১৬ বছর ধরে নিষ্ক্রিয় পপুলেশন কাউন্সিল, বাড়ছে প্রজনন হার
বাংলাদেশের জনসংখ্যা নীতি ঠিক করা, এর বাস্তবায়ন দেখভাল করা এবং প্রয়োজন হলে নীতিতে পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব ন্যাশনাল পপুলেশন কাউন্সিলের (এনপিসি)। কিন্তু সেই কাউন্সিলই গত ১৬ বছর ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয়। সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে। এর মধ্যে দেশে দুটি নতুন জনসংখ্যা নীতি হয়েছে, অথচ কাউন্সিলের একটি বৈঠকও হয়নি। কাউন্সিলটি এমন একটা সময়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে, যখন বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ দশকের মধ্যে প্রথমবার মোট প্রজনন হার (টিএফআর) বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রজনন হার বাড়লে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য বাড়তে পারে, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য এবং অপুষ্টির পরিস্থিতিও খারাপ হতে পারে।
কাউন্সিলটি নিষ্ক্রিয় থাকায় এর দুটি বাস্তবায়নকারী সংস্থাও কার্যত অচল হয়ে আছে। এর একটি হলো স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন নির্বাহী কমিটি। অন্যটি স্বাস্থ্যসচিবের নেতৃত্বাধীন একটি টাস্কফোর্স।
এই সময়ে বাংলাদেশ দুটি জাতীয় জনসংখ্যা নীতি গ্রহণ করেছে, ২০১২ সালে একটি এবং ২০২৫ সালে আরেকটি। কিন্তু এই দুই নীতি গ্রহণের সময় কাউন্সিলের একটিও বৈঠক হয়নি। অথচ পপুলেশন কাউন্সিলের দায়িত্বই হলো নীতি বাস্তবায়নে দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে নীতিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া।
এদিকে সর্বশেষ জনসংখ্যা নীতিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাউন্সিলের সচিবালয় হিসেবে কাজ করবে এবং বছরে অন্তত একবার কাউন্সিলের বৈঠকের আয়োজন করবে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ন্যাশনাল পপুলেশন কাউন্সিল নতুন করে গঠন করা হয়। তখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে কাউন্সিলের চেয়ারম্যান করা হয়েছিল।
তবে নতুন করে গঠনের পরও এখন পর্যন্ত কাউন্সিলের কোনো বৈঠক হয়নি। কাউন্সিল পুনর্গঠনের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, বছরে অন্তত দুবার এর বৈঠক করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক আমিনুল হক বলেন, আমাদের জাতীয় পরিকল্পনার সব ক্ষেত্রেই জনসংখ্যাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কাউন্সিলটি নিষ্ক্রিয় থাকায় বোঝা যায়, জনসংখ্যাকে যে গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল, আমরা তা দিতে পারিনি।
তার মতে, শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর না দিয়ে জনসংখ্যা কীভাবে ভালোভাবে পরিচালনা করা যায় এবং দেশের মানুষের কাছ থেকে কীভাবে সর্বোচ্চ উৎপাদন পাওয়া যায়, সেদিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে শক্তিশালী নীতি নেওয়া যেত।
তিনি বলেন, এ ধরনের কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেওয়ার কাজ করতে পারত কাউন্সিলটি। কিন্তু সেটাই অনুপস্থিত ছিল। এর ফলে জনসংখ্যা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের গুরুত্ব পায়নি এবং বড় কোনো জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবেও সামনে আসেনি।
আমিনুল হক পুনর্গঠিত পপুলেশন কাউন্সিলেরও একজন সদস্য। তিনি বলেন, সমস্যা শুধু জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে না পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আরও বড় সমস্যা হলো, জনসংখ্যা কীভাবে ভালোভাবে পরিচালনা করা যায়, মানুষকে কীভাবে উৎপাদনশীল জনশক্তিতে পরিণত করা যায় এবং এই সম্ভাবনাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, এসব নিয়ে আমরা সমন্বিত জনসংখ্যাকেন্দ্রিক নীতি নিতে পারিনি।
জনসংখ্যার বিষয়টিকে দীর্ঘদিন গুরুত্ব না দেওয়ার দৃশ্যমান ফল হলো দেশে মোট প্রজনন হার বেড়ে যাওয়া।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের সর্বশেষ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভেতে (এমআইসিএস) ২০২৫ দেখা গেছে, ২০২৫ সালে দেশে প্রতি নারীর গড় সন্তানসংখ্যা বা মোট প্রজনন হার বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ২ দশমিক ৩।
দক্ষিণ এশিয়ায় এখন বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে প্রজনন হার কমার বদলে বাড়ছে। এর ফলে এমনিতেই ঘনবসতি, খাদ্যনিরাপত্তার সংকট এবং চাপের মুখে থাকা স্বাস্থ্যসেবার ওপর আরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালে একজন নারীর গড়ে সন্তানসংখ্যা ছিল ৬ দশমিক ৩। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির বড় ভূমিকার কারণে এই হার ২০১২ সালে কমে ২ দশমিক ৩-এ নেমে আসে।
এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রজনন হার প্রায় একই জায়গায় ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের জরিপে তা বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে। কয়েক দশকের মধ্যে এটাই প্রথমবার প্রজনন হার বাড়ার ঘটনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জনসংখ্যা নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং কয়েক দশক ধরে প্রজনন হার কমে আসার পর এক ধরনের আত্মতুষ্টি অন্যতম কারণ।
আমিনুল হক বলেন, এত দীর্ঘ সময় পপুলেশন কাউন্সিলের কোনো বৈঠক না হওয়াও আগের সরকারের জনসংখ্যা নীতির প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।
অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের এপ্রিলে চার দশকের পুরোনো ন্যাশনাল পপুলেশন কাউন্সিল পুনর্গঠন করে। এরপর তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম গত বছরের জুনে জনসংখ্যা-সংক্রান্ত একটি বৈঠক করেছিলেন। তবে সেটি পপুলেশন কাউন্সিলের বৈঠক ছিল না। কাউন্সিল নিজে এখনো কোনো বৈঠক করেনি। দীর্ঘ ১৪ বছর পর ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে কাউন্সিলের সর্বশেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ ২০১২ সালে দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ জনসংখ্যা নীতি গ্রহণ করে। ওই নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ২০১৫ সালের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনার উপকরণ ব্যবহারের হার বাড়িয়ে ৭২ শতাংশে নেওয়া এবং মোট প্রজনন হার কমিয়ে ২ দশমিক ১-এ আনা। কিন্তু এই দুটি লক্ষ্যের কোনোটিই পূরণ হয়নি।
২০২৫ সালের এমআইসিএস অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনার উপকরণ ব্যবহারের হার ২০১৯ সালের ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। ২০১৯ সালে এটিই ছিল দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ হার। ২০১২-১৩ সালে এই হার ছিল ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ গত বছরের জুলাইয়ে তৃতীয় জাতীয় জনসংখ্যা নীতি গ্রহণ করে। এই নীতিতে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দেশের জনমিতিক সুবিধাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো।
নীতিতে বলা হয়েছে, জনসংখ্যা নীতি বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় এবং নজরদারি করবে ন্যাশনাল পপুলেশন কাউন্সিল।
কাউন্সিল নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে দিকনির্দেশনা দেবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করবে। নীতির বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে। এর প্রভাব মূল্যায়ন করবে। প্রয়োজনে নীতিতে পরিবর্তন বা সংশোধনের সুপারিশ করবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি নির্বাহী কমিটি থাকবে। এই কমিটি পপুলেশন কাউন্সিলের নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছে দেবে। একই সঙ্গে এসব নির্দেশনা কীভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেটিও দেখবে কমিটি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চিকিৎসা শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ কাউন্সিলের সচিবালয় হিসেবে কাজ করবে। এই বিভাগ নিয়মিত, অর্থাৎ বছরে অন্তত একবার কাউন্সিলের বৈঠক আয়োজন করবে।
বিভাগটির সচিবের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্সও থাকবে। এতে জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি থাকবেন। এই টাস্কফোর্স সচিবালয়কে কারিগরি নীতির বিভিন্ন নথি তৈরিতে সহায়তা করবে।
এ ছাড়া কাউন্সিলের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করবে এবং এ-সংক্রান্ত অন্যান্য কাজও করবে।
যোগাযোগ করা হলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জিন্নাত রেহানা বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ন্যাশনাল পপুলেশন কাউন্সিল পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করতে বলেছে তাদের।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টাকে চেয়ারম্যান করে যে কাউন্সিল পুনর্গঠন করা হয়েছিল, সেটি আবারও পুনর্গঠন করতে হবে। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ইতোমধ্যে সেই কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কাউন্সিল পুনর্গঠনের পর পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর পরিষদের বৈঠক আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরু করবে।