শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড: সংবাদপত্রে যা লেখা হয়েছিল, যা লেখা হয়নি
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। সেদিন ছিল শুক্রবার। ওই সকালে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছানো সংবাদপত্রের প্রধান বিষয় ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।
সেদিন তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে যাওয়ার কথা ছিল। এ উপলক্ষে পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছিল। তার নতুন রাজনৈতিক দর্শন বাকশাল নিয়েও ছিল বিস্তারিত আলোচনা।
কিন্তু পাঠকের হাতে ওই সংবাদপত্র পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা আগেই শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এরপর ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্রের ভাষা ও উপস্থাপনাও বদলে যায়। ১৬ আগস্ট থেকেই এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৫ আগস্টের পত্রিকায় শেখ মুজিব ছিলেন মহান নেতা, জাতির পিতা ও দ্বিতীয় বিপ্লবের স্বপ্নদ্রষ্টা। এক দিন পরই তাকে অজনপ্রিয় ও কঠোর শাসক হিসেবে তুলে ধরা হয়। সংবাদপত্রের পাতা এবং জাতীয় জীবন থেকে তার উপস্থিতিও যেন রাতারাতি মুছে যেতে থাকে। এমনকি সরকারি নির্দেশে তার ছবি জব্দ করা হয়।
১৫ আগস্টের পর প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলো খন্দকার মোশতাক আহমদ সরকার এবং সেনাবাহিনীর একটি অংশের কঠোর নজরদারির মধ্যে ছিল। তাদের অনুমোদন ও অনুমতি ছাড়া কোনো কিছু প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
তাই ওই সময়ের সংবাদপত্রকে শুধু প্রকাশিত তথ্য দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। তারা কী প্রকাশ করেছিল, তার পাশাপাশি কী প্রকাশ করেনি, কোন ভাষা ব্যবহার করেছিল এবং কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছিল, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণকে বলা হলো ‘ঐতিহাসিক’ ও ‘জাতীয় স্বার্থে’
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সংবাদপত্র ছিল দৈনিক ইত্তেফাক। একসময় পত্রিকাটি আওয়ামী লীগের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ছিল।
১৬ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাক ‘খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর শাসনক্ষমতা গ্রহণ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘জাতির বৃহত্তর স্বার্থে’ খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী আগের দিন শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছে। ক্ষমতা গ্রহণের সময় শেখ মুজিবুর রহমান নিজ বাসভবনে নিহত হন।
সেদিন রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে নতুন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ দেশবাসীকে শান্তি ও শৃঙ্খলার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তিনি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখার কথাও বলেন। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি সব সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, ‘দেশে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং মানুষ যাতে মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, সেজন্য সমাজে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ আগস্ট ১৯৭৫)
প্রতিবেদনে খন্দকার মোশতাকের শপথ গ্রহণ এবং বিভিন্ন বাহিনীর নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের খবরও গুরুত্ব পায়। তিন বাহিনীর প্রধান, বাংলাদেশ রাইফেলসের মহাপরিচালক, রক্ষীবাহিনীর অস্থায়ী মহাপরিচালক এবং পুলিশের আইজিপি নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।
দৈনিক বাংলাও একই দিন খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা গ্রহণের খবর প্রকাশ করে। পত্রিকাটির প্রধান শিরোনাম ছিল ‘খন্দকার মোশতাক নয়া রাষ্ট্রপতি’।
এতে শপথ গ্রহণ এবং বিভিন্ন বাহিনীর আনুগত্য প্রকাশের খবর ছিল। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিস্তারিত কোনো তথ্য মূল প্রতিবেদনে ছিল না।
দৈনিক বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে’ বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতাচ্যুত করে খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। ক্ষমতা গ্রহণের সময় শেখ মুজিব নিজ বাসভবনে নিহত হন।
বাসসের (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা) বরাতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সামরিক আইন ও কারফিউ জারি করা হয়েছে। জুমার নামাজের সুবিধার জন্য দুপুরের পর দেড় ঘণ্টার জন্য কারফিউ তুলে নেওয়া হয়।
এখানে ‘বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ’ কথাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার উৎখাতের ঘটনাকে এই ভাষায় তুলে ধরা হয়েছিল।
‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ ও ‘ঐতিহাসিক নবযাত্রা’
এই শব্দগুলোর ব্যবহারে সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে তাদের নীতি ও অবস্থান প্রতিফলিত হয়। ১৬ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক বাংলা উভয় পত্রিকাই প্রথম পাতায় সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। ইত্তেফাকের সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল ‘ঐতিহাসিক নবযাত্রা’। দৈনিক বাংলার সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’।
