যে রাতে প্রথম আলোয় জেগে উঠেছিল ঢাকার সড়ক

ফাহিমা কানিজ লাভা
ফাহিমা কানিজ লাভা

‘মা, রাস্তার ধারের ওই লাইটগুলো কে লাগাইছে? প্রতিদিন কে ওইগুলো জ্বালায়?’—প্রশ্ন করে ছয় বছরের শিশু হৃদি। সন্ধ্যার পর মহাখালী রেলক্রসিং থেকে শাহীনবাগের দিকে যাওয়ার পথে সড়কবাতিগুলো দেখে শিশুমনে এমন বিস্ময় জাগে।

আজকের রাতের ঢাকা আলোয় ঝলমলে। এয়ারপোর্ট সড়ক থেকে হাতিরঝিল, বিজয় সরণি থেকে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার, যেদিকেই চোখ যায়, সারি সারি উজ্জ্বল এলইডি বাতি। দেখলে মনে হয়, এ শহর কখনো ঘুমায় না।

চ
ছবি: ফাহিমা কানিজ লাভা/ স্টার

তবে দেড়শ বছর আগে ঢাকার রাতগুলো এমন না। সন্ধ্যা নামলেই এই তিলোত্তমা নগরী ডুবে যেত নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে। দিনভর কোলাহলে মুখর থাকা পথঘাট রাতেই জনশূন্য ও অমানিশায় ঢেকে যেত। আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ধনীদের ঘরে ঝাড়বাতির রোশনাই জ্বললেও সাধারণ মানুষের ভরসা ছিল কুপি, মোমবাতি কিংবা হারিকেন।

সেই অন্ধকার ঢাকা কীভাবে আজ আলোয় আলোকিত হলো? রাজধানীর সড়কবাতির সেই দীর্ঘপরিক্রমার গল্পই জেনে নেওয়া যাক।

কেরোসিন বাতি ও বাতিওয়ালা

ঢাকার রাস্তায় আলো জ্বালানোর প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা ১৮৬৯ সালে। তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট জর্জ গ্রাহামের নির্দেশে সিভিল সার্জন ড. হেনরি কাটক্লিফ ঢাকাকে আধুনিক করার যে প্রস্তাব দেন, তাতে ছিল কেরোসিন বাতি বসানোর কথা।

১৮৭৭ সালে রানি ভিক্টোরিয়াকে 'ভারতসম্রাজ্ঞী' ঘোষণা করা হয়। এই বিশেষ অর্জনকে স্মরণীয় করে রাখতে ওয়াইজঘাট থেকে চকবাজার পর্যন্ত বসানো হয় প্রথম ৬০টি কেরোসিনের ল্যাম্পপোস্ট।

y
রানি ভিক্টোরিয়া। ছবি: সংগৃহীত

সেসময় সন্ধ্যায় ঢাকার রাস্তায় এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যেত। মই ও তেলের পাত্র হাতে একদল লোক ল্যাম্পপোস্টের দিকে ছুটে চলতেন। তারা ল্যাম্পপোস্টে কেরোসিন ঢেলে বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে যেতেন, আবার ভোরে এসে নিভিয়ে দিতেন। তাদের বলা হতো ‘বাতিওয়ালা’। 

ক
কলকাতার এক বাতিওয়ালা। ছবি: সংগৃহীত

তবে ঝড়-বৃষ্টি বা দমকা হাওয়ায় মাঝেমধ্যেই নিভে যেত সেই বাতি, শহর আবার ডুবে যেত অন্ধকারে।

নবাবের প্রতিশ্রুতি ও গ্যাস বাতির অধ্যায়

রাস্তার কেরোসিন বাতি বদলে ‘গ্যাস বাতি’ আনার প্রথম উদ্যোগ নেন ঢাকা নওয়াব পরিবারের নবাব আহসানউল্লাহ।

ঘটনাটি ১৮৮৬ সালের। নবাব আহসানউল্লাহর বাবা নবাব খাজা আবদুল গণি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ‘নাইট কমান্ডার অব দ্য স্টার অব ইন্ডিয়া’ (কেসিএসআই) উপাধি পান। বাবার এই প্রাপ্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে পুত্র নবাব আহসানউল্লাহ নিজস্ব খরচে ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে গ্যাস বাতি বসানোর ঘোষণা দেন।

চ
১৮৮০-এর দশকে আহসান মঞ্জিলে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বাঁ দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে বসা নবাব খাজা আবদুল গণি। ছবি: সংগৃহীত

তবে প্রশাসনিক লালফিতার দৌরাত্ম্যে কেটে যায় এক যুগেরও বেশি সময়। ১৮৮৮ সালে ভাইসরয় লর্ড ডাফারিন ঢাকা সফরে এসে তাগাদা দিলেও কাজের গতি বাড়েনি।

গ্যাস নয়, এলো একঝাঁক ‘বিলাতি বিজলি বাতি’

কথা খেলাপ করার পাত্র ছিলেন না নবাব আহসানউল্লাহ। গ্যাসের বাতির পরিকল্পনা আটকে থাকার মধ্যে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুতের আলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এবার তিনি ঠিক করলেন, গ্যাস নয়, ঢাকাবাসীকে সরাসরি ‘বিলাতি বিজলি বাতি’ বা বৈদ্যুতিক আলো দিয়ে চমকে দেবেন।

চ
 নবাব আহসানউল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

তিনি গঠন করলেন ‘দি ঢাকা ইলেকট্রিক লাইট ট্রাস্টিস’ এবং সেই আমলে এককালীন সাড়ে চার লাখ টাকা (তখনকার হিসাবে যা বিপুল অঙ্ক) অনুদান দিলেন।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের দায়িত্ব দেওয়া হলো ইংল্যান্ডের ‘মেসার্স অক্টাভিয়াস স্টিল অ্যান্ড কোম্পানি’কে (পরবর্তীকালে 'ডেভকো')। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা হয় হাতিরপুলের দিকে।

অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর। নবাবপুত্র খাজা আতিকুল্লাহর বিয়ে উপলক্ষে আহসান মঞ্জিলে বসেছিল বিশাল এক জলসা। প্রধান অতিথি ছিলেন কলকাতার রাজস্ব বোর্ডের সেশন মেম্বার চার্লস ওয়াল্টার বোল্টন। বিকেল ৫টার দিকে বোল্টন সাহেব সুইচে চাপ দেওয়া মাত্রই আলো জ্বলে উঠল গোটা আহসান মঞ্জিল আর ঢাকার প্রধান প্রধান সড়ক।

ক
১৯৬০-এর দশকে আহসান মঞ্জিল। ছবি: মেরি ফ্রান্সেস ডানহাম/ সংগৃহীত

তেল বা গ্যাস ছাড়া এমন চোখধাঁধানো আলো দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান নগরবাসী। পরদিন ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকায় লেখা হয়, ‘নবাব বাহাদুরের অনুকম্পায় ঢাকা নগরীর প্রধান প্রধান রাস্তাগুলি চপলা চমকে অকস্মাৎ হাসিয়া উঠিয়াছে…।’

বিদ্যুতের এই অবিস্মরণীয় অভিযাত্রার মাত্র নয় দিন পর, ১৬ ডিসেম্বর মারা যান নবাব আহসানউল্লাহ।

চ
আহসান মঞ্জিল। ছবি: রণদীপম বসু

বিজলি বাতির বিবর্তন

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিদ্যুৎ ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। শুরুতে কেবল চকবাজার, সদরঘাট, ইসলামপুর, নবাবপুর, বাংলাবাজার ও রমনার কিছু সড়কে বাতি জ্বলত। সাধারণ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে লেগে যায় আরও অনেক বছর। 

১৯৩৫ সালের এক পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, ঢাকায় ১ হাজার ৬৬টি বৈদ্যুতিক বাতির পাশাপাশি ৮৬৯টি কেরোসিন বাতি চালু ছিল।

সময়ের পরিক্রমায় হাতিরপুল ও পরিবাগের ছোট পাওয়ার হাউস থেকে ছড়িয়ে পড়া সেই বিদ্যুৎ আজ কোটি মানুষের ঢাকাকে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সচল রাখছে।

আশির দশকের দিকে রাস্তার হলুদ রঙের 'সোডিয়াম বাতি'র নস্টালজিয়া পেরিয়ে ঢাকা প্রবেশ করেছে হ্যালোজেন আর বর্তমানের চোখধাঁধানো 'এলইডি' আলোর যুগে।

চ
সোডিয়াম বাতি। ছবি: স্টার

আজ রাতের ঢাকা ওপর থেকে দেখলে মনে হয় কোনো আলোর সাগর। কিন্তু এই আলো ঝলমলে শহরের প্রতিটি নিয়ন লাইটের পেছনে কথা বলে শতবর্ষের ইতিহাস।

তথ্যসূত্র:

১. ঢাকা সমগ্র (দ্বিতীয় খণ্ড), মুনতাসীর মামুন।

২. Dacca: A Record of Its Changing Fortunes, আহমদ হাসান দানী।

৩. Glimpses of Old Dacca, এস. এম. তাইফুর।