সম্পর্কে ‘নতুন সূচনা’ চায় ঢাকা ও নয়াদিল্লি
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘নতুন সূচনার’ ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। এর মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী তিক্ততা কাটিয়ে সমতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আলোচনার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার আভাস মিলেছে এই পদক্ষেপে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পরদিন অর্থাৎ গতকাল সোমবার ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকেই মূলত ওই বার্তাটি দেওয়া হয়।
ত্রিবেদী প্রথমে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। গত ১২ জুন ঢাকায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এটিই ছিল তার প্রথম সাক্ষাৎ।
গতকাল বিকেলেই ত্রিবেদী দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, ঢাকায় হওয়া আলোচনার বিষয়গুলো জানাতেই তার এই ঝটিকা সফর। বিশেষ করে, গত ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত ও দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে যে বক্তব্য দেন, সেটি নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি এর অন্যতম কারণ।
ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্য ঢাকা একেবারেই ভালোভাবে নেয়নি এবং তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। অথচ এ বিষয়ে ঢাকার আপত্তির কথা আগেই দিল্লিকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছিল।
তারেক রহমানের সঙ্গে ত্রিবেদীর সাক্ষাতের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে খলিলুর রহমান বলেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ বিচার বিভাগের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন। আর ভারত সরকারও তাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আশা করব আমাদের রাষ্ট্রের কোনো স্তম্ভকে খাটো করার কিছু তারা আর করবে না। তাদের সঙ্গে আমার যা কথা হয়েছে আমি কিছুটা হলেও আশ্বস্ত, এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। সেই থেকেই ‘হাসিনা ইস্যুটি’ দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
খলিলুর রহমান জানান, শেখ হাসিনা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়ার (প্রত্যর্পণ) জন্য দিল্লিকে অনুরোধ করেছে ঢাকা।
তিনি বলেন, হাদির সন্দেহভাজন খুনিদের বিষয়ে ভারত যেসব নথিপত্র চেয়েছিল, বাংলাদেশ তা এরইমধ্যে সরবরাহ করেছে।
খলিলুর রহমান আরও বলেন, এটি আমাদের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। আমরা অনুরোধ করেছি যেন এই খুনিদের যত দ্রুত সম্ভব আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
তবে ভারতীয় হাইকমিশনার ত্রিবেদী জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় আইনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই ভারত এই প্রত্যর্পণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
এ ছাড়া সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন (অনুপ্রবেশ), পানিবণ্টন এবং বাণিজ্য সংক্রান্ত বিধিনিষেধ—যেসব সমস্যা দুই দেশের মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে—সেগুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
খলিলুর রহমান জানান, তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে এই বিষয়গুলো নিয়ে খুব সংক্ষেপে কথা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ত্রিবেদী সাক্ষাৎ করে যাওয়ার পর এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটসহ নানা দিক থেকে বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে সুদৃঢ় করতে একটি নতুন সূচনা বা ফ্রেশ স্টার্ট জরুরি।
তিনি উল্লেখ করেন, বিদ্যমান মতভেদগুলো আলোচনা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব, তবে এ ক্ষেত্রে ভারতকে আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে সমতার ভিত্তিতে।
অন্যদিকে, ভারতীয় হাইকমিশনার ত্রিবেদীও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ থাকার বিষয়টিকে তিনি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটি স্বাভাবিক অংশ এবং ‘গণতন্ত্রের সৌন্দর্য’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, এ ধরনের মতভেদ ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। দুই দেশের মানুষই এমন একটি শক্তিশালী সম্পর্ক চায় যা উভয় পক্ষের জন্যই কল্যাণকর হবে।
ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ত্রিবেদী তারেক রহমানের কাছে একটি ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
ত্রিবেদী বলেন, খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। আমাদের যেমন কিছু অমীমাংসিত বিষয় আছে, তেমনি বাংলাদেশেরও আছে। কিন্তু দিনশেষে জনগণের কাছে একটিই বড় বিষয়, আর তা হলো—সুসম্পর্ক। এমন কোনো সমস্যা নেই যা আমরা একসঙ্গে বসে সমাধান করতে পারি না।
তিনি জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
ত্রিবেদী তারেক রহমানকে অত্যন্ত বিনয়ী ও ‘মাটির মানুষ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তাকে দেখে মনেই হয়নি যে আমি তার সঙ্গে প্রথমবার দেখা করছি। তিনি খুব ভালো একজন মানুষ, অত্যন্ত বিনয়ী এবং সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকেন। আমাদের আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে এবং আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছি।
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেক চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান যোগ দেবেন কি না, বা তিনি ভারত সফর করবেন কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, আমন্ত্রণটি ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আসেনি, বরং বিমসটেকের চেয়ারম্যানের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে। এই পার্থক্যটা আপনারা বোঝার চেষ্টা করবেন।
একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, তারেক রহমান যদি সম্মেলনে যোগ না দেন, তবে সম্মেলনের কাছাকাছি সময়ে ঢাকা তার জন্য দিল্লিতে আলাদা একটি সফরের আয়োজন করার চেষ্টা করতে পারে।
ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান ইতিবাচক আমেজের প্রেক্ষাপটে তারা এখন প্রস্তুত। তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের বিষয়ে উভয় পক্ষ থেকে একটি ইতিবাচক সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছে তারা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের সফরের জন্য উভয় দেশেরই ব্যাপক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। যেহেতু এখানে অনেক মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন খাত জড়িত, তাই আমাদের এমনভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে যেন সেই সফর থেকে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর কোনো ফলাফল পাওয়া যায়।