ত্রিশালে নজরুল: একটি সত্যানুসন্ধানী পাঠ
কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে মিথ্যা ও মুখরোচক গল্পের অভাব নেই। অভাব নেই তাকে নিয়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কিংবদন্তিরও। ঔপনিবেশিক অখণ্ড ভারতবর্ষে নজরুলের আবির্ভাব ধূমকেতুর মতো এবং তার জনপ্রিয়তা গগণভেদী। তাকে নিয়ে আগ্রহ ও কৌতূহলের যেন কোনো শেষ নেই।
নজরুলক নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, করা হয়েছে বিস্তার গবেষণা। এসব সত্ত্বেও তাকে নিয়ে আজও কিছু অমীমাংসিত বিষয় গেছে, যা আমাদেরকে সত্যানুসন্ধানে সচেষ্ট করে। নজরুলের ত্রিশাল অধ্যায় এমনই একটি উজ্জ্বল প্রসঙ্গ।
কাজী নজরুল ইসলাম কৈশোরে লেখাপড়া করতে এসেছিলেন ময়মনসিংহের ত্রিশালে। এ বিষয়ে নজরুল-জীবনী ভিত্তিক সংশয়হীন কিছু তথ্য দেই।
এক. নজরুল আসানসোল থেকে ত্রিশালে এসেছিলেন।
দুই. তিনি ব্রিটিশ জেলাশহর ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানায় অবস্থিত তদানীন্তন সদ্য প্রতিষ্ঠিত দরিরামপুর ইংলিশ হাই স্কুলে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
তিন. তার আসানসোল থেকে ত্রিশালে আসা ও স্কুলে ভর্তি হওয়া এবং পূর্ববঙ্গের মাটি-মানুষ-প্রকৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন স্থাপনের সুযোগ পাওয়া—উভয় ক্ষেত্রে কাজীর সিমলা নিবাসী কাজী রফিজউল্লাহ দারোগার সর্বাধিক কৃতিত্ব রয়েছে।
চার. নজরুল কিছুদিন দূরবর্তী কাজীর সিমলার দারোগাবাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে স্কুলে যাতায়ত করেছেন। পরে কাছের নামাপাড়ার বিচ্যুতিয়া ব্যাপারীবাড়িতে জায়গির থেকে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছেন।
পাঁচ. তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে ত্রিশালস্থ দরিরামপুর ইংলিশ হাই স্কুল ছেড়ে দেন। এরপর পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার রাণীগঞ্জে চলে যান এবং সেখানকার সিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে ভর্তি হন।
এর বাইরে আরও দুটি সত্য হলো—
এক. সপ্রতিভ নজরুল তার দারিদ্র্যপূর্ণ ও আশ্রয়হীন জীবন থেকে মুক্তির সন্ধান করছিলেন। তিনি ‘মানুষ হতে’ আসানসোলের তৎকালীন সাব-ইন্সপেক্টর কাজী রফিজউল্লাহর স্নেহপূর্ণ অভ্যর্থনায় অপরিচিত দূরদেশ ত্রিশালে এসেছিলেন।
দুই. চড়াই-উৎড়াই ও বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে নজরুল নামাপাড়ার মধ্যবিত্ত কৃষক বিচ্যুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে আশ্রয় পান। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে একটা বটবৃক্ষের ছায়া অতিক্রম করে দরিরামপুর স্কুলে যেতেন নজরুল।
এই অবিমিশ্র সত্যগুলোই পরে সম্প্রসারিত হয়েছে বিভিন্ন রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণে। এটা বলা ভুল হবে না যে, ত্রিশাল তথা ময়মনসিংহবাসী নজরুলকে নিয়ে শুধু গৌরবান্বিতই হলেন না, তারা বিভিন্ন গল্প, মিথ, আখ্যান বা কিংবদন্তির জন্ম দিলেন এবং পরম মমতায় নজরুলচর্চার ধারাবাহিকতা ধরে রাখলেন।
তবে আজও জানা গেল না নজরুল ঠিক কত সালে ত্রিশালে এসেছিলেন? দরিরামপুর স্কুলে কোন ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলেন? কত বছর বা কত মাস ত্রিশালে ছিলেন? কেনই বা স্কুলের পাঠ শেষ না করে তিনি ত্রিশাল ছেড়ে চলে গেলেন?
