রমজানের প্রথম দিন: ২০ টাকা হালি লেবুর দাম বেড়ে ১২০!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অনেকেই পোস্ট করেছেন, ‘লেবুর ভরি কত?’ কারণ, বাজারে যেন স্বর্ণের দামের মতোই তরতরিয়ে বেড়েছে লেবুর দামও।
লেবুর সঙ্গে চিনি বা গুড়ের শরবত ইফতারে অনেকেরই পছন্দের পানীয়। প্রথম রোজায় চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাই লেবু যেন হয়ে উঠেছে ‘স্বর্ণের মতো’ দামি।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা দরেও বিক্রি হয়েছে লেবু।
বহু বছর ধরে কারওয়ান বাজারে লেবু বিক্রি করেন হারুন মিয়া। তিনি লেবু আনেন টাঙ্গাইল ও সিলেট থেকে।
দ্য ডেইলি স্টারকে হারুন জানান, এখন বাজারে তিন ক্যাটাগরির লেবু বিক্রি হচ্ছে। বাছাই করা সবচেয়ে ভালো লেবু ১৫০-২০০ টাকা, মাঝারি মানেরটা ১০০-১২০ টাকা এবং ছোট আকারের লেবু ৬০-৮০ টাকা হালি দরে বিক্রি হচ্ছে।
৪২ বছর ধরে কারওয়ান বাজারে লেবু বিক্রেতা ফজল হক বলেন, ‘ছোট ছোট কাগজি লেবুর হালিও ৬০-৮০ টাকা। এখন কলম্বো লেবুটা বেশি পাওয়া যায়। আমি আনি ধামরাই থেকে। লম্বা লেবুর চেয়ে গোল আকারের এই কলম্বো লেবুর দাম একটু কম। ১০০ টাকা হালি বিক্রি করেছি।’
শুধু রাজধানী নয়, ঢাকার বাইরেও লেবুর দামে ‘আগুন’।
রাজশাহীর সাহেব বাজার ঘুরে দেখা যায়, মাত্র ৩-৪ দিন আগেও লেবু ২০-২৫ টাকা হালিতে বিক্রি হচ্ছিল। কিন্তু, আজ আকারভেদে ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
শরীয়তপুরের বাজারে মাসখানেক আগেও যে লেবু আকারভেদে ২০ থেকে ৫০ টাকা হালিতে বিক্রি হতো, সেটাই আজ দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হয়েছে।
আজ সকালে শরীয়তপুরে সদর উপজেলার পালং মধ্য বাজারে খুচরা বিক্রেতারা লেবুর বাড়তি দামের বিষয়টি নিয়ে কথা বললেও পাইকারি বিক্রেতা ও আড়তদাররা বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।
পাইকারি বিক্রেতা রাজ্জাক কোতোয়ালের আড়তে গিয়ে দেখা যায়, তার কর্মচারীরা মাঝারি ও বড় লেবু ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং ছোট লেবু ৬০ থেকে ৭০ টাকা হালি দরে বিক্রি করছেন।
অথচ দাম জানতে চাইলে রাজ্জাক কোতোয়াল বলেন, ‘ছোট-বড় মিলিয়ে ৬০ টাকা হালি।’ তার কর্মচারী বেশি দামে বিক্রি করছে, সেটা জানানো হলে আর কথা বলেননি তিনি।
বাজারের খুচরা বিক্রেতা মো. সালমান বলেন, ‘মাসখানেক আগেও ২০-৩০ টাকা হালিতে লেবু বিক্রি করেছি। এখন বিক্রি করছি ৬০-১০০ টাকায়।’
তিনি বলেন, ‘দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাও অনেক কমে গেছে। বেশিরভাগ মানুষ দাম শুনে লেবু না কিনে ফেরত যাচ্ছে।’
সালমানের কাছ থেকে ৯০ টাকা হালিতে লেবু কিনেছেন শরীয়তপুরে সদর উপজেলার তুলাশার এলাকার বাসিন্দা সবুজ তালুকদার। তার অভিযোগ, প্রশাসন ঠিকমতো বাজার তদারকি করছে না। এ জন্যই রমজান এলেই দ্রব্যের দাম বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘এক হালি লেবু ৯০ টাকা দিয়ে কিনেছি। আমার সামর্থ্য আছে, কিনতে পেরেছি। কিন্তু, যাদের সামর্থ্য নেই, তারা কী করবেন? বাজারে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।’
রাজ্জাকের আড়ত থেকে ছোট আকারের এক হালি লেবু ৭০ টাকা দিয়ে কিনেছেন উপজেলার দাসাত্বা এলাকার খবির হোসেন খান। তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগেও এই আকারের লেবু ৪০ টাকা হালি দরে কিনেছি। আজ প্রায় দ্বিগুণ দামে কিনলাম।’
‘সারাদিন রোজা রাখার পর শরবতে লেবু দিলে শরীরে একটু শক্তি পাই। লেবুর দাম একটু কম হলে ভালো হতো,’ যোগ করেন তিনি।
দক্ষিণ বেগুনবাড়ি এলাকা থেকে কারওয়ান বাজারে আসা মো. শাকিল বলেন, ‘আমাদের এলাকায় লেবুর দাম বেশি দেখে কারওয়ান বাজারে এসেছিলাম। এখানে এসেও দেখি একই অবস্থা।’
দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা হারুন মিয়া বলেন, ‘এখন আসলে লেবুর সিজন না। সারা বছর পাওয়া গেলেও লেবুর আসল সিজন হলো বর্ষায়। এজন্য প্রতি বছরই এই সময়ে লেবুর দাম একটু বেশি থাকে। সেইসঙ্গে এবার এই সময়ে রমজান মাস পড়ে যাওয়ায় চাহিদা ব্যাপক বেড়ে গেছে, আর দামও একটু বেশি বেড়েছে।’
তার মতে, সাধারণ সময়ের চেয়ে রোজায় লেবুর চাহিদা ১০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। কিন্তু, লেবুর বাগানিরা সেই অনুপাতে লেবু যোগান দিতে পারছে না। তাই সরবরাহও তুলনামূলক কম।
কিন্তু, শরীয়তপুরের খুচরা ব্যবসায়ী সালমান বললেন ভিন্ন কথা। তার ভাষ্য, ‘আমরা কী করব? বেশি দামে কিনছি বলে বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। মূলত রমজান এলেই আড়তদাররা লেবুর দাম বাড়িয়ে দেন। চোতা (ক্যাশ মেমো) চাইলেও দেয় না। এই কারণে আমরা বিক্রি করি ভয়ে ভয়ে। কখন যে প্রশাসন এসে আমাদের জরিমানা করে দেয়!’
লেবুর পাইকারি বাজারের সঙ্গে খুচরা বাজারের পার্থক্যও বেশ খানিকটা। কারওয়ান বাজারের ফজল জানান, ১০০ পিস কলম্বো লেবু পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ১০০০-১২০০ টাকায়। হারুন মিয়া জানান, লম্বা লেবু ১০০ পিস ১৬০০-১৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সে হিসাবে, কলম্বো লেবুর হালি হয় সর্বোচ্চ ৪৮ টাকা এবং লম্বা লেবু সর্বোচ্চ ৬৮ টাকা। সেখানে এগুলো খুচরা বিক্রি হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি দামে।
শরীয়তপুরে ভোক্তা অধিকারের সহকারী পরিচালক জান্নাতুল ফেরদাউস বলেন, ‘রমজানে ক্রেতাদের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দ্রব্যমূল্যও বেড়ে যায়। ক্রেতাদের মধ্যেও অনেকে অতিরিক্ত কেনাকাটা করেন। অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগটা নেন।’
তিনি বলেন, ‘কেউ যদি অতিরিক্ত মুনাফা করেন বা কেউ যদি লিখিত অভিযোগ করেন, আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। আমাদের নিয়মিত অভিযান চলমান রয়েছে।’
একইসঙ্গে নিজেদের জনবল সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা অফিসে মাত্র দুইজন। লোকবল সংকট থাকায় চাইলেও আমরা অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবজায়গায় অভিযান চালাতে পারছি না।’