কারা ‘স্যান্ডউইচ প্রজন্ম’, মিলিয়ে নিন নিজের সঙ্গে
সকাল সাতটা।
ছেলেকে স্কুলে পাঠাতে হবে। মেয়ের প্রজেক্ট জমা দেওয়ার শেষ দিন। অফিসে মিটিং আছে দশটায়। ঠিক তখনই ফোন আসে, ‘মা রাতে আবার পড়ে গেছেন। আজ ডাক্তার দেখাতে হবে।’
এমন পরিস্থিতি এখন হাজারো পরিবারের বাস্তবতা। একদিকে নিজের সন্তান, অন্যদিকে বৃদ্ধ বাবা-মা, দুই প্রজন্মের দায়িত্ব একসঙ্গে কাঁধে নিয়ে যারা চলেন, তাদের বলা হয় ‘স্যান্ডউইচ কেয়ারার’ বা ‘স্যান্ডউইচ প্রজন্ম’। অর্থাৎ তারা যেন জীবনের দুই পাউরুটির মাঝখানে চাপা পড়ে থাকা একজন মানুষ!
বাংলাদেশে এই শব্দটি খুব পরিচিত না হলেও, বাস্তবে অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন এমনই জীবনই কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে এই চাপ দিন দিন বাড়ছে।
ঢাকার মোহাম্মদপুরে থাকেন তানিয়া রহমান। দুই সন্তানের মা। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তার শ্বশুর ডায়াবেটিস ও কিডনি সমস্যায় ভুগছেন, আর নিজের মা-বাবা থাকেন কুষ্টিয়ার মজমপুরে।
তানিয়া বলেন, ‘সকালে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাই, অফিসে যাই। অফিস শেষে কখনো শ্বশুরকে হাসপাতালে নিয়ে যাই, কখনো মায়ের জন্য ওষুধ কিনে পাঠাতে হয়। রাতে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাজ্যের ক্লান্তি নেমে আসে।’
তিনি একটু হেসে আবার বলেন, ‘কখনো কখনো মনে হয় আমি কারো প্রতিই পুরোপুরি দায়িত্ব পালন করতে পারছি না। তখন বেশি খারাপ লাগে।’
এই অপরাধবোধই স্যান্ডউইচ কেয়ারারদের সবচেয়ে বড় মানসিক চাপগুলোর একটি।
একসময় যৌথ পরিবারে দাদা-দাদি, চাচা-ফুপু সবাই মিলে দায়িত্ব ভাগ করে নিতেন। এখন শহুরে জীবনে বেশিরভাগ পরিবার ছোট হয়ে গেছে। এক বা দুই সন্তানের পরিবার, চাকরিজীবী স্বামী-স্ত্রী, আর দূরে থাকা বৃদ্ধ বাবা-মা—এটাই এখন সাধারণ চিত্র।
অনেক সময় গ্রাম থেকে বাবা-মাকে শহরে এনে রাখা হয়। কিন্তু তাতেও সমস্যার শেষ হয় না। হাসপাতাল, ওষুধ, নিয়মিত পরীক্ষা, দেখাশোনা—সবকিছু সামলাতে গিয়ে নিজের জন্য আর সময় বের করা সম্ভব হয় না।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে স্যান্ডউইচ কেয়ারের সংখ্যা বেড়েছে। আর নারীরাই এই দায়িত্ব বেশি বহন করেন।
অফিস শেষে রান্না, সন্তানের পড়া, তারপর বৃদ্ধ মায়ের প্রেশার মাপা বা বাবাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাওয়া, অনেক নারীর কাছে এটি এখন প্রতিদিনের রুটিন।
দেশে চিকিৎসাসেবা নিতে গেলে সময় ও ভোগান্তি দুটোই বেশি। একজন বৃদ্ধ মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া মানে শুধু ডাক্তারের রুমে ঢোকা নয়। রিকশা বা গাড়ি ঠিক করা, লম্বা লাইনে দাঁড়ানো, টেস্ট করানো, রিপোর্ট আনা, ওষুধ কেনা—সব মিলিয়ে পুরো দিন শেষ।
যদিও বিশ্বের অনেক দেশে ‘কেয়ারার’ বেশ পরিচিত শব্দ। তবে বাংলাদেশে এখনো ‘কেয়ারার’ শব্দটি তেমন স্বীকৃত নয়।
যেমন কর্মস্থলে কেউ যদি বলে, ‘আজ মাকে ডাক্তার দেখাতে হবে’। তখন অনেক প্রতিষ্ঠানে এটিকে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবেই দেখা হয়। ফলে অনেকেই এগুলো নিয়ে মানসিক চাপে ভোগেন।
স্যান্ডউইচ কেয়ারারদের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা অনেক সময় চোখে দেখা যায় না। তবে তারা সবসময় মানসিকভাবে সতর্ক থাকেন। বাবার ওষুধ শেষ হলো কি না, মায়ের সুগার কমলো কি না, সন্তানের কোচিং কখন, স্কুল ফি জমা দেওয়া হয়েছে কি না, রাতে কে হাসপাতালে থাকবে ইত্যাদি বিষয় তারা সবসময় মাথায় রাখেন। এসব চিন্তা মানুষকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে ফেলে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, দীর্ঘদিন এমন চাপ থাকলে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও বার্নআউট তৈরি হতে পারে।
স্যান্ডউইচ কেয়ারার বাবা-মায়ের চাপ অনেক সময় শিশুর ওপর পড়ে। হয়তো অনেক মা-বাবা ভাবেন সন্তান কিছু বুঝছে না। আসলে শিশুরা খুব দ্রুত পরিবারের চাপ বুঝতে পারে। যখন মা সারাক্ষণ দৌড়ের ওপর থাকেন, বাবা সবসময় চিন্তিত থাকেন—তখন শিশুদের মধ্যে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে।
তাই বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরিবারের সবার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা জরুরি।
প্রযুক্তি কিছুটা সাহায্য করতে পারে
এখন অনেক পরিবার হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার গ্রুপ খুলে দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছে। কেউ ওষুধ কিনছেন, কেউ হাসপাতালে যাচ্ছেন, কেউ রিপোর্ট সংগ্রহ করছেন। এছাড়া মোবাইলে রিমাইন্ডার দিয়ে ওষুধের সময় মনে রাখা, অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া বা ভিডিও কলে ডাক্তার দেখানোও কিছুটা চাপ কমাতে পারে।
অনেকে মনে করেন, ‘সব দায়িত্ব একাই সামলাতে হবে’। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন মানুষ একা সব করতে পারেন না। তাই কখনো ভাইবোনের সাহায্য নিতে হবে, কখনো আত্মীয়দের, কখনো প্রতিবেশীদের। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া। কারণ আপনি অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরো পরিবারই বিপদে পড়বে।
আমাদের সমাজে যারা বৃদ্ধ বাবা-মা ও সন্তান, দুই দিকই একসঙ্গে সামলান, দায়িত্বের ভারে তাদের অনেককিছু চাপা পড়ে যায়। অথচ খুব কম মানুষই তাদের নিয়ে ভাবে। তাদের মানসিক চাপ নিয়ে তেমন আলাপ হয় না। কিন্তু সত্যি হলো—এই মানুষগুলোর কাঁধেই টিকে আছে অসংখ্য পরিবার।



