মিরপুরের কয়েকটি এলাকায় পানির তীব্র সংকট
রাজধানীর মিরপুরের পূর্ব কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ার বাসিন্দারা গত দুই মাসে দফায় দফায় পানির সংকটে পড়ছেন।
অনেক পরিবারকে খাবার পানি কিনতে হচ্ছে। ওয়াসার পানির ট্যাংকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় রান্না, গোসল ও কাপড় ধোয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
পূর্ব কাজীপাড়ার বাসিন্দা রজনী হানিফ হিমু জানান, দীর্ঘদিন এই সংকটের সমাধান না হওয়ায় তিনি সপরিবারে খিলগাঁও এলাকায় বাসা নেওয়ার কথা ভাবছেন।
‘প্রতি দুই দিন পরপর আমাদের পাঁচ লিটার খাবার পানি কিনতে হয়। সপ্তাহে কয়েকবার পানি সরবরাহ বন্ধ থাকে। আবার পানি এলেও প্রায়ই দেখা যায় পানিতে দুর্গন্ধ,’ বলেন তিনি।
ওয়াসা বলছে, ভাকুর্তা প্ল্যান্টে বিঘ্নের কারণে পানি সরবরাহ ব্যাহত। ১৫ কোটি লিটার সক্ষমতার বিপরীতে দৈনিক উত্তোলন হচ্ছে ১০ কোটি ৫০ লাখ লিটার পানি। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় আরও তীব্র হচ্ছে সংকট।
ওই অ্যাপার্টমেন্টের নিরাপত্তাকর্মী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টির সময় পাইপলাইনে নোংরা পানি ঢুকে পড়ে।’
মোট ১৪টি পরিবার ওই ভবনে বসবাস করছে। নিয়মিত পানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সম্প্রতি তাদের এক ট্যাংকার করে পানি কিনতে হয়েছে, জানান তিনি।
পূর্ব কাজীপাড়ায় একটি টিনশেড বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক মমতাজ বেগম। ওই বাড়িতে ১৩টি পরিবারের বাস। মমতাজ বলেন, সকাল, দুপুর ও রাত—সারা দিনই পানির জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
তিনি বলেন, ‘শুধু গোসল বা কাপড় ধোয়ার জন্যই অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।’
মমতাজের অভিযোগ, অনেক ভবনে শক্তিশালী পাম্প ব্যবহার করা হয়। সরবরাহ পাইপ থেকে তারা পানি টেনে নেওয়ায় পানির চাপ কমে যায়।
‘আমাদের যাদের নিজস্ব পাম্প নেই, তারা তীব্র পানির সংকটে পড়েছি,’ যোগ করেন তিনি।
স্থানীয় ফার্মেসির মালিক আজহারুল ইসলাম আকন্দ দাবি করেন, দূষিত পানির কারণে ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
পূর্ব কাজীপাড়ার আরেক বাসিন্দা মাহমুদুল হক বলেন, এই সংকট কয়েক বছর ধরে চলছে। তবে গত ছয় মাসে তীব্র হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় পাম্প থেকে মূলত কাজীপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পানি সরবরাহ করা হয়। যে কারণে পূর্ব কাজীপাড়া, বিশেষ করে আল আকসা মসজিদের আশেপাশে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না।
পানির চাপ কম-বেশি হলে দূষিত পানি ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দিয়ে সরবরাহ লাইনে ঢুকে পড়ে। ফলে ডায়রিয়া ও চর্মরোগ বাড়াচ্ছে, দাবি করেন মাহমুদুল।
তিনি আরও বলেন, বাসিন্দারা দূরের বিভিন্ন উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে।
একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেট ট্যাংকারের পানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
‘সরকারি নির্ধারিত মূল্য প্রায় ৩০০ টাকা হলেও চালকেরা অতিরিক্ত অর্থ দাবি করায় ছোট একটি ট্যাংকারের জন্য বাসিন্দাদের প্রায়ই ৮০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।’
ঢাকা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী (জোন-১০) আসাদুজ্জামান মনে করেন, ভাকুর্তা পানি শোধনাগারে বিঘ্ন হওয়ায় পূর্ব ও পশ্চিম কাজীপাড়ায় কিছু দিন পরপর পানি সংকট দেখা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘ভাকুর্তা প্ল্যান্টে যখনই পরিচালনাগত সমস্যা দেখা দেয়, তখন এসব এলাকায় পানি সরবরাহ ব্যাহত হয়।’