ত্রিশালে নজরুলের আগমন সম্পর্কে পাওয়া তথ্য ও গবেষণায় প্রধানত দুটি অভিমত পাওয়া যায়।
এক. তিনি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ত্রিশালে এসেছিলেন এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন।
দুই. তিনি ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ত্রিশালে এসেছিলেন এবং সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন।
১৯১৩ সাল ও ষষ্ঠ শ্রেণির পক্ষে অভিমত দেন আবুল মনসুর আহমদ, পি. এ. নাজির, রাশেদুল আনাম প্রমুখ। অন্যদিকে, ১৯১৪ সাল ও সপ্তম শ্রেণির পক্ষে অভিমত দেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, আবদুল কাদির, সুশীলকুমার গুপ্ত, আজহারউদ্দীন খান, অরুণকুমার বসু, মোহাম্মদ আবদুল কাইউম, রফিকুল ইসলাম, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আশরাফ সিদ্দিকী, মাহবুবুল হক প্রমুখ।
আসানসোলের সাব-ইন্সপেক্টর কাজী রফিজউল্লাহ বালক বা কিশোর নজরুলকে কাজীর সিমলা গ্রামে নিয়ে আসেন বাংলা ফাল্গুন মাসে। অর্থাৎ, ইংরেজি ফেব্রুয়ারি বা মার্চে। বছরের মাঝামাঝি সময়ে জুন মাসে নজরুল দরিরামপুর স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন।
এর আগে ময়মনসিংহ সিটি স্কুলে নজরুলকে ভর্তির চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু বছরের শুরুতে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় কিংবা জায়গিরের অভাব ও আবাসন ব্যবস্থার সুবিধা না থাকায় অথবা উভয় কারণে নজরুলকে ত্রিশালের দরিরামপুর ইংরেজি হাই স্কুলে ভর্তি হতে হয়।
দরিরামপুর ইংরেজি হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাকাল ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ। নজরুল ত্রিশালে প্রথম কাজী হামিদউল্লাহর বাসায় জায়গির ছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যে জায়গির হিসেবে তার আশ্রয় হয় বিচ্যুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে। নামাপাড়ার এ বাড়ি থেকেই তিনি ত্রিশাল পর্বের ইতি টানেন।
নজরুল ত্রিশাল ছেড়ে কেন চলে গেলেন? কেউ কেউ বলেছেন, অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় ফারসি বিষয়ে ৯৮ পেয়েছিলেন নজরুল। ওই বিষয়ে অন্য শিক্ষর্থীদের পাঁচ নম্বর করে গ্রেস দিয়ে পাশ করানো হয়েছিল। নজরুল ৯৮-এর সঙ্গে অন্যদের মতো গ্রেস পাঁচ নম্বর চেয়েছিলেন সমবিচারের যুক্তিতে। কিন্তু ফারসি শিক্ষক মৌলভী জহুরুল হক ও হেডমাস্টার বিপিনচন্দ্র চক্রবর্তী সেই প্রস্তাবে রাজি হননি।
ফারসি শিক্ষক কিংবা প্রধান শিক্ষক অথবা উভয় শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থী নজরুলের বাদানুবাদ হয়। কেউ কেউ বলেন নজরুলকে বেত্রাঘাতও করা হয়েছিল। আর সেই দুঃখে-অভিমানে নজরুল ত্রিশাল ছাড়েন।
এ বিষয়ে আরেকটি অভিমত হলো, কিশোর নজরুল দূরদেশে আসার পর তার মাকে দেখার বাসনায় ত্রিশাল ছাড়েন ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু আর ফিরে আসেননি। কত সালে গেলেন? কেউ কেউ বলেছেন, ১৯১৪ সালে। কেউ আবার দাবি করেছেন ১৯১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে।
