‘ভাষার স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে স্বাধীনতা অপূর্ণ থেকে যায়’

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

পাকিস্তান আমলে বাঙালি মুসলমানদের ভাষা নিয়ে বিতর্ক কেবল ধর্মের ভিত্তিতেই নয়, বরং ক্ষমতা, অঞ্চল, অর্থনীতি ও গণতন্ত্রের প্রশ্নেও প্রভাবিত ছিল।

উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তারা বাঙালি মুসলমানদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, চাকরির সুযোগ সীমিতকরণ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করতে চেয়েছিল।

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে ইতিহাস আড্ডার ১২তম আসরে ‘বাঙালি মুসলমানের ভাষা প্রশ্ন, পাকিস্তান পর্ব’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

আলোচনায় লেখক ও চিন্তক ফিরোজ আহমেদ বলেন, উর্দু ও সংস্কৃত শব্দভান্ডার নিয়ে বিতর্ককে প্রায় হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বে নামিয়ে আনা হয়, যদিও বিষয়টি আরও জটিল। যখন আমরা উর্দু বা সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক করি, তখন ধরে নিই যে এটি কেবল হিন্দু-মুসলিম বিভাজন। কিন্তু এটি স্রেফ কোনো সাম্প্রদায়িক বিষয় নয়। এর সংকট আরও গভীরে।

১৮৮৫-৮৬ সালের একটি বিতর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কলকাতার একটি প্রকাশনায় পূর্ব বাংলার ভাষাকে ‘অশুদ্ধ’ বলে বর্ণনা করেছিল এবং পরামর্শ দিয়েছিল যে এই অঞ্চলের লেখাগুলো যেন পশ্চিম বাংলায় বসে সম্পাদনা করা হয়।

ফিরোজ আহমেদ প্রশ্ন তোলেন, ভাষার মান নির্ধারণ করার অধিকার তাদের কে দিয়েছে?

তিনি আরও যোগ করেন, ভাষাগত বিশুদ্ধতা নিয়ে বিতর্কগুলো আসলে সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের লড়াই ছিল। ‘বন্দোবস্ত’-এর মতো শব্দগুলো দীর্ঘকাল ধরে বাংলার অংশ ছিল এবং উপর থেকে শব্দ চাপিয়ে দেওয়ার ধারণাটি তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি বলেন, কেউ জোর করে কোনো শব্দ ভাষায় ঢুকিয়ে দিতে পারে না। একটি শব্দ তখনই টিকে থাকে যখন মানুষ তা ব্যবহার করে।

তিনি আরও বলেন, সেরা পরিভাষাগুলো প্রায়শই সেই ভাষাগুলো থেকে আসে যা ঐতিহাসিকভাবে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক গঠন তৈরি করেছে। সংকীর্ণতার কারণে সেগুলোকে বর্জন ভাষাকে দুর্বল করে দেয়।

বাংলা একাডেমিতে কর্মরত গবেষক মামুন সিদ্দিকী বলেন, পাকিস্তান আমলে ভাষার প্রশ্নটি ভূমি, গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক অধিকার থেকে অবিচ্ছেদ্য ছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার আগেই রাষ্ট্রভাষা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। ‘এটি ছিল রামের জন্মের আগে রামায়ণ রচনার মতো।’

প্রাবন্ধিক আবদুল হককে উদ্ধৃত করে তিনি  বলেন, ভাষার স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অপূর্ণ থেকে যায়। ভাষাবিদ এনামুল হক সতর্ক করেছিলেন যে উর্দু চাপিয়ে দেওয়া হলে তা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ‘রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক মৃত্যু’ ডেকে আনবে।

সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদের কথা উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘জনগণের ভাষা এবং রাষ্ট্রের ভাষা যদি এক না হয়, তবে সেই রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হতে পারে না।’

এই গবেষক বলেন, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট ও দিনাজপুরের সংবাদপত্র ও সাময়িকীগুলোতে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার পক্ষে যুক্তি দেওয়া হতো, যা প্রমাণ করে যে এই দাবি কেবল ঢাকাভিত্তিক উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

‘এই লেখাগুলো মানুষের মনস্তত্ত্ব তৈরি করেছিল,’ মন্তব্য করে তিনি ভাষা সংগ্রামকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির সঙ্গে যুক্ত হিসেবে বর্ণনা করেন এবং যুক্তি দেন যে এই সংযোগ ছাড়া ‘কোনো ভাষা আন্দোলন সফল হতে পারে না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, আমরা যদি ‘বাঙালি মুসলিম’ শব্দটিকে একটি সম্মিলিত পরিচয় হিসেবে ভাবি, তবে সেটি মূলত ১৯৪৭-পরবর্তী সময়ের বিকাশ। দেশভাগের আগে এই শব্দ দুটিকে প্রায়শই আলাদাভাবে দেখা হতো।

ভাষার বিষয়ে তিনি কথ্য ও লেখ্য রূপের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে বলেন, ভাষাবিজ্ঞান কথা বলাকে অগ্রাধিকার দেয়, যেখানে ব্যাকরণ মূলত লিখিত নিয়মের ওপর গুরুত্ব দেয়। ১৯৪৭ সালের পর লিপি সংস্কার, বানান পরিবর্তন এবং প্রচুর পরিমাণে আরবি-ফারসি শব্দ প্রবেশের মাধ্যমে বাংলাকে নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, কারণ কৃত্রিমভাবে চাপিয়ে দিয়ে ভাষা টিকিয়ে রাখা যায় না।

রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক নিয়ে তিনি বলেন, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা (সংযোগকারী ভাষা) হিসেবে উর্দুর দাবি একটি নির্দিষ্ট যুক্তি অনুসরণ করত। তবে বাংলার জনতাত্ত্বিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ঐতিহ্য একে কোণঠাসা করা অসম্ভব করে তুলেছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা এবং যার একটি শক্তিশালী সাহিত্যিক ঐতিহ্য রয়েছে, তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা যায় না।

মতবিনিময় সভার শেষদিকে আলোচকদের সঙ্গে শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভাষা ও একুশ নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করেন শিমুল পারভীন। আলোচনা অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইমরান মাহফুজ।