উগ্র জাতীয়তাবাদীদের দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভাঙাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাঁয়তারা?
মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন—‘পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা আর নেই’। আরও জানালেন যে ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে ‘ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গভীর বিভাজন তৈরি হয়েছে’।
পাশাপাশি, আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পারে ‘বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার’ আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
একই অনুষ্ঠানে জার্মান নেতার মতো ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল মাখোঁও দীপ্তকণ্ঠে বললেন, ‘ইউরোপকে অবশ্যই ভূ-রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে হবে’।
আরও বললেন, ‘ধৃষ্টতা দেখানোর এটাই সঠিক সময়। শক্তিশালী ইউরোপ গড়ার এটাই প্রকৃত সময়।’
তার মতে, ‘ইউরোপকে শিখতে হবে ভূ-রাজনৈতিক শক্তি হতে কী কী করতে হয়।’
গত ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি মিউনিখে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা সম্মেলন নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসব তথ্য জানানোর পাশাপাশি আরও বলা হয়—মহাদেশীয় জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রধান দুই শক্তি জার্মানি ও ফ্রান্স। অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বার্লিন ও সামরিক শক্তি হিসেবে প্যারিস ২৭ দেশের এই জোটে তাদের প্রভাব বিস্তার করে আছে।
গত ২০ জানুয়ারি এই ইউরোপের সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে দাঁড়িয়ে বিশ্বব্যবস্থায় ‘ফাটল’ ধরার কথা বলে আলোচনায় এসেছিলেন ‘ইউরোপমুখী’ বা ‘যুক্তরাষ্ট্রবিমুখ’ কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। সেই ভাষণে তিনি মধ্যমশক্তির দেশগুলোকে ‘জেগে ওঠা’র অনুরোধ করেছিলেন।
মার্ক কার্নির বক্তব্যের চার সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে জার্মানির নেতা জানিয়ে দিলেন, পুরনো বিশ্বব্যবস্থার ‘মৃত্যু’ হয়েছে। একই সময়ে ফরাসি নেতা শোনালেন ইউরোপের ‘শক্তিশালী’ হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা।
মনে রাখা দরকার যে—১৯৯৩ সালে নেদারল্যান্ডসের মাসট্রিখট শহরে ইইউ জোটের জন্ম হলেও এবং এই জোটের সদরদপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে হলেও প্যারিস-বার্লিনের মেলবন্ধন এই মহাদেশীয় ঐক্যের জন্য খুবই জরুরি।
প্রায় ৩৩ বছর ধরে ‘ঐক্যের উদাহরণ’ হিসেবে বিবেচিত ইইউকে এখন ‘আরও শক্তিশালী’ হওয়ার স্বপ্ন দেখতে হচ্ছে মূলত ‘অস্তিত্ব রক্ষার’ জন্যই। কেননা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মিত্র ইউরোপের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
প্রায় আট দশক দায়িত্ব পালনের পর ইউরোপের নিরাপত্তা বিষয়টি ওয়াশিংটন ডিসি এখন ভিন্নভাবে দেখছে। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন যে, তারা সাহসী মিত্র চায়। ‘জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ ও প্রযুক্তিকে ভয় পায়’ এমন মিত্র চায় না হোয়াইট হাউস।
অভিবাসন নিয়ে শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিষ্টানদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার প্রতিবেশী কিউবা-বংশোদ্ভূত এই মার্কিন নেতার মন্তব্য: ‘মুক্তবিশ্বের আশায় আমরা আমাদের সীমানা খুলে দিয়েছিলাম। সেই সুযোগে বন্যার পানির মতো হু হু করে অভিবাসীরা ঢুকে পড়েছে। অভিবাসীরা আমাদের সমাজের ঐক্য, সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা ও জনগণের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলেছে।’
ট্রাম্প প্রশাসনের আরও অনেক অভিবাসনবিরোধী নেতার মতো সে দেশের প্রধান কূটনীতিক ৫৪ বছর বয়সী রুবিও মনে করেন, অভিবাসন না ঠেকালে অদূর ভবিষ্যতে ইউরোপের কয়েকটি দেশের জনসংখ্যার হার বদলে যাবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প কী চান?
