বিশ্লেষণ

ট্রাম্পের ভয়ে স্বাধীনতার আকাঙ্খা ছেড়ে কেন ‘শত্রু’ ডেনমার্কের আশ্রয় নিচ্ছে গ্রিনল্যান্ড

স্টার অনলাইন ডেস্ক

গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কান্ডারি আক্কালুক লিনগে তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আদর্শে এক আমূল পরিবর্তন এনেছেন।

প্রায় ৫০ বছর আগে, এই ইনুইট অ্যাক্টিভিস্ট ও কবি দ্বীপটির অন্যতম বৃহৎ স্বাধীনতাপন্থী দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সে সময় তিনি গ্রিনল্যান্ডবাসীদের ডেনমার্কের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আহ্বান জানান। ডেনমার্ককে তিনি একটি শোষণকারী ঔপনিবেশিক শাসক হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

১৯৭৫ সালের একটি কবিতায় তিনি লিখেছিলেন,

তাদের অবশ্যই হটাতে হবে। আমরা আর এর মাসুল দেব না। সান্ত্বনা দিয়ে কষ্ট লাঘব করা যায় না। নিপীড়ন এমন এক জিনিস যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়।

তবে এখন গ্রিনল্যান্ড তার চেয়েও বড় হুমকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখোমুখি বলে তিনি মনে করছেন। জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে ট্রাম্প বারবার এই বিশাল আর্কটিক দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

কবি ও অ্যাক্টিভিস্ট লিনগে বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, তিনি এখন বিশ্বাস করেন, গ্রিনল্যান্ডের চিরকাল ডেনমার্কের অংশ থাকা উচিত। কারণ ডেনমার্ককে তিনি এখন আমেরিকার আগ্রাসন থেকে রক্ষাকারী রূপে দেখছেন।

গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুউকে নিজ বাড়িতে বসে সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী এই নেতা বলেন, ‘আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা প্রতারিত হয়েছি।’

গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কান্ডারি আক্কালুক লিনগে। ছবি: রয়টার্স

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত কঠিন এক পরিস্থিতির মধ্যে আছি, যেখানে আজ আমাদের বাঁচাতে পারে কেবল ডেনমার্ক এবং ইউরোপ।’

লিনগে একা নন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্য গ্রিনল্যান্ডের রাজনীতিতে এক তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, যা দ্বীপটির রাজনৈতিক গতিপথকে বদলে দিয়েছে।

এটি অনেকটা কানাডার পরিস্থিতির মতো। কানাডাকে আমেরিকার ‘৫১তম রাজ্য’ বানানোর বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর কানাডায় দেশপ্রেমের জোয়ার ওঠে। আর এতেই গত বছর মার্ক কার্নি লিবারেলদের আবারও ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনেন।

কয়েক দশক ধরে, প্রায় ৫৬ হাজার মানুষের স্বায়ত্তশাসিত ডেনিশ অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের রাজনীতিতে স্বাধীনতাপন্থী দলগুলোরই আধিপত্য ছিল।

তবে ট্রাম্পের হুমকির ছায়ায় ২০২৫ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর, এখন সরকার পরিচালনা করছে এমন একটি দল, যারা অদূর ভবিষ্যতে স্বাধীনতার যেকোনো আলোচনাকে নাকচ করে দিয়েছে। আর ধাপে ধাপে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

রয়টার্স জানায়, সরকারের যেসব সদস্য আগে স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করতেন, তারাও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এর বিপক্ষে চলে গেছেন।

গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুতে এগেদে রয়টার্সকে বলেন, ‘আমাদের স্বপ্ন আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা জরুরি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি আমাদের দখল করে নেয়, তবে আত্মনিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন আর থাকবে না।’

এটি গ্রিনল্যান্ডের জন্য একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। এখানকার রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে ডেনমার্কের অতীত অন্যায়ের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল।

ডেনমার্ক বহু শতাব্দী আগে এই দ্বীপটি উপনিবেশ বানিয়েছিল। এখনও অঞ্চলটির পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ন্ত্রণ করে তারাই।

উদাহরণস্বরূপ, ১৯৬০ এবং ১৯৭০-এর দশকে ডেনমার্ক স্থানীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সীমিত করার জন্য হাজার হাজার ইনুইট নারী ও কিশোরীর শরীরে তাদের সম্মতি ছাড়াই জন্মনিয়ন্ত্রণ ডিভাইস স্থাপন শুরু করেছিল।

আকাশ থেকে তোলা গ্রিনল্যান্ডের একটি অঞ্চল। ছবি: রয়টার্স

বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেনমার্কও এখন তাদের আগ্রাসী মনোভাব থেকে পিছু হটছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন রয়টার্সকে বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড তাদের মানুষের’ এবং কেবল তারাই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

তিনি আরও বলেন, তার সরকার জন্মনিয়ন্ত্রণ মামলাসহ ঔপনিবেশিক আমলের অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চেয়েছে।

ফ্রেডেরিকসেন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমাদের যৌথ অতীতের ভুলগুলোর মুখোমুখি হওয়ার সাহস থাকতে হবে। আমাদের দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখার এটাই একমাত্র উপায়। গ্রিনল্যান্ড এবং ডেনমার্ক এখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ নিরসনে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সঙ্গে আলোচনা করছে। এই আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে।

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলেছে, ‘আমরা আত্মবিশ্বাসী, এমন একটি সমাধান খুঁজে পাব যা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তাকে রক্ষা করবে। আবার ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের উদ্বেগকে স্বীকৃতি দেবে।’

তবে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন এই বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।

এই আর্কটিক অঞ্চলে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলো বুঝতে রয়টার্স গ্রিনল্যান্ডের বহু রাজনীতিবিদ, কর্মকর্তা ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছে।

অনেকেই লিনগে এবং তার পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রিনল্যান্ডের বর্তমান রাজনীতির একটি প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

স্বাধীনতার পক্ষে লিনগের এই আপোসহীন যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকে। তখন তার পরিবার তাকে পড়াশোনার জন্য ডেনমার্কে পাঠায়।

তিনি স্মৃতিচারণ করেন, ১৯৬৮ সালে একটি বড় মোড় আসে যখন পারমাণবিক অস্ত্রবাহী একটি মার্কিন বোমারু বিমান উত্তর গ্রিনল্যান্ডে বিধ্বস্ত হয়। কোপেনহেগেন তখন দ্বীপের ওপর দিয়ে এই ধরনের উড্ডয়নের অনুমতি দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছিল। কারণ তা ডেনমার্কের পারমাণবিক মুক্ত নীতির পরিপন্থী ছিল।

ছবি: রয়টার্স

লিনগে তখন সরকারের কথা বিশ্বাস করেননি এবং ডেনিশ সরকারের এই ‘ভণ্ডামির’ তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে ডেনিশ সরকারেরই একটি তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, কোপেনহেগেন আসলে ওয়াশিংটনকে এই উড্ডয়নের সবুজ সংকেত দিয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে পারমাণবিক প্রতিরোধ বজায় রাখা।

১৯৭৬ সালে পড়াশোনা শেষে গ্রিনল্যান্ডে ফিরে লিনগে ‘ইনুইট আতাকাতিগিট’ নামে দল গঠন করেন। এটি অন্য একটি স্বাধীনতাপন্থী দল ‘সিউমুতে’র সঙ্গে কয়েক দশক ধরে দ্বীপের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে।

উভয় দলই ডেনমার্কের কাছ থেকে স্বাধীনতার জন্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছিল। তবে গ্রিনল্যান্ডকে অর্থনৈতিকভাবে গড়ে তোলার জন্য কিছুটা সময় দেওয়ার পক্ষে ছিল। ১৯৭৯ সালে স্বায়ত্তশাসন পাওয়ার পর থেকে নুউকের সরকার ধীরে ধীরে দ্বীপের জনসেবামূলক কাজের দায়িত্ব নিজেদের হাতে নিতে শুরু করে।

২০২১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ইনুইট আতাকাতিগিট, সিউমুত ও ‘নালেরাক’ নামক একটি উগ্র স্বাধীনতাপন্থী দল মিলে মোট ভোটের প্রায় ৮০ শতাংশ পেয়েছিল। অন্যদিকে স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ধীরে চলো নীতি ও ডেনমার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে থাকা পুঁজিবাদী দল ‘ডেমোক্রাতিট’ মাত্র ৯ শতাংশ ভোট পেয়ে তলানিতে ছিল।

ছবি: সংগৃহীত

ট্রাম্পের আগমন

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য তার প্রচেষ্টা জোরদার করেন।

ডেনমার্ক দ্বীপটি বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানানোয় অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দেন ট্রাম্প। এটি দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও তিনি উড়িয়ে দেননি।

গত বছরের মার্চে, গ্রিনল্যান্ডের নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে এক বক্তৃতায় ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি আমরা এটি (গ্রিনল্যান্ড) পেতে যাচ্ছি, যেকোনো উপায়ে হোক, আমরা এটি পাব।’

এই মার্কিন হুংকার মার্চের নির্বাচনকে ওলটপালট করে দেয়। আমেরিকান আগ্রাসনের ক্রমবর্ধমান ভয় এবং সেইসঙ্গে মাছ ধরার সংস্কারের মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোর প্রতি অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে ডেনমার্কপন্থী দল ডেমোক্রাতিট তাদের ভোটের হার তিন গুণ বাড়িয়ে ৩০ শতাংশে নিয়ে যায়। পরিণত হয় দ্বীপের বৃহত্তম দলে।

এই অপ্রত্যাশিত জয় ডেমোক্রাতিটের প্রতিষ্ঠাতা পার বার্থেলসেনকেও অবাক করেছিল। নির্বাচনের ফলাফল আসার সময়কার কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এটি একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন হতে যাচ্ছে।’

ডেমোক্রাতিটের নেতা নিলসেন পরবর্তীতে সিউমুত এবং ইনুইট আতাকাতিগিট (যারা যৌথভাবে মাত্র ৩৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল) এবং আরেকটি ছোট ডেনমার্কপন্থী দলের সঙ্গে জোট সরকার গঠন করেন।

পরের মাসে, ডেনিশ নেতা ফ্রেডেরিকসেনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে নিলসেন কোপেনহেগেনে যান। এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি তার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমরা পররাষ্ট্র বিষয়ক এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে আছি, যার মানে হলো আমাদের আরও কাছাকাছি আসতে হবে।’

ছবি: সংগৃহীত

গ্রিনল্যান্ডবাসীদের যুদ্ধ প্রস্তুতি

লিনগের এই বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গি অনেক গ্রিনল্যান্ডবাসীর চিন্তাভাবনারই প্রতিফলন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বেন্ট ওলসভিগ জেনসেনের মতো ব্যবসায়ীরা। তিনি ট্রাম্পের হুমকির আগে দ্বীপে মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধির তীব্র সমর্থক ছিলেন। কিন্তু এখন দ্বিধার মধ্যে পড়েছেন।

একটি খনি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের প্রধান জেনসেন ডেনমার্কে জন্মগ্রহণ করলেও কয়েক দশক ধরে গ্রিনল্যান্ডে বসবাস করছেন।

তিনি জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই সামরিক আক্রমণ করবে, তা তিনি পুরোপুরি বিশ্বাস করেননি। তা সত্ত্বেও তিনি তার ২১ বছর বয়সী ছেলের সঙ্গে এই সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন এবং চমকে যান। তার ছেলে জানায়, সে সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করতে গোলাবারুদ কিনতে চায়।

স্থানীয় একটি হোটেলে বসে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলার সময় ওই কথোপকথনের কথা মনে করে জেনসেন কেঁদে ফেলেন।

তিনি জানান, ১৯৯০-এর দশকে বসনিয়ায় ডেনিশ সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তিনি কাজ করেছিলেন। তাই তিনি জানেন, যুদ্ধ একটি দেশ ও তার মানুষের কী ক্ষতি করে।

তবুও, একটি বৈশ্বিক পরাশক্তির বিরুদ্ধে তার ছেলের এই প্রতিরোধকামী মনোভাবের জন্য তিনি গর্বিত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও দুজন ব্যবসায়ী জানান, মার্কিন আক্রমণের মুখে ব্যবহারের জন্য তারাও বন্দুক ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করেছেন। তারা আরও বলেন, তাদের পরিচিত অনেকেই একই কাজ করছেন।

গ্রিনল্যান্ডের একটি পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত সমীক্ষা অনুযায়ী, গত এক বছরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এমন গ্রিনল্যান্ডবাসীর অনুপাত শতকরা ৭ জন থেকে বেড়ে ৩১ জনে পৌঁছেছে।

৩০৮ জনের প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই সমীক্ষার লেখকরা জানান, গ্রিনল্যান্ড দখলে ট্রাম্পের হুমকির কারণে তৈরি হওয়া এই সংকট দ্বীপবাসীর ‘মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করছে’।