ইত্তেফাকের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, দেশের ও জাতির একটি ঐতিহাসিক প্রয়োজন পূরণের জন্য সশস্ত্র বাহিনী খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে সরকারের সব ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। আগের সরকারকে উৎখাত করে মোশতাক রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন। বাংলাদেশ রাইফেলস, পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর প্রধানরাও নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন।
সম্পাদকীয়তে স্বাধীনতার পর সাড়ে তিন বছরে মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধানের কথা বলা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, স্বাধীনতার পর মানুষ হতাশা ও বঞ্চনা ছাড়া তেমন কিছু পায়নি।
দৈনিক বাংলার সম্পাদকীয়র ভাষাও ছিল প্রায় একই। সেখানে বলা হয়, জাতীয় জীবনে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেছে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বাংলাদেশ রাইফেলস, রক্ষীবাহিনী ও পুলিশ নতুন রাষ্ট্রপতির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে।
সম্পাদকীয়তে দাবি করা হয়, জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারাও এই ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপকে’ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্থন করেছেন।
ইংরেজি পত্রিকাতেও একই সুর
তৎকালীন ইংরেজি দৈনিক দ্য বাংলাদেশ অবজারভার ও দ্য বাংলাদেশ টাইমসও ১৬ আগস্ট প্রথম পাতায় ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে।
বাংলাদেশ অবজারভারের সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল ‘Historical Necessity’। সেখানে খন্দকার মোশতাকের ভাষণের বরাত দিয়ে বলা হয়, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ এবং ‘ঐতিহাসিক প্রয়োজনের’ কারণে সশস্ত্র বাহিনী দেশের প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়েছে। সম্পাদকীয়তে এই পরিবর্তনকে দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণের সুযোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এতে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখলের অভিযোগও তোলা হয়।
বাংলাদেশ টাইমসের সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল ‘On the threshold of a new era’। এতে শুক্রবার ভোরের ক্ষমতার পরিবর্তনকে দেশের জন্য নতুন সুযোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সাংবিধানিকভাবে পরিবর্তন আনা সম্ভব না হওয়ায় সশস্ত্র বাহিনী সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে বলেও সম্পাদকীয়তে দাবি করা হয়।
বাংলাদেশ অবজারভার ও বাংলাদেশ টাইমস উভয় পত্রিকাই ক্ষমতার পরিবর্তনকে নতুন আশার সূচনা হিসেবে তুলে ধরে। বাংলাদেশ টাইমসের ভাষায় এই পরিবর্তন ছিল শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ক্ষমতার পালাবদল ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত ঘটনা।
শেখ মুজিব ও তার পরিবারের হত্যাকাণ্ডের খবর কোথায়?
১৫ আগস্ট সকালে বাংলাদেশ বেতারে মেজর ডালিমের ঘোষণার মাধ্যমে দেশের মানুষ শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার খবর জানতে পারে। কিন্তু ১৬ আগস্টের সংবাদপত্রগুলোতে তার হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত কোনো প্রতিবেদন ছিল না।
একটি দেশের রাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গবন্ধুর মতো গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতার সপরিবারে হত্যাকাণ্ড সাধারণ পরিস্থিতিতে সংবাদপত্রে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হওয়ার কথা। কিন্তু সে সময় তা হয়নি।
দৈনিক ইত্তেফাক শুধু লিখেছিল, ‘শাসনভার গ্রহণকালে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান স্বীয় বাসভবনে নিহত হয়েছেন।’ দৈনিক বাংলাতেও তার নিহত হওয়ার কথা জানানো হয়। কে তাকে হত্যা করেছে বা কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য ছিল না।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, শেখ মুজিবের স্ত্রী বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব, তার তিন ছেলে, পুত্রবধূ এবং ছোট ছেলে শেখ রাসেলের হত্যার খবরও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি। শেখ মনি ও সেরনিয়াবাত পরিবারের হত্যাকাণ্ডের খবরও ছিল না।
১৫ আগস্টের প্রথম প্রহরে শেখ মুজিবসহ মোট ১৮ জন নিহত হন। সেনা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলও নিহত হন। কিন্তু তার মৃত্যুর খবরও সংবাদপত্রে জায়গা পায়নি।
২৩ শব্দে শেখ মুজিবুর রহমানের দাফনের খবর
১৫ আগস্টের পর সংবাদপত্রগুলো শুধু শেখ মুজিবের হত্যার বিস্তারিত প্রকাশ করেনি, তার দাফনের খবরও প্রায় এড়িয়ে যায়।
১৮ আগস্ট দ্য বাংলাদেশ অবজারভার ‘Mujib buried at Tungipara’ শিরোনামে মাত্র ২৩ শব্দের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
এতে বলা হয়, ‘The body of former President Sheikh Mujibur Rahman was airlifted to Tungipara on Saturday and buried with full honor at his family yard.’