২০২৫ সালে নভেম্বরে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ইউরোপের অভিবাসী নিয়ে বর্ণবাদী মন্তব্য করা হয়েছে। সে বছর ৫ ডিসেম্বর ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনের শিরোনাম বলা হয়—‘প্রতিরোধ গড়ে তুলুন’: নিরাপত্তা কৌশলে ইউরোপের চরম ডানপন্থীদের প্রতি ট্রাম্পের খোলামেলা সমর্থন।
এতে আরও বলা হয়, মহাক্ষমতাধর মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বলছে যে আগামী দুই দশকের মধ্যে ইউরোপীয় ‘সভ্যতা মুছে’ যেতে পারে। অভিবাসনকে এর মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই উন্নত মহাদেশটিকে ভিনদেশি অভিবাসীদের হাত থেকে রক্ষার জন্য ইউরোপের ভেতর থেকে ‘প্রতিরোধ গড়ে তোলার’ আহ্বানও জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের সই করা জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে আরও বলা হয়েছে—ইউরোপের অর্থনীতি দুর্বল। কিন্তু, এর প্রকৃত সমস্যা আরও গভীরে রয়ে গেছে।
দ্য গার্ডিয়ান প্রতিবেদন বলছে, যে ‘উদার’ মানবিকতার ওপর ভর করে ইইউভুক্ত দেশগুলো একে অপরের ভূ-সীমানা খুলে দিয়েছে, সেই ইইউ-সদস্যদের রাজধানীগুলোয় অভিবাসনবিরোধী ডানপন্থীরা দাপট দেখাচ্ছে। ইউরোপের রাজনৈতিক মঞ্চে শ্বেতাঙ্গ-জাতীয়তাবাদের ক্রমশ উত্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের ওভাল অফিস ‘ভীষণ আশাব্যঞ্জক’ হিসেবে দেখছে।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনবিরোধী বর্তমান ট্রাম্প সরকার ইউরোপের অভিবাসনবিরোধী দলগুলোকে সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে।
যেমন, জার্মানির অভিবাসনবিরোধী চরম জাতীয়তাবাদী দল ‘অলটারনেটিভ ফুর ডয়েচল্যান্ড’র (এএফডি) সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। এই রাজনৈতিক দলটিকে ‘নব্য নাৎসি’ বলে মনে করেন উদারপন্থীরা। কেননা, এই দলটির বিশ্বাস—বিদেশি অভিবাসীরা তাদের দেশ দখল করে নিচ্ছে। তারা উদারপন্থী ইউরোপের ধারণা থেকে সরে আসার আহ্বান জানাচ্ছে নিজ দেশের জনগণের কাছে। পাচ্ছে জনপ্রিয়তাও।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পলিটিকোর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৭ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী দল ন্যাশনাল আলির (আয়েন) নেতা মারিন লো পা ভালো অবস্থানে আছেন।
এ ছাড়াও, ইইউভুক্ত—ইতালি, হাঙ্গেরি, নেদারল্যান্ড, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, ফিনল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রে অভিবাসনবিরোধী উগ্র ডানপন্থীরা ক্ষমতায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প চান এমন তালিকায় ইইউয়ের অন্যান্য দেশগুলোও আসুক। তিনি কখনো সরাসরি কখনো দূতদের মাধ্যমে ইইউবিরোধী উগ্র ডানপন্থীদের উত্থানকে শ্বেতাঙ্গ খ্রিষ্টধর্মাম্বলীদের জন্য ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’ হিসেবে তুলে ধরছেন।
অর্থাৎ, যূথবদ্ধ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে ভাঙন ধরাতে চান ‘মার্কিন আধিপত্যবাদী’ ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাই তিনি সেসব দেশের উগ্র জাতীয়তাবাদীদের সমর্থন দিচ্ছেন, যাতে তারা মেগা বা ‘মেক ইউরোপ গ্রেট অ্যাগেইন’ স্লোগান তুলে জনগণের মন জয় করতে পারে। পাশাপাশি অনুগত থাকে ওয়াশিংটনের প্রতি।
ইইউকে ভাঙার পাঁয়তারা?
২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর সংবাদ সাময়িকী ‘পলিটিকো’র এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘ইউরোপের জাতীয়তাবাদীদের উৎসাহ দিতে ট্রাম্পের পরিকল্পনা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।’
এতে বলা হয়—ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষতি করতে মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ‘দেশপ্রেমিক ইউরোপীয় দলগুলোকে’ শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।
আরও বলা হয়, ট্রাম্পের পরিকল্পনা হচ্ছে ইউরোপ মহাদেশের উগ্র জাতীয়তাবাদীদের শক্তিশালী করার মাধ্যমে ‘ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব’ ফিরিয়ে আনা। তার পরিকল্পনা এখন বাস্তবের রূপ নিচ্ছে।
গত ১১ ফেব্রুয়ারি দ্য গার্ডিয়ানের অপর এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—‘অভিবাসীদের ওপর হামলা ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের রাজনীতি বিষয়ে ট্রাম্পের কর্মকর্তারা ইউরোপের উগ্র-ডানপন্থিদের সহযোগিতা করছে।’
‘মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সারাহ বি রজারস হোয়াইট হাউসের পক্ষে ইউরোপীয় উদার গণতান্ত্রিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সংঘাতের মুখ হিসেবে দেখা দিয়েছেন’ বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়।
এতে আরও বলা হয়—সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর বিরুদ্ধে ‘বাগযুদ্ধ’ বাড়িয়ে দিয়েছেন, এমন প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সারাহ বি রজারস যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে মিত্র দেশগুলোয় চরম ডানপন্থী রাজনীতির প্রচার-প্রচারণা প্রকাশ্যে চালিয়ে যাচ্ছেন।

ইউরোপের উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের জনপ্রিয় ‘মুখ’ হয়ে উঠছেন সারাহ। গত অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়ার পর সারাহ ইউরোপের উগ্র-ডানপন্থী নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। তিনি ইউরোপে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের কারণে জেল-জরিমানা দেওয়ার সমালোচনা করছেন।
এমনকি, তিনি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়ার সমালোচকদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর কাজ করছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সিএনএন জানায়—‘ইউরোপের প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর বার্তা: বদলে যাও নয়তো ছুঁড়ে ফেলে দেব।’
প্রতিবেদন অনুসারে—২০২৫ সালে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স মিথ্যা দাবি করে বলেছিলেন যে ইউরোপে বাগ-স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে দমন করা হচ্ছে। সেখানকার সভ্যতা অবক্ষয়ের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও এসব তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের অনেকের মত—চলতি বছর মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে একে অপরের ‘পরিপূরক’ বললেও মূলত তিনি সেই ইউরোপকে দেখতে চান যে ইউরোপ তাদের কথা মতো চলবে। সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের ‘সন্তান’ বলে অভিহিত করে করতালি পেলেও বিশ্লেষকদের মতে, রুবিও মূলত বুঝিয়ে দিয়েছেন যে ইউরোপকেই যুক্তরাষ্ট্রের কথা মতো চলতে হবে।
তা না হলে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে তার মিত্র খুঁজে নেবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন এই মার্কিন কর্মকর্তা।
অনেকের মতে, এই ঘোষণার মাধ্যমে ইউরোপের উগ্র জাতীয়তাবাদীদের ক্ষমতায় আনার দিকে ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইইউভুক্ত দেশগুলোর উগ্রপন্থীদের ভাষ্য—ইউরোপে জোট গড়ে সাধারণ জনগণের স্বার্থ নষ্ট করা হয়েছে। জোট রক্ষার বিশাল খরচ জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই তারা জোটের চেয়ে নিজ নিজ দেশের উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান।
ট্রাম্প প্রশাসনের ‘জোট নয়, নিজেদের শক্তিশালী করুন’ বক্তব্যের সঙ্গে ইউরোপের উগ্রবাদীদের বক্তব্য বেশ মিলে যায়।
তাই প্রশ্ন জাগছে—উগ্র জাতীয়তাবাদীদের দিয়ে কি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভাঙার পাঁয়তারা করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প?