ত্রিশালে বালক বা কিশোর নজরুল কেমন ছিলেন? সেখানে কীভাবে কেটেছে তার ছেলেবেলা? কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন, বর্ধমানের ঊষর প্রকৃতি ও আশ্রয়হীন জীবনের বিপরীতে ময়মনসিংহের শ্যামল প্রকৃতি আর আতিথেয়তা নজরুলকে আনন্দ দিয়েছিল। অপরূপ প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়া নজরুল ত্রিশাল ছেড়ে যাবেন না, তিনি এমনটা বলেছিলেন কোনো এক বন্ধুকে।
আবার এ বিষয়ে ভিন্নমতও আছে। দূরদেশে এসে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া কিশোর নজরুল ত্রিশালে খুব বেশি আতিথেয়তা পাননি। যে-কারণে তাকে প্রথম জায়গির বাড়ি পরিবর্তন করতে হয়েছিল।
ত্রিশালের দস্যু কিশোর-বালকরা ভিনদেশি নজরুলকে আপন করে নিতে পারেনি। নজরুলের ভাষা বা কথনরীতি ত্রিশালের ভাষার মতো না হওয়ায় দস্যু ছেলেরা তাকে উত্ত্যক্ত করতো। তার গান গাওয়া, বাঁশি বাজানো, কবিতা আবৃত্তি, পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া, ক্লাসে প্রথম হওয়াসহ নানা প্রতিভা আর প্রাণখোলা হাসির কারণে কেউ কেউ কিশোর নজরুলকে ঈর্ষাও করতো।
এবার ত্রিশাল-ময়মনসিংহ বিষয়ে স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলামের জবানি ও সাহিত্যকর্ম থেকে সত্যানুসন্ধান করা যাক। ১৯২৬ সালে অনুষ্ঠিত ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনে পাঠানো তার একটি চিঠি নজরুলের অভিভাষণ হিসেবে বিবেচিত। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন এখানকার পবিত্র মাটির কথা, এই জনপদের মাটি ও মানুষের প্রতি তার অশেষ ঋণের কথা। তিনি বলেছেন এখানে তার লেখাপড়া করা ও বাল্যকাল অতিবাহিত করার কথা। উপরন্তু এই অঞ্চলের স্মৃতি তার মনে উজ্জ্বল ভাস্মরময় এবং এখানে আসার জন্য তিনি যে ভীষণভাবে আগ্রহী, সেসব কথাও বলেন।
‘আপনারা আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আমার আন্তরিক ইচ্ছা ছিল, আপনাদের এই নবজাগরিত প্রাণের স্পর্শে নিজেকে পবিত্র করিয়া লইব, ধন্য হইব। কিন্তু দৈব প্রতিকূল হওয়ায় আমার সে আশা পূর্ণ হইল না। আমার শরীর আজও রীতিমত দুর্বল, এক স্থান হইতে অন্য স্থানে যাইবার মতো শক্তি আমার একেবারেই নাই। আশা করি আমার এই অনিচ্ছাকৃত অক্ষমতা সকলে ক্ষমা করিবেন।
এই ময়মনসিংহ আমার কাছে নূতন নহে। এই ময়মনসিংহ জেলার কাছে আমি অশেষ ঋণে ঋণী। আমার বাল্যকালের অনেকগুলি দিন ইহার বুকে কাটিয়া গিয়াছে। এইখানে থাকিয়া আমি কিছুদিন লেখাপড়া করিয়া গিয়াছি। আজও আমার মনে সেইসব প্রিয় স্মৃতি উজ্জ্বল ভাস্মর হইয়া জ্বলিতেছে। এই আশা করিয়াছিলাম, আমার শৈশব-চেনা ভূমির পবিত্র মাটি মাথায় লইয়া ধন্য হইব, উদার হৃদয় ময়মনসিংহ-জেলাবাসীর প্রাণের পরশমণির স্পর্শে আমার লৌহপ্রাণকে কাঞ্চনময় করিয়া তুলিব; কিন্তু তাহা হইল না, দূরদৃষ্ট আমার।
যদি সর্বশক্তিমান আল্লাহ দিন দেন, আমার স্বাস্থ্য ফিরিয়া পাই, তাহা হইলে আপনাদের গফরগাঁওয়ের নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনীতে যোগদান করিয়া ও আপনাদের দর্শন লাভ করিয়া ধন্য হইব।’ [‘কৃষক শ্রমিকের প্রতি সম্ভাষণ’, নজরুল-রচনাবলী]