অর্থাৎ, সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মরদেহ শনিবার টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তার পারিবারিক আঙিনায় পূর্ণ মর্যাদায় দাফন করা হয়।
তৎকালীন অন্য কোনো সংবাদপত্রে তার দাফনের খবর যথাযথভাবে প্রকাশিত হয়েছিল বলে এই গবেষণায় উল্লেখ নেই। ওই ছোট প্রতিবেদনেও শেখ মুজিবের কোনো ছবি প্রকাশিত হয়নি।
শেখ মুজিবের ছবি জব্দ
সাংবাদিকতার সাধারণ নিয়মে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মৃত্যুর খবরের সঙ্গে তার ছবি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের সংবাদপত্রে শেখ মুজিবের কোনো ছবি দেখা যায়নি। শুধু সংবাদপত্র নয়, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে থাকা তার ছবিও জব্দ করা হয়েছিল।
১৭ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাকে এ বিষয়ে ‘প্রামাণ্য ছবি ও সংবাদচিত্র প্রত্যাহার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এতে বলা হয়, ১৪ আগস্ট বা তার আগে তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত সব প্রামাণ্য ছায়াছবি ও সংবাদচিত্র প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মোশতাকের স্বীকৃতির সংবাদ
বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো যখন ১৯৭৫ সালের ক্ষমতার পরিবর্তনকে শান্তিপূর্ণ ও ঐতিহাসিক হিসেবে তুলে ধরছিল, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তখন শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করছিল।
অন্যদিকে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগের খবর গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
১৭ আগস্ট সৌদি আরব ও সুদানের মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার খবর প্রকাশ করে দৈনিক বাংলা। রয়টার্সের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরব ও সুদান বাংলাদেশ এবং নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সৌদি বাদশাহ খালিদ এবং সুদানের প্রেসিডেন্ট জাফর নিমেইরি খন্দকার মোশতাককে অভিনন্দনবার্তা পাঠান।
পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বীকৃতির খবরও প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ অবজারভারের প্রথম পাতায় ‘Soviet Union gives recognition’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
এতে বলা হয়, সোভিয়েত সরকার বাংলাদেশের নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে।
পরবর্তী কয়েক দিনেও ইয়েমেন, যুক্তরাজ্য, জর্ডান, জাপান, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি ও সমর্থনের খবর প্রকাশিত হতে থাকে।
ভারতের প্রতিক্রিয়াও গুরুত্ব পেল
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। দেশটি সামরিক ও মানবিক সহায়তা দিয়েছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কও ছিল। ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২৫ বছরের মৈত্রী চুক্তি সই হয়।
ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং তার সরকারের পতনের পর ভারতের অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে আগ্রহ ছিল। এই কারণে ১৭ আগস্ট বাংলাদেশের প্রায় সব সংবাদপত্রেই ভারতের প্রতিক্রিয়া গুরুত্ব পায়।
দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম ছিল, ‘ভারতীয় মুখপাত্র বলেন: বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’।
প্রতিবেদনে বলা হয়, খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণকে ভারত সরকার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখছে।
ভারতীয় মুখপাত্র বলেন, প্রতিবেশী দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলে ভারত তা নিয়ে নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
উপমহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব অব্যাহত রাখার কথাও বলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির টানাপোড়েন ছিল। নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্য সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশকে সহযোগিতা না করার অভিযোগও রয়েছে।
বঙ্গবন্ধু সরকার উৎখাত ও হত্যাকাণ্ডে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে মোশতাক সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সরকারের সম্পর্কের প্রকৃতি ও মাত্রা নির্ধারণ করা কঠিন।
তবে ওই সময়ের সংবাদপত্রে দুই দেশের সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
২০ আগস্ট দৈনিক বাংলার একটি শিরোনাম ছিল ‘ব্যাপক মার্কিন সাহায্য অব্যাহত থাকবে’।
ওয়াশিংটন থেকে এএফপির পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নতুন সরকারকে বিপুল পরিমাণ সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রাখবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেন, অতীতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গভীর সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। নতুন সরকারের সঙ্গেও স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত।
ওই মুখপাত্র আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত। তবে তখনও ঢাকার পক্ষ থেকে স্বীকৃতির জন্য কোনো অনুরোধ পাওয়া যায়নি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের আগে ও পরের কয়েক দিনের সংবাদপত্র পাশাপাশি রাখলে একটি বড় পরিবর্তন চোখে পড়ে।
১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সংবাদপত্রের প্রধান চরিত্র। পরদিনই তার হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার খবরও প্রকাশিত হয়নি।
বরং নতুন ক্ষমতাকাঠামোকে ‘ঐতিহাসিক’, ‘প্রয়োজনীয়’ এবং ‘জাতীয় স্বার্থে’ নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়। একই সময়ে বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি এবং নতুন সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের খবর গুরুত্ব পেতে থাকে।
অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রও দ্রুত বদলে যায়। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের হত্যাকাণ্ডের বদলে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা তৈরির বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়।
এই কারণে ওই সময়ের সংবাদপত্রকে শুধু ঘটনার নিরপেক্ষ দলিল হিসেবে পড়লে পুরো ইতিহাস ধরা যাবে না। তারা কী লিখেছিল, তার পাশাপাশি কী লেখেনি, কোন ভাষা ব্যবহার করেছিল এবং কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছিল, সেগুলোও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পাঁচ দশক পর এসব সংবাদপত্র তাই শুধু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের একটি অন্ধকার অধ্যায়ের সাক্ষ্য নয়।
এগুলো দেখায়, একটি বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রের ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের ভাষ্যও কত দ্রুত বদলে যেতে পারে।
(লেখক, সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)
minhaz_uddin_du@yahoo.com