হাজার টাকার নোট ইঁদুর-উইপোকা কেটে ফেললে কী করবেন? যা বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক
পরিবারের ভবিষ্যৎ ও জরুরি প্রয়োজনের কথা চিন্তা করে প্রায় ২ লাখ টাকা জমিয়েছিলেন গাইবান্ধার কৃষক তোফাজ্জল হোসেন।
টাকাগুলো একটি কাঠের আলমারিতে রেখেছিলেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের এই বৃদ্ধ।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৭ আগস্ট বিকেলে আলমারি খুলে তিনি দেখেন, তার কষ্টার্জিত জমানো সব টাকা উইপোকা ও ইঁদুর কেটে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে।
এ দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন কৃষক তোফাজ্জল ও তার পরিবার। নিঃস্ব এই কৃষক দম্পতির পাশে দাঁড়িয়ে ইঁদুর ও উইপোকা কেটে দেওয়া নোটগুলো বদলে দিতে সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এখন প্রশ্ন উঠছে বৃদ্ধ তোফাজ্জল তার এই টুকরো টুকরো নোটগুলো নিয়ে কী করতে পারেন? কোনোভাবে কি উইপোকা কেটে দেওয়া এই নোটগুলো ফেরত দিয়ে নতুন টাকা পাওয়ার সুযোগ আছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত, ছেঁড়া-ফাটা কিংবা বিকল নোট গ্রহণ ও বিনিময় করতে বাধ্য।
গাইবান্ধার গ্রামের ওই বৃদ্ধের নোটগুলো ফেরত দেওয়া যেতে পারে কি না, জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এটা আসলে আবেগের বিষয় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছেঁড়া-পোড়া নোট বাজার থেকে তুলে নিয়ে তার বিনিময় মূল্য পরিশোধ করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে একটা পদ্ধতি আছে। এজন্য কমিটিও আছে। তারাই বলতে পারবেন যে, কোন নোটের বিনিময় হয়, আর কোনটার হয় না।'
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক নোট প্রত্যর্পণ প্রবিধান ২০২৫ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচ্ছন্ন নোট নীতিমালা অনুসরণ করা যেতে পারে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ছেঁড়া-ফাটা ও অপ্রচলনযোগ্য নোট বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করে ব্যাংকের মাধ্যমে জমা করতে হবে। জমা হওয়া এসব নোট পরে বাংলাদেশ ব্যাংক যথাযথ প্রক্রিয়ায় ধ্বংস করবে।
এছাড়া, বাজারে অপ্রচলনযোগ্য ও ত্রুটিপূর্ণ ময়লাযুক্ত, ছেঁড়া-ফাটা, আগুনে ঝলসানো, ড্যাম্প, মরিচাযুক্ত, অধিক লেখা-লেখি ও খণ্ড-বিখণ্ড নোট বাজার থেকে প্রত্যাহার করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নোট প্রত্যর্পণ প্রবিধান অনুযায়ী উইপোকা বা ইঁদুর কাটা নোটগুলোকে 'দাবিযোগ্য' নোট বলা যেতে পারে।
দাবিযোগ্য নোট বলতে বোঝায় যার টিকে থাকা অংশের পরিমাণ ৯০ শতাংশ বা তার কম। এছাড়া, স্যাঁতসেঁতে নোট, অধিক জরাজীর্ণ নোট, রং কিংবা কালি দিয়ে বিকৃত, দুইয়ের বেশি খণ্ডে খণ্ডিত এবং বিকৃত নোটও দাবিযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।
দাবি উপস্থাপন ও নিষ্পত্তি
গাইবান্ধার কৃষক তোফাজ্জল এখন তার ওই টুকরো টুকরো নোটগুলো বিনিময়ের জন্য সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাউন্টারে কিংবা যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে দাবি উপস্থাপন করতে পারেন।