সম্প্রতি প্ল্যান্টটি প্রায় চার ঘণ্টা বন্ধ থাকায় সাময়িকভাবে পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। প্ল্যান্টটির স্বাভাবিক কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে এবং আশা করা যাচ্ছে, কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে, জানান তিনি।
এই প্রকৌশলী বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নগরীর পানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত, এটি শুধু প্রাকৃতিক সংকট নয়, পরিকল্পনার ব্যর্থতা। নগরায়ণের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না পরিষেবা পরিকল্পনা। ভূগর্ভস্থ পানির পাম্পের সংখ্যা বাড়ানো টেকসই সমাধান নয়; প্রয়োজন শোধিত ভূ-উপরিস্থ পানি।
আসাদুজ্জামানের তথ্যমতে, ভাকুর্তা প্ল্যান্টের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ১৫ কোটি লিটার হলেও বর্তমানে প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ লিটার পানি উত্তোলন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ১৩ কোটি লিটারের বেশি উত্তোলন করা সম্ভব হলে সাধারণত পানি সরবরাহ স্থিতিশীল থাকে। বর্ষা মৌসুমে পরিমাণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

পূর্ব শেওড়াপাড়ার মাহফুজ ক্লিনিকের কাছে ঢাকা ওয়াসার পাম্পিং স্টেশনের অপারেটর আবু হানিফ বলেন, এক বছর আগে স্টেশনটি থেকে প্রতি মিনিটে দুই হাজার ১০০ লিটার পানি উত্তোলন করা হতো। বর্তমানে পরিমাণ কমে মাত্র এক হাজার ২০০ লিটারে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ব্যাপকভাবে নিচে নেমে গেছে। বাসিন্দারা প্রায়ই অভিযোগ করেন, পানির চাপ কম। আরেকটি গভীর নলকূপ স্থাপন না করা হলে আমাদের তেমন কিছু করার নেই।’
নতুন নলকূপ স্থাপনের জন্য আশেপাশে উপযুক্ত কোনো জমিও নেই, বলেন হানিফ।
মনিপুর স্কুলের কাছে ওয়াসার আরেকটি পাম্পিং স্টেশনের কর্মী রেজাউল করিম বলেন, গত ডিসেম্বরে প্রতি মিনিটে এক হাজার ৮০০ লিটার পানি উত্তোলন করা যেত। বর্তমানে সেটি কমে এক হাজার ২০০ লিটারে নেমেছে।
তিনি বলেন, ‘এক দশক বছর আগে এখানে অনেক খালি জমি ও টিনশেড বাড়ি ছিল। এখন সেগুলোর বেশির ভাগই বহুতল ভবনে পরিণত হয়েছে, কিন্তু পানির নতুন কোনো উৎস তৈরি করা হয়নি।’
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, এ সংকটে প্রাকৃতিক ঘাটতির চেয়ে পরিকল্পনার ব্যর্থতাই বেশি প্রতিফলিত হয়।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘বৃহত্তর মিরপুর এলাকার মিরপুর, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া দীর্ঘদিন ধরেই ঘনবসতিপূর্ণ। মেট্রোরেল চালুর পর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য অতিরিক্ত পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ কোথায় থেকে আসবে? সরকার কি সেই পরিকল্পনা করেছে?’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি আদিল বলেন, ২০০০ সালের দিকে ঢাকায় ৩০ থেকে ৪০ মিটার গভীরতায় ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যেত। বর্তমানে তা প্রায় ১২০ মিটার গভীরে নেমে গেছে এবং প্রতি বছর প্রায় তিন মিটার করে নিচে নামছে।
তিনি বলেন, ‘মূল সমস্যা হলো নগর ও পরিষেবা পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব।’
‘ভূগর্ভস্থ পানির পাম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি কোনো টেকসই সমাধান নয়। উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার পাশাপাশি শোধিত ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়িয়ে ঢাকার পানির উৎসে বৈচিত্র্য আনতে হবে। সমন্বিত পরিকল্পনা না নিলে নগরীর পানি সংকট আরও তীব্র হবে।’