মাদুরোর ঘটনায় আতঙ্ক

নতুন সরকার আমেরিকার হুমকির মুখে ডেনমার্কের ঔপনিবেশিক অতীতকে ধামাচাপা দিচ্ছে—গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এগেদে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ইনুইট আতাকাতিগিট দলের এই প্রভাবশালী নেতা (যিনি আগে প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন) বলেন, ‘আমরা তা ভুলে যাইনি। কিন্তু আমরা এখন যে পরিস্থিতির মধ্যে আছি, সেখানে আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বজায় রাখতে হবে। এর অর্থ হলো ডেনমার্কের সঙ্গে আমাদের খুব ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করা দরকার।’

এগেদের চিন্তাভাবনাতেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, যদিও তা লিনগের মতো এত চরম নয়। তিনি এখনও স্বাধীনতা চান, তবে তা ভবিষ্যতে এবং ধীরে সুস্থে।

লিনগের কন্যা পিপালুক লিনগে মনে করেন, ডেনমার্কের প্রতি সরকারের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তার বাবার দীর্ঘদিনের মতবাদেরই এক ধরনের স্বীকৃতি। পিপালুক বর্তমানে ক্ষমতাসীন জোটের একজন সদস্য এবং সংসদের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা কমিটির প্রধান।

তিনি নিজেও তার বাবার স্বাধীনতার প্রশ্নে এই ইউটার্নে কিছুটা অবাক হয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। পিপালুক রয়টার্সকে বলেন, ‘তরুণ বয়সে তার যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তা এখন অবাস্তব, এটা স্বীকার করতে তিনি লজ্জিত নন।’

তিনি তার বাবার এই পরিবর্তনের সূত্রপাত ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের প্রথম মেয়াদের সময় থেকে বলে উল্লেখ করেন। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রথম গ্রিনল্যান্ড কেনার ধারণাটি সামনে আনেন এবং ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেন এই প্রস্তাবকে ‘অযৌক্তিক’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার পর ডেনমার্কে তার রাষ্ট্রীয় সফর বাতিল করেন।

পিপালুক বলেন, তার বাবা ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে কেবল ফাঁকা বুলি হিসেবে দেখেননি। তবে সে সময় অনেক গ্রিনল্যান্ডবাসী মনে করেছিলেন, লিনগে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন এবং অযথা ভয় ছড়াচ্ছেন।

কিন্তু ট্রাম্প যখন তার দ্বিতীয় মেয়াদে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আরও কঠোর বার্তা দেওয়া শুরু করেন, তখন লিনগের আশঙ্কার প্রতি মানুষের সমর্থন বাড়তে থাকে।

পিপালুক আরও বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে তার হুমকি সত্যি করতে পারেন, তা নিয়ে মানুষের মনে থাকা সামান্য সন্দেহটুকুও গত জানুয়ারিতে উবে যায়।’ সেই সময় মার্কিন সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে।

তিনি বলেন, সকালে এই খবর শুনে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ট্রাম্পের কথাকে এখন বিশ্ববাসীর গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত।

‘এখন সবকিছু বদলে গেছে,’ পিপালুক বলেন। ‘আপনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোন বা লোকাল বাসের ড্রাইভার, সবাই জানে যে পৃথিবী বদলে গেছে। পৃথিবী যখন বদলায়, তখন আপনার কৌশল এবং চিন্তাভাবনাও বদলানো উচিত।’

মাদুরো অভিযানের কয়েক দিন পর, গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নিলসেন ডেনমার্কের সমর্থনে তার সবচেয়ে জোরালো বক্তব্য দেন।

নিলসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা একটি ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি এবং এই মুহূর্তে যদি আমাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ডেনমার্কের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হয়, তবে আমরা ডেনমার্ককেই বেছে নেব। আমরা ডেনমার্কের অধীনে ঐক্যবদ্ধ আছি।’

লিনগে এতে অত্যন্ত আনন্দিত হন। তিনি বলেন, ‘আমি খুব খুশি যে সরকার অবশেষে ঘোষণা করেছে, আমরা ডেনিশ সাম্রাজ্যের অংশ। এখন আমরা বুঝতে পেরেছি যে গত ৩০০ বছরে আমরা যে স্বাধীনতা ভোগ করেছি, তা ডেনমার্কের সঙ্গেই সম্ভব হয়েছে।’

ট্রাম্প অবশ্য দ্বীপবাসীর এই ভয় দূর করার জন্য কিছুই করেননি। মাদুরো অভিযানের পরপরই হোয়াইট হাউস জানায়, তারা গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহারের কথা বিবেচনা করছে।

এর ফলে ডেনমার্ক এবং ন্যাটোর সদস্য দেশ ব্রিটেন ও ফ্রান্স দ্বীপে ছোট সৈন্যদল পাঠায়।

ডেনমার্কের জাতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি একটি সম্ভাব্য আক্রমণ নিয়ে এতটাই চিন্তিত ছিল যে তাদের সৈন্যরা ডেনমার্ক থেকে রক্তের সরবরাহ এবং মার্কিন বিমান অবতরণ ঠেকাতে রানওয়ে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিস্ফোরকও নিয়ে এসেছিল।

ট্রাম্প অবশ্য পরে বলেছেন, তিনি গ্রিনল্যান্ডে ‘পূর্ণ প্রবেশাধিকার’ পাওয়ার জন্য ডেনমার্ক এবং ন্যাটোর সঙ্গে আলোচনা করছেন। ডেনিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অবশ্য এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

ডেনমার্কের ঔপনিবেশিক পাপ

সব গ্রিনল্যান্ডবাসী অবশ্য লিনগের মতো ডেনমার্ককে আপন করে নেননি। রাজনীতির আরেকটি স্রোতে দেখা গেছে উগ্র স্বাধীনতাপন্থী দল নালেরাকের উত্থান। গত বছরের নির্বাচনে তারা প্রায় ২৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে, যা আগে ছিল ১২ শতাংশ। তারা যুক্তি দিচ্ছে, গ্রিনল্যান্ডের উচিত ট্রাম্পের এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে অবিলম্বে স্বাধীনতার জন্য ডেনমার্কের সঙ্গে আলোচনা করা।

নালেরাকের প্রধান পেলে ব্রোবার্গ রয়টার্সকে বলেন, ‘ডেনমার্ক আমাদের অংশীদার নয়, সে আমাদের জিম্মি করে রেখেছে।’

স্বাধীনতার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার আলোচনায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের বাস্তবে কিছু করার সুযোগ এসেছে আর তারা সবাই চিৎকার করতে করতে জিম্মিকারীদের কাছে দৌড়ে যাচ্ছে এই বলে যে—আমাদের বাকি বিশ্ব থেকে বাঁচাও।’

ডেনমার্কের প্রতি এই ক্ষোভের শেকড় গাঁথা আছে ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে ডেনিশদের করা অন্যায়ের মধ্যে, যা দ্বীপের অনেকেরই স্মৃতিতে এখনও তাজা। সেই অন্যায়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল জন্মহার সীমিত করার প্রয়াস, যেখানে ডেনিশ ডাক্তাররা হাজার হাজার নারী ও মেয়ের শরীরে জোরপূর্বক গর্ভনিরোধক ডিভাইস ঢুকিয়ে দিয়েছিল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং গ্রিনল্যান্ডিক ও ডেনিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তদন্তে এই কর্মসূচির ভয়াবহতা পুরোপুরি প্রকাশ পেয়েছে। ২০২৪ সালে গ্রিনল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় জনসংখ্যার ওপর এর প্রভাবের কারণে এই কর্মসূচিকে ‘গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

ডেনমার্ক সরকার পরের বছর এর জন্য ক্ষমা চায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দেয়।

অঞ্চলটির নাগরিক ইনেকি কিলসেন জানান, তার বাবা-মা তাকে বলেছিলেন—তার দাদিকে সাত মাসের গর্ভবতী অবস্থায় ডেনিশ ডাক্তাররা জোর করে প্রসব করিয়েছিলেন। শিশুটিকে অন্য ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেখানে সে মারা যায়।

রয়টার্স অবশ্য স্বাধীনভাবে এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

অন্যান্য কেলেঙ্কারির মধ্যে ছিল ডেনমার্কের ডজনখানেক ছোট বসতি বন্ধ করে দেওয়া। সে সময় একদল গ্রিনল্যান্ডিক শিশুকে তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ডেনিশ পালক পরিবারের কাছে রেখে ‘ছোট ডেনিশ’ বানানোর প্রচেষ্টা করেছিল। যা ডেনমার্ক পরবর্তীতে স্বীকার করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিনল্যান্ডিক অ্যাক্টিভিস্টরা তুলে ধরেছেন কীভাবে কয়েক দশক পুরনো ডেনিশ সরকারের প্যারেন্টিং স্কিল টেস্টের কারণে কোপেনহেগেন শত শত গ্রিনল্যান্ডিক শিশুকে তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ডেনিশ পরিবারগুলোর কাছে হস্তান্তর করেছিল।

আদিবাসী অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূতের ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, ডেনিশ ভাষায় নেওয়া এই পরীক্ষাগুলোতে ‘গুরুতর সাংস্কৃতিক পক্ষপাতিত্ব’ ছিল। এটি গ্রিনল্যান্ডিক পিতামাতাদের ভুলবশত বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হিসেবে মূল্যায়িত করার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছিল।

২০২৫ সালে এই বিতর্কের মুখে ডেনমার্ক সরকার গ্রিনল্যান্ডিক পরিবারগুলোর ওপর করা এই পরীক্ষা বন্ধ করে দেয়।

ছবি: রয়টার্স

ফ্রেডেরিকসেন বলেন, ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ড দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তাদের সম্পর্কের বিষয়ে একটি নতুন তদন্ত শুরু করতে সম্মত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি তাদের যৌথ ইতিহাসের ‘কিছু অন্ধকার অধ্যায়’ পুনরায় খতিয়ে দেখতে চান।

ডেনমার্কে বড় হওয়া গ্রিনল্যান্ডিক স্বাধীনতা কর্মী আকা হ্যানসেন (৩৯) বলেন, ‘ডেনিশদের এখনো এই দ্বীপ সম্পর্কে খুবই কম ধারণা রয়েছে। ছোটবেলায় তারা আমাকে জিজ্ঞেস করত, স্কুলে যাওয়ার জন্য পোলার বিয়ার (মেরু ভাল্লুক) ব্যবহার করি কি না বা দ্বীপে কোনো রাস্তা আছে কি না। এর মানে ডেনিশদের আমাদের সংস্কৃতি, সমাজ বা ভাষা সম্পর্কে কিছুই শেখানো হয় না।’

তিনি লিনগের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন যে তার রাজনৈতিক ‘বিকাশ থমকে গেছে।’

‘রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন এখন বন্ধ হওয়া উচিত’

তবে অনেক গ্রিনল্যান্ডবাসীর কাছে ডেনমার্কের প্রতি সেই ক্ষোভ এখন আমেরিকান আগ্রাসনের ভয়ের কাছে ম্লান হয়ে গেছে। সিউমুত দলের ভাইস চেয়ারম্যান কিলসেন বলেন, তিনি এখনও স্বাধিকারের দাবি সমর্থন করেন। কিন্তু ট্রাম্পের হুমকির মুখে এখন বেশিরভাগ গ্রিনল্যান্ডবাসী আর তা চান না।

কিলসেন বলেন, ‘মানুষ ভীত। ডেনিশ সামরিক বাহিনী এখানে রাস্তায় রাস্তায় মহড়া দিচ্ছে। তাদের হাতে বন্দুক রয়েছে। মনে হচ্ছে আমরা কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে আছি। তাই এই কঠিন দিনগুলো মানুষকে ভাবাচ্ছে, চলুন একটু অপেক্ষা করি।’

লিনগে তার জন্মভূমির এই রাজনৈতিক রূপান্তরে খুশি হলেও, এটি স্থায়ী হবে কি না তা নিয়ে চিন্তিত। তিনি এখনও ভয় পান যে হ্যানসেনের মতো কিছু তরুণ গ্রিনল্যান্ডবাসীর কাছে স্বাধীনতার ধারণাটি এখনও আকর্ষণীয়।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। ছবি: রয়টার্স

তিনি চিন্তিত যে ‘তরুণরা আবার ঔপনিবেশিক আমল নিয়ে কথা বলছে’ এবং ‘তাদের সব আলোচনার কেন্দ্রে থাকছে ভুক্তভোগী হওয়ার গল্প, আর এই কারণেই তারা ডেনমার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়।’

অবশ্য লিনগে নিজেও অতীতে ডেনমার্কের ওপর অত্যন্ত রাগান্বিত ছিলেন। তিনি তার কবিতার একটি সংকলন বের করে ১৯৭০ সালের দিকের একটি কবিতা পড়ে শোনান, যেখানে তিনি ডেনিশদের ‘ঘৃণ্য পশু’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

নিজের অতীতের সেই তীব্র ক্ষোভের কথা চিন্তা করে লিনগে ভ্রু কুঁচকে বলেন, ‘আমি মনে করি ওটা একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল। আজ আমার অনুভূতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।’

তিনি সবশেষে বলেন, ‘একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সব স্বপ্ন এখন বন্ধ হওয়া উচিত। এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে আমরা এই সময়ের মধ্যে বাস করছি এবং এটা বোঝা খুবই কঠিন যে—সেই স্বপ্নগুলো কেবলই স্বপ্ন, যা হয়তো আর কোনোদিন সত্যি হবে না।’