যেভাবে আমাদের মোবাইল ফোনের লোকেশন ডেটা বিক্রি হয় কোটি ডলারে
নতুন স্মার্টফোন কিনে বা কাজের প্রয়োজনে আমরা যখনই কোনো অ্যাপ ইনস্টল করতে যাই, স্ক্রিনে ভেসে ওঠে কিছু পপ-আপ উইন্ডো। সেখানে জানতে চাওয়া হয়, ‘অ্যালাউ লোকেশন অ্যাক্সেস?’ কিংবা ‘অ্যালাউ ক্যামেরা অ্যান্ড কন্টাক্টস?’। তাড়াহুড়ো করে বা অ্যাপটি ব্যবহারের তীব্র ইচ্ছায় আমরা অনেকেই ‘অ্যালাউ’ বাটনে ক্লিক করি।
আমরা ভাবি, একটা সাধারণ অ্যাপ চালু করার জন্য হয়তো এটা সামান্য এক আনুষ্ঠানিকতা। না হলে তো অ্যাপটি ব্যবহারই করা যাবে না।
কিন্তু এই একটি মাত্র ‘ক্লিকের’ মাধ্যমে আমরা অজান্তেই নিজের অবস্থানের প্রতি মুহূর্তের নিখুঁত তথ্য তুলে দিচ্ছি তৃতীয় কোনো পক্ষের হাতে।
আমরা কোথায় যাচ্ছি, কতক্ষণ থাকছি, এমনকি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের নিখুঁত নকশা বা প্যাটার্ন চলে যাচ্ছে ওই অ্যাপ কোম্পানির সার্ভারে।
এই অ্যাপ কোম্পানিগুলো শুধু আপনার বিনোদন বা সেবাই দিচ্ছে না, পর্দার আড়ালে তারা আপনার এই ব্যক্তিগত লোকেশন ডেটা চড়া দামে বিক্রি করছে একদল অদৃশ্য ব্যবসায়ীর কাছে। যাদের বলা হয় ‘ডেটা ব্রোকার’।
এভাবেই আমাদের প্রতিদিনের পথচলা পরিণত হচ্ছে খোলা বাজারের সবচেয়ে দামি পণ্যে। ডিজিটাল নজরদারির এক বিশাল জাল বিছিয়ে চলছে কোটি কোটি ডলারের বৈশ্বিক ব্যবসা।
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজারে অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য বা এই লোকেশন ডেটা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, যা বর্তমান সময়ে টেক কোম্পানিগুলোর আয়ের অন্যতম বড় উৎস।
সম্প্রতি জার্মানির ডিজিটাল অধিকার বিষয়ক মিডিয়া নেটজপলিটিক, যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনিভার্সিটি ও মার্কিন টেক ম্যাগাজিন ‘ওয়্যার্ডের’ পৃথক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই অন্ধকার বাজারের ভেতরের তথ্য উঠে আসে।
লোকেশন ডেটা কী
লোকেশন ডেটা হলো এমন কিছু ডিজিটাল তথ্য উপাত্ত, যা দিয়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো ব্যক্তি বা ডিভাইসের (যেমন, স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ) ভৌগোলিক অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা যায়।
সহজ ভাষায়, ডিজিটাল মানচিত্রে আপনি এই মুহূর্তে ঠিক কোথায় আছেন, সেই ভৌগোলিক ঠিকানাই হলো লোকেশন ডেটা।
লোকেশন ডেটার উৎস
লোকেশন ডেটা তৈরি উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস), আইপি অ্যাড্রেস, ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ ও মোবাইল টাওয়ার।
জিপিএস
জিপিএস বা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আপনার ডিভাইসটির অবস্থান কয়েক মিটারের মধ্যে নিখুঁতভাবে ম্যাপে ফুটিয়ে তোলা হয়।
আইপি অ্যাড্রেস
আপনি যখনই ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, আপনার ইন্টারনেট কানেকশনের একটি সুনির্দিষ্ট আইপি অ্যাড্রেস তৈরি হয়। এটি দিয়ে আপনি কোন দেশ, শহর বা এলাকায় আছেন তা জানা যায়।
ওয়াইফাই ও ব্লুটুথ
আপনার ফোনটি যখন আশেপাশের কোনো ওয়াইফাই রাউটার বা ব্লুটুথ ডিভাইসের সাথে সংযুক্ত বা স্ক্যান মোডে থাকে, তখন সেই রাউটারের অবস্থান ট্র্যাক করে আপনার অবস্থান বের করা সম্ভব।
মোবাইল টাওয়ার
আপনার ফোনের সিমটি যে মোবাইল টাওয়ারের সিগন্যাল নেটওয়ার্কের মধ্যে থাকে, সেই টাওয়ারের অবস্থান থেকে আপনার দূরত্বের হিসাব কষে একটা ধারণা পাওয়া যায়।
যেভাবে বিক্রি হয় লোকেশন ডেটা
যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনিভার্সিটির সাইবার পলিসি ফেলো জাস্টিন শেরম্যান ও তার গবেষক দল মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও সাধারণ নাগরিকদের সেন্সিটিভ ডেটা কেনাবেচার ওপর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চালাচ্ছেন। এই গবেষণা থেকে ডেটা কেনাবেচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিশদ ধারণা পাওয়া যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, লোকেশন ডেটা ফোন থেকে শুরু করে ক্রেতা পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রধানত ৪টি ধাপ পার হয়।
সংগ্রহ: আপনি যখন কোনো অ্যাপে যেমন, আবহাওয়া বা গেমের অ্যাপে লোকেশন অ্যালাউ করেন, তখন অ্যাপের ভেতরে থাকা সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট কিট (এসডিকে) নামে ছোট কোড আপনার জিপিএস কোঅর্ডিনেট ব্যাকগ্রাউন্ডে রেকর্ড করতে থাকে।
রিয়েল-টাইম বিডিং: আপনি যখন কোনো ওয়েবসাইট বা অ্যাপে ঢোকেন, তখন এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে আপনার স্ক্রিনে কোন বিজ্ঞাপনটি দেখানো হবে তার একটি নিলাম চলে। একে বলে রিয়েল-টাইম বিডিং। এই নিলামের সময় বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্কগুলোর কাছে আপনার অবস্থান ও ডিভাইসের আইডি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যায়।
একত্রীকরণ: ডেটা ব্রোকার কোম্পানিগুলো যেমন, এক্স মোড, আউটলজিক, নিয়ার, কোচাভা এই লাখ লাখ অ্যাপ ও বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্ক থেকে প্রতিদিন বিলিয়ন বিলিয়ন লোকেশন ডেটা কিনে এক জায়গায় বড় ডেটাবেস তৈরি করে।
বিক্রি: ব্রোকাররা ‘র ডেটা’ ফিল্টার করে নির্দিষ্ট ক্যাটাগরি বানায়। যেমন, কারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট হাসপাতালে যায় বা কারা সামরিক ঘাঁটিতে থাকে। এই ক্যাটাগরিভিত্তিক ডেটা তারা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে বিক্রি করে।
কত দামে বিক্রি হয় ডেটা
ডিউক ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ জাস্টিন শেরম্যানের গবেষণায় দেখা গেছে, ডেটা ব্রোকারদের বাজারে দাম নির্ধারিত হয় তথ্যের গভীরতা এবং ক্রেতার প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে।
গবেষণা বলছে, মানুষের স্বাস্থ্য, রাজনৈতিক অবস্থান এবং লোকেশন হিস্ট্রি অত্যন্ত সস্তায়—রেকর্ড প্রতি মাত্র দশমিক ১২ ডলারে থার্ড পার্টির কাছে বিক্রি করে ডেটা ব্রোকাররা।
এই গবেষণায় ডেটা বিক্রির দাম সম্পর্কে একটা ধারণা দেওয়া হয়।
প্রতি মাসে দশ হাজার সক্রিয় ব্যবহারকারীর লোকেশন জিপিএস কোঅর্ডিনেট ডেটা ১০০ ডলার থেকে ৫০০ ডলারে বিক্রি হয়।
নির্দিষ্ট এলাকার ট্রাফিক ডেটা যেমন, কোন শপিং মলে প্রতিদিন কত মানুষ আসে—এমন ডেটার দাম বছরে ১০ হাজার ডলার থেকে ৫০ হাজার ডলার।
আর সুনির্দিষ্ট বা স্পর্শকাতর এলাকার নিখুঁত লাইভ ট্র্যাকিং ডেটার দাম ২০ লাখ ডলার থেকে কয়েক কোটি পর্যন্ত হতে পারে।
গবেষণায় দেখা যায়, ‘নিয়ার’ বা ‘কোচাভার’ মতো মাঝারি থেকে বড় আকারের এক একটি ডেটা ব্রোকার কোম্পানি বছরে ৫০ মিলিয়ন থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আয় করে থাকে।
আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক ডেটা ব্রোকারিং এবং লোকেশন ইন্টেলিজেন্স মার্কেটের আকার বর্তমানে ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং প্রতি বছর এটি প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে।
ঝুঁকি
উন্মুক্ত বাজারে মানুষের প্রতিদিনের ব্যক্তিগত চলাচলের এমন নিখুঁত তথ্য কেনাবেচা নিয়ে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিন ধরেই গোপনীয়তার ঝুঁকি ও বিতর্ক চলছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন নয়, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন ডেমোক্র্যাট সিনেটর রন ওয়াইডেনের লেখা এক চিঠির বরাতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, বাণিজ্যিক অ্যাপগুলোর সংগ্রহ করা লোকেশন ডেটার সূত্র ধরে ইরান যুদ্ধে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাদের টার্গেট করা হচ্ছে।
গত ১৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডকে (সেন্টকম) পাঠানো ওই চিঠিতে ওয়াইডেন লিখেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সেনাদের ওপর নজরদারি চালাতে বা তাদের লক্ষ্য করে হামলা করতে শত্রুপক্ষ বাণিজ্যিক লোকেশন ডেটা ব্যবহার করছে—এমন একাধিক হুমকির রিপোর্ট আমরা পেয়েছি।
চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়, বাণিজ্যিক লোকেশন ডেটা ব্যবহার করে মার্কিন সেনারা কোথায় জড়ো হচ্ছে এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ধরন কেমন, তা সহজেই সনাক্ত করা সম্ভব। শত্রুপক্ষ এই তথ্যের সুযোগ নিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও রাস্তার পাশে বোমা হামলা চালাতে পারে।
পরে ওয়াইডেন এক বিবৃতিতে বলেন, এখন সময় এসেছে অ্যাডটেক বা বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি শিল্পকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করার।
মার্কিন সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা প্যাট হ্যারিসন বলেন, ‘ক্রোমের মতো ব্রাউজারগুলো তৈরিই করা হয়েছে ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ ও শেয়ার করার জন্য।’
তবে এর প্রতিক্রিয়ায় ক্রোমে কঠিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে বলে দাবি করেছে গুগল।
যেভাবে সুরক্ষিত থাকবেন
ঝুঁকিমুক্ত ও তথ্য বাণিজ্য থেকে দূরে থাকতে চাইলে বেশ কিছু সহজ কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারেন।
অ্যাপ পারমিশন
আপনার স্মার্টফোনের সেটিংসে অ্যাপের লোকেশন অ্যাক্সেস ‘ব্যবহারের সময়’ বা ‘কখনোই না’-তে রাখুন। ফোনে ‘অবস্থান’ ট্যাগটি বন্ধ করে রাখুন।
বিজ্ঞাপন ট্র্যাকিং
গতিবিধি ট্র্যাক করে বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রোফাইল তৈরি থেকে বিরত রাখতে মোবাইল ওএস সেটিংসে ‘বিজ্ঞাপন ট্র্যাকিং সীমিত করুন’ চালু করুন।
ডেটা মুছে ফেলা
ডেটা ব্রোকারদের তাদের ডেটাবেস থেকে আপনার ব্যক্তিগত গতিবিধির ইতিহাস মুছে ফেলতে বাধ্য করার জন্য ‘ডিলিট মি’ বা ‘ইনকগনিটো’ এর মতো ডেটা রিমুভাল টুল ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করুন।