পঞ্চদশ সংশোধনী: কেন এসেছিল, কী বদলেছিল, কেন আবার আলোচনায়?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কয়েকটি সাংবিধানিক সংশোধনী বারবার আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম পঞ্চদশ সংশোধনী।
২০১১ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া এই সংশোধনী সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। তবে এর সবচেয়ে বড় ও বিতর্কিত পরিবর্তন ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ব্যবস্থাটি চালু হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট থেকে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেটিকেই তুলে দেওয়ার পর নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়।
পঞ্চদশ সংশোধনী শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই বাতিল করেনি; সংবিধানের মূলনীতি, গণভোট, রাষ্ট্রীয় পরিচয়, সংবিধান সুরক্ষাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও পরিবর্তন এনেছিল।
সর্বশেষ আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) আপিল বিভাগ হাইকোর্টের এ-সংক্রান্ত রায় বহাল রাখে। এর মধ্য দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আবার ফিরিয়ে আনা হলো। সেইসঙ্গে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের পথও তৈরি হলো।
পঞ্চদশ সংশোধনীতে কী কী পরিবর্তন আনা হয়েছিল?
পঞ্চদশ সংশোধনী ছিল বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম বড় পরিবর্তন। ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে এটি পাস হয়। এর আগে একই বছরের জুনে তৎকালীন আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ সংসদে সংশোধনী বিলটি উত্থাপন করেন। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এটি আইনে পরিণত হয়।
এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের অন্তত ৫৪টি জায়গায় পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা এবং নির্বাচিত সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রাখা হয়। এছাড়া, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে থাকা গণভোটের বিধানও বাতিল করা হয়।
সংবিধানে ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়, যেখানে সংবিধান বাতিল, স্থগিত বা এর মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়ে কঠোর বিধান রাখা হয়।
১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা পুনর্বহাল করা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি সংবিধানে ফিরিয়ে আনা হয়, তবে একই সঙ্গে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখা হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি প্রদর্শনের বিধানও করা হয়।
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়।
তবে সংশোধনীর কিছু বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়। বিশেষ করে সংবিধান থেকে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ শব্দগুচ্ছ বাদ দেওয়া নিয়ে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। কয়েকটি ইসলামপন্থী দল এর প্রতিবাদে কর্মসূচি দেয়। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীও সেই কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানায়।
কীভাবে পাস হয়েছিল এই সংশোধনী?
২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। ওই দিন সংসদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের ৩৯ জন সংসদ সদস্য এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) একজন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন না।
সংসদে থাকা একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম সংশোধনীর বিপক্ষে ভোট দেন। আর পক্ষে ভোট পড়ে ২৯১টি।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল চেতনার কিছু বিষয় ফিরিয়ে আনাই ছিল এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য।
তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতার সুযোগ সংকুচিত করা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কেন চালু হয়েছিল, কেন-ই বা বাতিল করা হয়?
বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল মূলত নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক সংকট থেকে।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়। বিরোধী দলগুলো দাবি করেছিল, দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়।
এই ব্যবস্থায় নির্বাচনের সময় ক্ষমতায় থাকা সরকার দায়িত্ব ছেড়ে দিত এবং একটি নির্দলীয় সরকার নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করে নির্বাচন আয়োজন করত। ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন এই ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হয়।
২০১১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যুক্তি ছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আওয়ামী লীগের প্রস্তাবেই ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধান থেকে বাতিল করা হয়। এই ব্যবস্থাকে ‘অসাংবিধানিক’ বলা হয়।
তবে আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে পরবর্তী দুই নির্বাচন পর্যন্ত এই ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। সরকার সেই সুযোগ না নিয়ে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুরোপুরি বাদ দেয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল নিয়ে আপত্তি কোথায় ছিল?
বিরোধী দলগুলো শুরু থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের বিরোধিতা করে। তাদের যুক্তি ছিল, বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সংকট রয়েছে। ফলে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করলে বিএনপিসহ বিরোধীদলগুলো এর তীব্র বিরোধিতায় নামে। এর কয়েক বছর পর ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন এলে বিএনপিসহ কয়েকটি দল তা বর্জন করে।
পরবর্তী ২০১৮ ও ২০২৪ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকারই ক্ষমতায় থাকে।
পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আদালতে যা হয়েছে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে নতুন করে আইনি উদ্যোগ শুরু হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তকারী এই সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করে ১৮ আগস্ট রিট করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজ উদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান।
রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে পরদিন ১৯ আগস্ট হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তকারী পঞ্চদশ সংশোধনীর বিধানগুলো কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।
পরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, গণফোরাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তি আদালতকে সহায়তা করতে ইন্টারভেনার হিসেবে মামলায় যুক্ত হন।
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি বিধান, বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত এবং গণভোটের বিধান বাতিলসংক্রান্ত অংশ অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদও বাতিল করা হয়।
তবে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল চেয়ে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন রিটকারীরা, নওগাঁর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। পাশাপাশি হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি লিভ টু আপিল করে শুনানিতে অংশ নেয়।
সর্বশেষ আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনার বিষয়ে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল থাকল।
তবে এই রায়েও পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হয়নি। আদালত শুধু কয়েকটি বিধান বাতিল করে বাকি বিষয় সংসদের বিবেচনার জন্য রেখেছেন।
গণভোটের বিধান কী ছিল ও কেন বাতিল করা হয়েছিল?
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে আগে গণভোটের বিধান ছিল। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার সুযোগ ছিল এই ব্যবস্থায়। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিধান বাতিল করা হয়।
সরকারের যুক্তি ছিল, সংসদীয় গণতন্ত্রে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
তবে সমালোচকদের বক্তব্য ছিল, সংবিধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামতের সুযোগ থাকা উচিত।