শৈশব স্মৃতি

নজরুলকে নিয়ে গর্বিত ত্রিশালের মানুষ

মো. আমিনুল ইসলাম
মো. আমিনুল ইসলাম

২০ বছর পর আবারও ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুরে জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী উদযাপনের আয়োজন করা হয়েছে।

আজ রোববার কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। 

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২১-২৫ মে পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপী জাতীয় কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন।

ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী জানান, ২০০৬ সালের পর কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আর কোনো জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান হয়নি।

ত্রিশালে নজরুল

এক শতাব্দীরও বেশি আগে নজরুল ময়মনসিংহে এসেছিলেন। কিন্তু আজও ত্রিশাল ও ময়মনসিংহের মানুষের হৃদয়ে তার স্মৃতি অম্লান। এখনো তারা নজরুলকে আপনজন হিসেবেই মনে করেন।

‘এখনো আমরা কবির সেই মধুর স্মৃতি ভুলতে পারিনি, যিনি ১১৩ বছর আগে ময়মনসিংহের ত্রিশালে শৈশব কাটিয়েছেন ও দরিরামপুরের স্কুলে পড়াশোনা করেছেন,’ বলেন কাজী রফিজউল্লাহর নাতি কাজী আজিজুল হক।

বেচুটিয়া ব্যাপারীর চতুর্থ প্রজন্মের সদস্য ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘শৈশবে নজরুলের উপস্থিতি আমাদের এলাকাকে গৌরবান্বিত করেছে ও এক অনন্য মর্যাদা এনে দিয়েছে।’

মাত্র ১৪ বছর বয়সে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ময়মনসিংহে আসা সেই কিশোরই পরে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও সাহিত্যিক হয়ে ওঠেন।

ত্রিশালের নামাপাড়া গ্রামের আবদুর রহমান বলেন, ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বটগাছটি দেখলেই মনে হয়, সেই কিশোর এখনো সেখানে বসে মুগ্ধকর বাঁশি বাজাচ্ছে।’

কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত পরিচালক ও নজরুল গবেষক রাশেদুল আনামের মতে, ১৯১৩ সালের জুন মাসে নজরুলকে ত্রিশালের কাজীর শিমলা গ্রামে নিয়ে আসেন পুলিশের তখনকার উপপরিদর্শক কাজী রফিজউল্লাহ ।

১৮৯৯ সালের ২৫ মে নজরুলের জন্মের সময় পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামেই কর্মরত ছিলেন রফিজউল্লাহ। ত্রিশালের দরিরামপুর হাই স্কুলে (বর্তমানে নজরুল একাডেমি) ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন নজরুল। তখন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন বিপিন চন্দ্র চক্রবর্তী।

রাশেদুল আনাম তার ‘নজরুল জীবনের ত্রিশাল অধ্যায়’ গ্রন্থে নজরুলের দেড় বছরের ত্রিশাল অবস্থানের নানা স্মৃতি তুলে ধরেছেন।

কাজীর শিমলা থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব ছিল প্রায় ৬ মাইল। তাই নজরুল পরে বিদ্যালয়ের কাছাকাছি নামাপাড়ায় বেচুটিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে থাকতেন।

আনাম বলেন, ‘বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথে নামাপাড়ার বটগাছের নিচে বসে নজরুল প্রায়ই বাঁশি বাজাতেন।’ 

ত্রিশালে অবস্থানকালে নজরুল তার পুঁথি পাঠের দক্ষতা ও মুগ্ধকর বাঁশির সুরের জন্য স্থানীয়দের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথে নামাপাড়ার এই বটগাছের নিচে বসে নজরুল প্রায়ই বাঁশি বাজাতেন। ছবি: সংগৃহীত

আনাম তার গবেষণায় উল্লেখ করেন, বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক মহিম চন্দ্র খাসনবিশ নজরুলকে ‘শান্ত ও কিছুটা অন্যমনস্ক’ ছেলে হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তবে সেই কিশোর নজরুল বিদ্যালয়ের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ ও ‘পুরাতন ভৃত্য’ কবিতা আবৃত্তি করে দর্শকদের কাছ থেকে প্রশংসা ও পুরস্কার অর্জন করেন।

সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা শেষে নজরুল বেচুটিয়া ব্যাপারীর পুত্রবধূ সফরজান বানুকে জানান, তিনি পশ্চিমবঙ্গে ফিরে যাবেন। তখন ওই সহৃদয় নারী তাকে যাত্রার জন্য কিছু অর্থ সহায়তা দেন।

বিদায়ের আগে নজরুল তার প্রধান শিক্ষকের উদ্দেশে একটি চিঠি রেখে যান। চিঠিটি পেয়ে আবেগ আপ্লুত প্রধান শিক্ষক তা শিক্ষার্থীদের সামনে পড়ে শোনান। কিন্তু নজরুলকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. তপন কুমার সরকার বলেন, ‘ত্রিশালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর এখানকার মানুষের হৃদয়ে এখনো নজরুলের স্মৃতি জীবন্ত হয়ে আছে।’

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

কবির শৈশব স্মৃতিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জীবন্ত রাখতে ত্রিশালের নামাপাড়ায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বর্তমানে ছয়টি অনুষদের অধীনে ২৫টি বিভাগে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে লিবারেল ও পারফর্মিং আর্টস, শিক্ষা ও গবেষণার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে সংগীত, থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ, ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া এবং ফোকলোর। তবে সংগীত বিভাগের অধ্যাপক ড. মুসাররত শবনম মনে করেন, ‘নৃত্য ও বাদ্যযন্ত্রবিষয়ক আরও বিভাগ চালু করা উচিত।’

নজরুল স্মৃতি কেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

নজরুল স্মৃতি কেন্দ্র

কাজীর শিমলা ও নামাপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত দুটি নজরুল স্মৃতি কেন্দ্রে সংরক্ষিত কবির অল্পকিছু স্মৃতি-বিজড়িত স্মারকগুলো এখন দর্শনার্থীদের কাছে কিছুটা একঘেয়ে হয়ে পড়েছে।

২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রগুলোতে গত দুই দশকে নতুন কোনো সংগ্রহ বা দর্শনার্থীবান্ধব সুবিধা যুক্ত হয়নি।

সেখানে সংরক্ষিত স্মারকের মধ্যে রয়েছে গ্রামোফোন, এইচএমভি কোম্পানির প্রকাশিত রেকর্ড, কবির হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি, কবি ও তার পরিবারের কিছু আলোকচিত্র ও একটি খাট।

স্মৃতি কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ফয়জুল্লাহ রুমেলও কবির স্মারক সংগ্রহের ঘাটতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন।