পহেলা বৈশাখে কেন এত লাল-সাদার ছড়াছড়ি?

নাফিছা নূজহাত

সকালে ঘুম ত্থেকে উঠতেই বোঝা গেল, দিনের শুরুটা অন্য রকম। রাস্তায় মানুষের কোলাহল, চারদিকে উৎসবের আমেজ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সবাই ভাবে, ‘আজ কী পরব?’

অদ্ভুতভাবে, উত্তরটা প্রায় সবারই জানা—লাল আর সাদার মাঝে কিছু একটা।

আজ শহরটা একটু বেশি উৎফুল্ল লাগে। ভিড় তো আছেই, কিন্তু মানুষের চলাফেরায় একটা স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপার চোখে পড়ে। রাস্তাঘাটে গালে আলপনা এঁকে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও গান বাজছে, বাচ্চাদের হাতে কাগজের মুখোশ—সব মিলিয়ে বোঝা যায়, একটা উৎসব চলছে।

এই ভিড়ের মাঝেই একটা জিনিস খুব সহজেই নজরে পড়ে, সেটি হলো মানুষ অনেক, কিন্তু রং প্রায় এক। লাল আর সাদা। কেউ লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে আছেন, কেউ সাদা পাঞ্জাবিতে লালের ছোঁয়া, আবার কেউ একেবারে সাধারণ পোশাকেও এই দুই রং রেখেছেন। কোনো লিখিত নিয়ম নেই, তবুও অধিকাংশ মানুষ একই রং বেছে নেন।

তখন মনে প্রশ্ন আসে, ‘কেন? কেন এই একটা দিনেই লাল আর সাদা এত বেশি দেখা যায়?’

বৈ
ছবি: পলাশ খান

ঐতিহ্যের ছোঁয়া

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহুমাত্রিক। এর মধ্যে আছে লোকসংগীত, গ্রামের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, মুখে মুখে ছড়িয়ে থাকা গল্প, ঋতুভিত্তিক উৎসব, হস্তশিল্প আর নানা ধরনের খাবারের সংস্কৃতি। এই সবকিছুর মধ্যেই রঙের ব্যবহার দেখা যায়, যা শুধু সাজানোর জন্য নয়; বরং মানুষের ভাবনা, অনুভূতি আর অভ্যাসেরও একটা অংশ।

নববর্ষের দিন এই আলাদা আলাদা বিষয়গুলো এক জায়গায় দেখা যায়। এক দিনের মধ্যেই গান, পোশাক, খাবার আর উৎসব—সব মিলিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক চিত্র তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে লাল ও সাদা রঙের উপস্থিতি কেবল নান্দনিক নয়; এটি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার একটি চিহ্ন। গ্রামবাংলার মাটির ঘর থেকে শুরু করে শহরের আধুনিক আয়োজন—সবখানেই এই রঙের ব্যবহার রয়েছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়েছে।বৈশাখ

লাল ও সাদা: প্রতীক এবং ভাব

বাঙালি সংস্কৃতিতে রঙের ব্যবহার শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নির্দিষ্ট অর্থ ও ধারণা। সাদা রংকে দীর্ঘদিন ধরে পবিত্রতা, সরলতা এবং নতুন শুরুর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এই রং মানুষের মনে পরিচ্ছন্নতা ও স্বচ্ছতার অনুভূতি তৈরি করে। তাই নতুন বছরের শুরুতে সাদা রঙের ব্যবহারকে একটি মানসিক প্রস্তুতির অংশ বলা যায়, যেখানে মানুষ পুরোনো বিষয় থেকে সরে এসে নতুনভাবে জীবন শুরু করার ইচ্ছা প্রকাশ করে।

অন্যদিকে লাল রং শক্তি, আবেগ, উচ্ছ্বাস এবং জীবনের সক্রিয়তার প্রতীক। এই রং সহজেই চোখে পড়ে এবং পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তোলে। বিভিন্ন উৎসব ও আনন্দঘন মুহূর্তে লাল রঙের উপস্থিতি তাই বেশি দেখা যায়।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদা রওনক খান বলেন, ‘সাদা এমন একটি রং, যা সব ভিন্নতাকে নিজের মধ্যে স্থান দেয়, অথচ কোনো বিভাজন তৈরি করে না; বরং ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয়ের পার্থক্য সত্ত্বেও এটি সাম্য ও সহাবস্থানের একটি ভাবনা প্রকাশ করে। অন্যদিকে, লাল জীবন্ততা, আনন্দ, উৎসব ও পরিবর্তনের প্রতীক, যা মানুষের আবেগকে জাগিয়ে তোলে।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আগে আন্দোলনকারীরা প্রায়ই সাদা পোশাক পরতেন, আর লাল ছিল বিপ্লবের প্রতীক। একই সঙ্গে, হালখাতার লাল মলাট ও সাদা পৃষ্ঠাও নতুন সূচনা ও পরিবর্তনের প্রতীকী অর্থ বহন করে। তাই বৈশাখে লাল-সাদার ব্যবহার শুধু যে রঙের বিষয়, তা নয়; এটি ঐক্য, আনন্দ এবং নতুন শুরুর এক অর্থপূর্ণ প্রকাশ।’

এই দুই রং একসঙ্গে ব্যবহৃত হলে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়। সাদার শান্ত ও নির্মল দিক এবং লালের প্রাণশক্তি একত্রিত হয়ে এমন একটি অনুভূতি তৈরি করে, যেখানে স্থিরতা ও গতিশীলতা পাশাপাশি থাকে। এ কারণেই পহেলা বৈশাখে লাল ও সাদা রঙের ব্যবহার বিশেষভাবে অর্থবহ। কারণ, এই উৎসবে নতুন সূচনা ও আনন্দ—দুটো দিকই একসঙ্গে প্রকাশ পায়।

বৈশাখ
ছবি: হাবিুর রহমান

লোকশিল্প ও ইতিহাসে রঙের ব্যবহার

বাংলার লোকশিল্পে লাল ও সাদা রং অনেক আগে থেকেই ব্যবহার হয়ে আসছে। আলপনা সাধারণত চালের গুঁড়া অর্থাৎ সাদা রঙে আঁকা হয়, আর তা লাল বা মাটির রঙের সাহায্যে একটি পরিষ্কার ও সুন্দর নকশা হয়ে ফুটে ওঠে। এই নকশাগুলো শুধু সাজানোর জন্য নয়; এগুলোর মাধ্যমে সমৃদ্ধি এবং ভালো কিছুর প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়।

পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত মুখোশ, বিভিন্ন প্রতীকী উপকরণ এবং সাজসজ্জাতেও অন্যান্য রঙের সঙ্গে লাল ও সাদা রং বেশি দেখা যায়। এগুলো দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ার পাশাপাশি একটি বার্তাও দেয়: অশুভকে দূরে রাখা এবং শুভকে স্বাগত জানানো। এ থেকে বোঝা যায়, এই রংগুলো শুধু পোশাকে সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো একটি ধারণা, যা দীর্ঘদিন ধরে বাঙালির সংস্কৃতির অংশ।

ইতিহাসের দিক থেকেও লাল ও সাদা রঙের ব্যবহার ব্যাখ্যা করা যায়। বাংলা নববর্ষ শুরু হয়েছিল মুঘল আমলে, যখন সম্রাট আকবর কৃষি ও করব্যবস্থাকে সহজ করার জন্য বাংলা সন চালু করেন। তখন নতুন বছর মানে ছিল নতুন হিসাব শুরু করা, নতুন খাতা খোলা এবং অর্থনৈতিকভাবে নতুনভাবে শুরু করা।

এই বাস্তব ব্যবস্থার সঙ্গে ধীরে ধীরে রঙের অর্থ যুক্ত হয়। সাদা রং নতুন খাতার পরিষ্কার অবস্থাকে বোঝায় এবং নতুন শুরুর ধারণা দেয়। আর লাল রং কৃষিকাজের পরিশ্রম, শক্তি এবং উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে। এভাবেই ইতিহাস ও সংস্কৃতি মিলিয়ে লাল ও সাদা রং আজকের পহেলা বৈশাখে একটি স্থায়ী গুরুত্ব পেয়েছে।

বৈশাখ
ছবি: মেহেদী হাসান

আধুনিকতার ছোঁয়া

সময় বদলেছে, পহেলা বৈশাখের আয়োজনও বদলেছে। পোশাকে নতুন নকশা এসেছে, উপস্থাপনায় এসেছে ভিন্নতা। তবুও এসব পরিবর্তনের মধ্যেও লাল ও সাদা রং একইভাবে রয়ে গেছে।

পোশাক যেমনই হোক, এই দুই রং কোনো না কোনোভাবে থেকেই যায়। লাল ও সাদা রং পহেলা বৈশাখের আনন্দ ও নতুন সূচনার সঙ্গে সব সময় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে।