ তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নজরুলের লেখার ভেতরে সেই আবেগের দুরন্ত প্রকাশ ছিল। তার ভাষা মানুষের শরীর ও স্নায়ুর ভেতরে ঢুকে যেত।

সাংস্কৃতিক মিশ্রণের সাহস দিয়েও বাংলা চলচ্চিত্রকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছিলেন নজরুল। তিনি এমন এক সময়ের মানুষ, যখন পরিচয়ের দেওয়াল ছিলো খুব শক্ত। মুসলিম শিল্পী মানে আলাদা ঘরানা, হিন্দু পুরাণ মানে আলাদা জগৎ, শাস্ত্রীয় সংগীত মানে আলাদা অভিজাত পরিসর। নজরুল এই দেয়ালগুলোকে প্রায় জোর করেই ভেঙে ফেলেছিন।

তিনি ইসলামী সংগীত লিখলেন। আবার শ্যামাসংগীতও লিখলেন। আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করলেন, আবার সংস্কৃতঘেঁষা ভাষাও ব্যবহার করলেন। তার সুরে যেমন রাগসংগীত আছে, তেমনই আছে বাউলধর্মী মাটির সুর, সৈনিকদের পদচারণার ছন্দ, মধ্যপ্রাচ্যের সুরের টান, আবার পাশ্চাত্য বাদ্যের অনবদ্য গতি।

নজরুলের গল্পে নির্মিত বিদ্যাপতি (১৯৩৭) সিনেমার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত 

আজকের ভাষায় এটাকে মিশ্রধারা বলা যায়। কিন্তু নজরুলের সময় এই কাজ ছিলো সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। সিনেমা এই বিদ্রোহ থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিল।

কারণ চলচ্চিত্র নিজেই বহু শিল্পের সমষ্টি। এখানে সংগীত আছে, সাহিত্য আছে, দৃশ্য আছে, অভিনয় আছে। নজরুল খুব আগেই বুঝেছিলেন, ভবিষ্যতের জনপ্রিয় শিল্প হবে এমন এক শিল্প, যা আলাদা আলাদা সাংস্কৃতিক ধারাকে একসঙ্গে টেনে আনবে।

বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীত পরে যে এত বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে, তার পেছনেও এই মানসিকতা কাজ করেছে।

কিন্তু সম্ভবত নজরুলের সবচেয়ে সিনেম্যাটিক দিক ছিলো তার দৃশ্য নির্মাণের ক্ষমতা। নজরুলের কবিতা ও গল্প পড়লে কিংবা গান শুনলে অনেক সময় মনে হয়, শব্দগুলো স্থির না। এগুলো চলছে। দৌড়াচ্ছে। হঠাৎ থেমে যাচ্ছে। আবার বিস্ফোরিত হচ্ছে। তার লেখার ভেতরে এমন এক গতি আছে, যা অনেক সময় দৃশ্যের অনুভূতি তৈরি করে।

ঝড় নিয়ে লেখা হলে মনে হয় সত্যিই চারপাশ কাঁপছে। প্রেমের লাইন পড়লে মনে হয় ধীরে ধীরে কারও চোখের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিদ্রোহের কবিতা পড়লে মনে হয় দূর থেকে হাজার মানুষের পদধ্বনি ভেসে আসছে।

তিনি শব্দ দিয়ে দৃশ্য তৈরি করেছিলেন। এই কারণেই তার ভাষা এত সহজে সিনেমার সঙ্গে মিশে যেতে পেরেছিল।

নজরুলের লেখার ভেতরে আলো আছে, অন্ধকার আছে, গতি আছে, আগুন আছে। তিনি যখন বিদ্রোহ লেখেন, মনে হয় পর্দা কাঁপছে। যখন প্রেম লেখেন, মনে হয় খুব কাছে কারও নিঃশ্বাস শোনা যাচ্ছে। এই দৃশ্যমানতার শক্তি বাংলা চলচ্চিত্রকে নতুন ধরনের আবেগিক গতি দিয়েছিল।

ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু বাংলা সিনেমায় নজরুলের প্রভাব সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় সেসব জায়গায়, যেখানে তার নামই নেই।

বাংলা চলচ্চিত্রের বিদ্রোহী নায়ক চরিত্রগুলোর দিকে তাকালেই সেটা বোঝা যায়। সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, তীব্র আবেগে ভরা, ধ্বংসের দিকেও হাঁটতে প্রস্তুত—এই ধরনের চরিত্রের ভেতরে নজরুলীয় আত্মা আছে। তার সাহিত্য উপমহাদেশের পুরুষ চরিত্রকে নতুন ধরনের আবেগ প্রকাশের অনুমতি দিয়েছিল। পুরুষও কাঁদতে পারে, দুর্বল হতে পারে, জ্বলে উঠতে পারে—এই ধারণা তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে।

এটা বাংলা চলচ্চিত্রকে খুব গভীরভাবে বদলে দিয়েছিল। কারণ তার আগে পুরুষ চরিত্র অনেক সময় আবেগ লুকিয়ে রাখত। নজরুল সেই দেওয়াল ভেঙে দিলেন। ফলে বাংলা সিনেমার পুরুষ চরিত্রও আরও আবেগী, আরও বিপজ্জনক, আরও মানবিক হয়ে উঠল।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে হয়তো নজরুলের এই প্রভাব আলাদা করে বোঝা কঠিন। কারণ তিনি আমাদের হৃদয়ের এত গভীরে মিশে গেছেন যে তাকে আলাদা করা যায় না।

বাংলা চলচ্চিত্র যখন প্রেমের ব্যথায় কাঁদে, বিদ্রোহে জ্বলে ওঠে অথবা ধর্মের দেয়াল ভেঙে গান গায়—তখনও কোথাও না কোথাও নজরুল কথা বলে ওঠেন।