প্রবিধান অনুযায়ী, যে কার্যালয়ে নোটে 'দাবিযোগ্য' শব্দ দিয়ে সিল মারা হবে সে অফিসের মাধ্যমে দাবি নিষ্পত্তি করা হবে। সিলযুক্ত হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে দাবির আবেদন করতে হবে। আবেদন করার ৮ সপ্তাহের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি করতে হবে।
তফসিলি ব্যাংকের শাখার মাধ্যমেও নোট সম্পর্কিত দাবির আবেদন করা যাবে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা আবেদনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকটস্থ অফিসে পাঠাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা আরিফ হোসেন বলেন, 'তিনি (তোফাজ্জল) রংপুর বা বগুড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে পারেন। আবার স্থানীয় অন্য কোনো ব্যাংকের শাখায়ও যোগাযোগ করতে পারেন। কাছাকাছি সোনালী ব্যাংক বা কৃষি ব্যাংকের শাখায় যোগাযোগ করলে সঠিক পরামর্শ পাবেন।'
দাবির নিয়ম
ছেঁড়া-ফাটা নোটের বিনিময় মূল্য পেতে দাবির বিষয়ে কিছু সাধারণ নিয়ম নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
যেমন: উপস্থাপিত নোট বা নোটের খণ্ড আসল নোটের বৈশিষ্ট্যের হতে হবে, না হলে নোটের দাবি প্রত্যাখ্যান করা হবে। বিকৃত ও গরমিল নোটের দাবি প্রত্যাখ্যান করা হবে।
স্যাঁতসেঁতে নোটের বৈশিষ্ট্য ও খাঁটিত্ব সম্পর্কে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সন্তুষ্ট না হলে নোটের দাবি প্রত্যাখ্যান করা হবে।
ইচ্ছাকৃতভাবে কাটা, ছেঁড়া বা ছিদ্র করা নোট বা নোটের অংশকে দাবিযোগ্য নোট হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সে দাবিও প্রত্যাখ্যান করা হবে।
দাবির নিষ্পত্তি
নোট প্রত্যর্পণ প্রবিধান অনুযায়ী, একক নোটের অবিচ্ছিন্ন বা একক খণ্ডের ক্ষেত্রে উপস্থাপিত নোটের ৯০ শতাংশের বেশি অংশ টিকে থাকলে নোটের মূল্যমানের শতভাগ মূল্য পরিশোধ করা হবে।
একক নোটের অবিচ্ছিন্ন বা একক খণ্ডের ৭৫-৯০ শতাংশ টিকে থাকলে ৭৫ শতাংশ মূল্য পরিশোধ করা হবে।
নোটের অবিচ্ছিন্ন বা একক খণ্ডের ৫১-৭৫ শতাংশ টিকে থাকলে ৫০ শতাংশ মূল্য পরিশোধ করা হবে।
একাধিক খণ্ডে খণ্ডিত নোটের ক্ষেত্রে উপস্থাপিত নোটের দুই পাশের নম্বর অক্ষত থাকলে এবং নম্বর সম্বলিত খণ্ডের একত্রিত আয়তন ন্যূনতম ৬০ শতাংশ বিদ্যমান থাকলে নোটের মূল্যমানের ৫০ শতাংশ পরিশোধ করা হবে।
তবে একক নোটের অবিচ্ছিন্ন বা একক খণ্ডের ন্যূনতম ৫১ শতাংশ না থাকলে ওই নোটের দাবি প্রত্যাখ্যান করা হবে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রয়োজন হলে উপস্থাপিত নোটের বিষয়ে যে কোনো তথ্য তলব বা তদন্ত করতে পারেন। নোট আসল কি না, এমন সন্দেহ হলে তিনি বিশেষজ্ঞ মতামতের জন্য প্রয়োজনে সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে পাঠাতে পারেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, 'একজন গরিব মানুষের টাকা যদি এভাবে নষ্ট হয়ে যায়, এটার জন্য আসলে দুঃখপ্রকাশ করার ভাষা নেই।'
'ব্যাংকের মাধ্যমে তার কতটুকু উপকার হবে তা নির্ধারণ হবে আইন দ্বারা। কিন্তু আমি বলব এভাবে দুই লাখ টাকা বাড়িতে জমিয়ে না রেখে ব্যাংকে রাখা উচিত,' বলেন আরিফ হোসেন খান।