১৯৩১ সালে প্রকাশিত ‘শিউলিমালা’ গল্পগ্রন্থের ‘অগ্নি-গিরি’ গল্পে নজরুল ত্রিশালের সঙ্গে তার নিজের সম্পর্ক-বন্ধনের স্বরূপ নির্মাণ করেছেন। এই ছোটগল্পের স্থানিক প্রেক্ষাপট হলো ত্রিশাল।
‘ত্রিশালের মাদ্রাসা’, ‘গফরগাঁও-এর জমিদারের হাতি’, ‘ময়মনসিংহের হাসপাতাল’ এই গল্পে উল্লেখ রয়েছে। গল্পে যে বীররামপুর গ্রামের কথা বলা হয়েছে, তা বস্তুত দরিরামপুর।
নজরুল শেষ পর্যন্ত যে বাড়িতে জায়গির ছিলেন, সেই বিচ্যুতিয়া ব্যাপারীবাড়ির পাশের গ্রাম ছলিমপুর। ছলিমপুরের মানুষ বিচ্যুতিয়া ব্যাপারীর বাড়ি পেরিয়ে একটি বটবৃক্ষের ছায়া অতিক্রম করে দরিরামপুর বাজার আসতো, আজও আসে। ফলে দরিরামপুর ও ছলিমপুর মিলেমিশে ‘অগ্নি-গিরি’ ছোটগল্পে বীররামপুর হয়ে গেছে কিংবা হয়ে যেতে পারে।
সবুর সাখন্দের জেগে ওঠা বীরত্ব প্রকাশ পাওয়ায় শিল্পকৌশল হিসেবে দরিরামপুরের স্থলে বীররামপুর নামকরণ খুব স্বাভাবিক। আবার এ-ও ঠিক যে, দরিরামপুরের খুব কাছাকাছি রামপুর ইউনিয়ন ও বীররামপুর গ্রাম রয়েছে। বীররামপুর উজানপাড়া, বীররামপুর চরপাড়া, বীররামপুর ভাটিপাড়া ও কাকচর হচ্ছে ত্রিশালের রামপুর ইউনিয়নের উল্লেখযোগ্য চারটি গ্রাম।
‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে নজরুল ময়মনসিংহকে স্বল্প আঁচড়ে অক্ষয় ও কালজয়ী করে রেখেছেন। ১৯৩০ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্র বিপ্লববাদী সংগঠক শ্রমিক সংঘের নেতা আনসার ময়মনসিংহ থেকে কৃষ্ণনগরে আসার কথা উল্লেখ করে। এতে সমগ্র কিংবা বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রতি নজরুলের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আকর্ষণ অনুভব করা যায়।
ঔপন্যাসিক নজরুলের বর্ণনায়—
লতিফা হেসে গড়িয়ে পড়ে বলল, ‘আচ্ছা দাদু, তুমি এখনো ছেলেবেলাকার মতোই দুষ্টু আছ দেখছি। সে যাক, তুমি এতদিন ছিলে কোথায়, বলো তো?
আনসার হেসে বলল, ‘আরে, এত বড় খবরটাই রাখিসনে তুই? আজ আসছি ময়মনসিংহ থেকে। সেখানে এসেছিলাম সিলেট থেকে। সিলেট গেছিলাম ত্রিপুরা থেকে। কুমিল্লা গেছিলাম চাটিগাঁ থেকে।’ [‘মৃত্যুক্ষুধা’, নজরুল-রচনাবলী]
১৯২৭ সালে অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁকে উত্তর হিসেবে নজরুল যে চিঠি লিখেছিলেন, তার একস্থানে উল্লেখ আছে দুটি বিশিষ্ট ও ইঙ্গিতপূর্ণ বাক্যাংশ।
এক. ‘আমি একে পাড়াগেঁয়ে স্কুল-পালানো ছেলে’; এবং দুই. ‘স্কুলের হেড মাস্টারের চেহারা মনে করতেই আমার আজো জলতেষ্টা পেয়ে যায়’।
অনেকেই অভিমত দিয়েছেন, নজরুলের এই পাড়াগেঁয়ে স্কুল-পালানোর ঘটনা এবং অগ্নিশর্মা ভীষণ-ভয়ংকররূপী হেড মাস্টারের চেহারার ভীতিকর স্মৃতির উৎসভূমি হচ্ছে ত্রিশাল দরিরামপুর হাই স্কুল। নজরুল যেহেতু বারংবার স্কুল ছেড়েছেন, দরিরামপুর স্কুলের আগেও ত্যাগ করেছিলেন মাথরুন গ্রামের নবীনচন্দ্র ইন্সটিটিউট স্কুল, আবার ত্রিশাল থেকে চলে গিয়ে রাণীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলেও তিনি থিতু হননি, স্কুল ছেড়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভীপ্সায় চলে গেলেন সেনাবাহিনীর ৪৯ নং বাঙালি পল্টনে, সেহেতু তার এই স্কুল-ভীতির একক উৎস নিয়ে সংশয় আছে। আমার মতে, সপ্রতিভ নজরুলের সমগ্র পারিপার্শ্বিকতা ও শিক্ষাজীবনের প্রেক্ষাপটে বিচার্য হতে পারে তার এই স্কুল-ভীতির প্রকৃত উৎসমুখ।
তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী, নজরুল ত্রিশাল ছাড়ার পর আর এদিকে আসেননি। কাজীর সিমলার কাজী রফিজউল্লাহ দারোগার সঙ্গেও তার আর কখনো দেখা হয়নি। ১৯৩১ সালে রফিজউল্লাহ দারোগা একবার সরকারি কাজে কলকাতা গেলে খ্যাতির শীর্ষে থাকা নজরুলের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে দেখা হয়নি।
কথিত আছে, নজরুল গান রচনায় তন্ময় বা বিভোর থাকায় রফিজউল্লাহ দারোগার চিরকুট খেয়াল করেননি। দু-ঘণ্টা অপেক্ষা করে কাজী রফিজউল্লাহ ফিরে আসেন।
এ বিষয়ে মর্মাহত ও লজ্জিত নজরুল পরবর্তীতে কাজী রফিজউল্লাহকে টেলিগ্রাম করে দেখা করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন বলে কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। তারা এ-ও জানিয়েছেন যে, যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে রফিজউল্লাহ দারোগা ১৯৩৩ সালে মারা যাওয়ায় তাদের আর সাক্ষাৎ ঘটেনি।
নজরুলের শৈশব-চেনা ভূমি ত্রিশাল। ত্রিশাল-ময়মনসিংহকে তিনি যেমন আত্তীকরণ করেছেন তার বিভিন্ন সাহিত্যকর্মে, তেমনি ত্রিশাল-ময়মনসিংহবাসীও নজরুলকে লালন করে চলেছেন তাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে। তাদের হাসি-কান্না-সুখ-আনন্দ কিংবা শিল্প-সাহিত্য-শিক্ষা-দর্শন সর্বক্ষেত্রে নজরুল যেন এক অনিবার্য নাম, অলঙ্ঘনীয় প্রসঙ্গ।
নজরুলের স্মৃতি ও সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাস্বরূপ ষাটের দশক থেকে স্থানীয়ভাবে প্রতিবছর নজরুল-জয়ন্তী উদযাপন করা হয় দরিরামপুর হাই স্কুলের মাঠে। ১৯৬৪ সালে দরিরামপুর হাই স্কুলের নাম পরিবর্তন করে নজরুল একাডেমি রাখা হয় এবং ১৯৬৪-৬৫ সাল থেকেই নজরুল-জয়ন্তীতে নজরুল মেলার বর্ণিল আয়োজন করা হয় ত্রিশালে। এটি পরবর্তীতে সম্প্রসারিত হয়েছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে, নানা প্রতিষ্ঠানে।
স্থানীয় আপামর মানুষের আকাঙ্ক্ষা, দেশ-বিদেশের নজরুলপ্রেমী গবেষক-পর্যটকদের আগ্রহ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নজরুলের শৈশব-চেনা ভূমি ত্রিশাল হয়ে উঠেছে নজরুলতীর্থ। ষাটের দশক থেকে এখানে নজরুলের নামে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে বিভিন্ন শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।
নজরুল একাডেমি (১৯৬৪) ছাড়াও নজরুল মেমোরিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৯৬৫), ত্রিশাল নজরুল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৬৭), সরকারি নজরুল কলেজ (১৯৬৭), দুখুমিয়া মাধ্যমিক বিদ্যানিকেতন (১৯৭২), জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় (২০০৬), দারোগাবাড়ি নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র (২০০৮), বিচ্যুতিয়া ব্যাপারীবাড়ি নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র (২০০৮), কবি নজরুল বিদ্যানিকেতন (২০০৯) ইত্যাদি শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ত্রিশালকে নজরুলময় করে তুলেছে।
অধ্যাপক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়