তারেকের দিকে ঝুঁকছে ভারত, হাসিনার ব্যাপারে শীতলতা?
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লি ফিরে যান। পরদিনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেন। এ থেকে অন্তত বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়তে ভারতের ইচ্ছার আভাস পাওয়া যায়।
কাকতালীয়ভাবে যেদিন দীনেশ ত্রিবেদী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন, সেদিনই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) প্রধান পরাগ জৈনও ঢাকায় ছিলেন।
আর এই ঘটনা ঘটে দিল্লিতে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বহুল আলোচিত একটি সংবাদ সম্মেলনের এক সপ্তাহ না যেতেই।
গত ৫ আগস্ট দিল্লির সাউথ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। এর আগে বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে ভারতকে সতর্ক করেছিল। অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ যে ভাষায় তার আপত্তি জানিয়েছিল তাতে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের খুব একটা বালাই ছিল না।
অবশ্য ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল সংযত। দিল্লি পরিষ্কার করে জানায়, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে আয়োজন করা।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশের ‘বৈধভাবে গঠিত’ সরকার নিয়ে হাসিনা যে মন্তব্য করেছেন, ভারত সরকার তা সমর্থন করে না।
নরেন্দ্র মোদি সরকারের অবস্থানের পরিবর্তন বেশ চোখে পড়ার মতো। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের আচরণ দেখে মনে হয়েছিল, ২০২৪-এর আগস্টে তারা যেন একটি উপনিবেশ হারিয়ে তাদের ভাইসরয়কে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
কিন্তু এখন দিল্লির বার্তা অনেকটাই পরিষ্কার। বিএনপি নির্বাচনে জেতার আগেই ভারতের পক্ষ থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। দিল্লি বুঝিয়ে দিয়েছিল, তারা তারেক রহমানের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
এখন তারেক রহমান নির্বাচিত হয়ে সরকারপ্রধান হওয়ায় ভারতের লক্ষ্য বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী না করতে পারলেও অন্তত টানাপোড়েন কমানো।
তবে এর মধ্য দিয়ে আরেকটি বার্তাও বেশ পরিষ্কার। মোদি সরকার ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো থেকে আটকাতে খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না।
যতক্ষণ এসব অনুষ্ঠান ‘ব্যক্তিগতভাবে’ আয়োজন করা হচ্ছে, ততক্ষণ ভারত সরকার নিজে থেকে তা বন্ধ করার উদ্যোগ নেবে না—এমনটাই এখনো দেখা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে তা করবে—এমন কোনো প্রতিশ্রুতিও ভারত দেয়নি।
বিষয়টি নিয়ে এত আলোচনা হওয়ার কারণ হলো, সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের একটি অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তারেক কি বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে অংশ নেবে না বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই নিয়ে আলোচনা ছিল। অংশ নেবার ব্যাপারে কিছুটা সংশয়ও ছিল। এ প্রসঙ্গে কথা উঠলে ভারত জোর দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
জয়সওয়াল বলেন, ভারত তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্যও আমন্ত্রণ জানিয়েছে। একই সঙ্গে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনেও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি দুই দেশেই আগামী সপ্তাহে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। ফলে আরেকটা প্রশ্নেরও খানিকটা জবাব মিলছে। ভারতের মাটিতে হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ না করলে তারেকের ভারত সফর অনিশ্চিত থাকবে—এমন যে আলোচনা চলছিল, তা হয়তো আর থাকছে না।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর তার সরকারের কঠোর দমন-পীড়ন নিয়ে হাসিনা এখনো কোনো অনুশোচনা দেখাননি। শত শত আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার ঘটনাতেও তিনি নিজের অবস্থান বদলাননি।
তার সাম্প্রতিক উস্কানিমূলক বক্তব্যগুলো জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির জোটের গাত্রদাহের কারণ হয়েছে। তাই বিরোধী পক্ষ জোর দিয়ে বলছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগে হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করতে হবে এবং তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
এখানে আপাতভাবে একটি স্ববিরোধী বিষয় চোখে পড়ে।
জামায়াত ও এনসিপি হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু হাসিনা নিজেই যখন দেশে ফেরার ঘোষণা দেন, তখন তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়। সম্ভবত সমস্যাটা হাসিনার ফিরে আসা নিয়ে নয়। তিনি কীভাবে ফিরবেন তা নিয়ে।
হাসিনা যদি নিজের ইচ্ছায় ফিরলে অনেকটা রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হবে। কিন্তু বিরোধী দলগুলো এবং সরকারি দলও এই ব্যাপারে পরিষ্কার। তারা চায় হাসিনা যেন একজন দণ্ডিত আসামি হিসেবে ভারত থেকে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে দেশে ফেরেন।
এ ছাড়া বিরোধী দলগুলো ভারতের বিরুদ্ধেও বেশ সরব। তারা সাধারণ মানুষের প্রবল ভারতবিরোধী মনোভাবকে উস্কিয়ে রেখে তাদের বিরোধিতা আরও শক্তিশালি করতে চেষ্টা করছে এবং করবে।
এটাও সহজে ভোলার মতো বিষয় না যে, শেখ হাসিনার সরকারের জন্য প্রতিবেশী ভারত দীর্ঘদিন ধরে শক্তির বড় উৎস ছিল এবং এখনও আছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারও ভারতকে নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। বড় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক ধরে রাখা বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনীয়।
তার ওপর আগে ভারতের না গিয়ে, তারেক রহমানের চীন সফর এবং এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার বিষয়টি দিল্লিকে কিছুটা চিন্তায় ফেলবে বৈকি।
ভারতের নিজের উঠানেই বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে হয়তো মোদি সরকারের কিছুটা তড়িঘড়ি। সব মিলিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে মোদির বৈঠক পরে না হয়ে আগেই হওয়ার সম্ভাবনাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা যেতে পারে।
তবে দেশের ভেতরের রাজনীতিতে আগে একটা ভারসাম্য তৈরি করতে হবে তারেক রহমানকে। তারপরই বিদেশের সম্পর্কের দিকে মনযোগ দিতে পারবেন। হাসিনার প্রতি গভীরভাবে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে তাকে বোঝাতে হবে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার অর্থ হাসিনার বিচারের দাবি থেকে সরে আসা নয়। বরং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি করেই সেই বিচারের দাবিকে আরও জোরালো করা সম্ভব।
একই সঙ্গে দিল্লি এবার একটি বিষয় বুঝবে বলে আশা করা যায় যে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে না।