নেতিবাচক কথাগুলো কেন সহজে ভোলা যায় না?

শবনম জাবীন চৌধুরী

‘সেদিন আমার ফেসবুক বিজনেস পেজে নতুন একটি হ্যান্ড-পেইন্টেড কামিজের ছবি আপলোড করলাম। নতুন ডিজাইনটির সবাই বেশ প্রশংসা করল। আমার বেশ ভালো লাগছিল। প্রশংসা কার না ভালো লাগে! আর যদি সেটা হয় নিজের সৃষ্টি করা কোনো শিল্পকর্ম বা কাজের, তখন তো আত্মতৃপ্তিতে মন ভরে যায়। কমেন্ট সেকশন স্ক্রল করতে গিয়ে হঠাৎ একটি মন্তব্যে আমার চোখ আটকে গেল—“এ আর এমন আহামরি কী ডিজাইন! অমন সস্তা ডিজাইন করে আদিখ্যেতা করতে ভালোই জানেন। কী রুচি রে বাবা!” এত এত ইতিবাচক কথার ভিড়ে এই মন্তব্যটি পড়ে আমি কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কথাগুলো যেন একরকম মনেই গেঁথে গেল। এখন যখনই কাপড়ে রঙ-তুলির ছোঁয়ায় নতুন কোনো ডিজাইন করতে যাই, নিজের অজান্তেই এই মন্তব্যটি আমার মনে পড়ে যায়।’

নিজের এমন অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করছিলেন একজন নতুন উদ্যোক্তা। শুধু তিনি নন, আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই হয়তো এমনটা ঘটে। শত শত ইতিবাচক ঘটনা বা কথার ভিড়ে আমরা গুটিকয়েক নেতিবাচক কথার কাছেই যেন জিম্মি হয়ে যাই। আমাদের মস্তিষ্ক যেন সেগুলোকে স্মৃতিতে আঁকড়ে ধরে রাখে। আর এর প্রভাব পড়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও। কিন্তু এমনটা কেন হয়?

এ বিষয়ে আমাদের বিস্তারিত জানিয়েছেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার

স্মৃতি আমাদের আবেগগুলোকে কীভাবে ধরে রাখে?

আবেগ বা অনুভূতির ক্ষেত্রে স্মৃতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। স্মৃতি আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া নানা অভিজ্ঞতাকে সংরক্ষণ করে, বর্তমানে কী ঘটছে তা প্রত্যক্ষ করে এবং ভবিষ্যতে কী হতে পারে, তা নিয়েও ভাবতে সাহায্য করে।

সুখ ও দুঃখের স্মৃতিগুলো আমাদের মস্তিষ্কে জমা হতে থাকে। বিভিন্ন বিষয়, যেমন: ব্যক্তি, স্থান বা পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে থাকা অবস্থায়ও অতীতের অনেক ঘটনা বা কথা আমাদের মনে পড়ে যায়।

তবে আমাদের মস্তিষ্ক সব ঘটনাকে একইভাবে মনে রাখে না। কিছু বিষয়কে তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেয়, আবার কিছু বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়। ‘স্ট্রং ইমোশন’ যেমন: সুখ, দুঃখ বা ভয়—এসব অনুভূতি বিভিন্ন ঘটনাকে সহজেই মনে রাখতে সাহায্য করে এবং কালের স্রোতেও সেগুলো অনেক সময় ভুলতে দেয় না।

নেগেটিভ কথা বা ঘটনাগুলো আমাদের কেন বেশি মনে থাকে?

ডা. মেখলা সরকারের মতে, আমাদের মস্তিষ্ক ইতিবাচক ঘটনার তুলনায় নেতিবাচক ঘটনাগুলো বেশি মনে রাখে। একে বলা হয় নেগেটিভিটি বায়াস। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের টিকে থাকতে সাহায্য করে।’ ডা. মেখলা সরকার নিচের কারণগুলো উল্লেখ করেন—

টিকে থাকার জন্য

অতীতে বিভিন্ন বিপজ্জনক বিষয়, যেমন: বন্য জন্তু-জানোয়ার, বিষাক্ত গাছ-গাছালি বা সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার স্মৃতি মনে রাখার ফলে আদিম মানুষ পরবর্তীকালে সেগুলো এড়িয়ে চলতে এবং বিপদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারত। বর্তমানে এসেও এমনটাই ঘটে থাকে।

স্ট্রং ইমোশন স্মরণীয় স্মৃতি তৈরি করে

ভয়, দুঃখ বা রাগ আমাদের মস্তিষ্ককে অধিক প্রভাবিত করে। ফলে এ ধরনের নেতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের মনে গভীরভাবে গেঁথে যায়।

নেতিবাচক ঘটনাগুলো নিয়ে আমরা বারবার চিন্তা করি

একটু খেয়াল করলে দেখবেন, অবসরে বা একান্তে আমরা জীবনে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা তীর্যক সমালোচনার কথা বারবার স্মরণ করি। এর কারণ হলো, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। পাশাপাশি, আসলে কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল বা যদি কোনো ভুল থেকে থাকে তা শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করি।

ইতিবাচক স্মৃতিগুলো দ্রুত ফিকে হয়ে যায় কেন?

আমাদের জীবনে ইতিবাচক ঘটনাগুলো আনন্দ এনে দেয়। তবে নেতিবাচক ঘটনার তুলনায় ইতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের স্মৃতিতে অতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এর কারণগুলো হলো:

  • আমাদের ব্রেন কোনো ইতিবাচক ঘটনাকে খুব বেশি বিশেষ, আশ্চর্যজনক বা অর্থবহ মনে না করলে, সাধারণত সেটি দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করে না।

  • আমরা জীবনে ভালো কিছু অর্জন করলে বা ইতিবাচক কোনো ঘটনা ঘটলে, সেই মুহূর্তগুলো উপভোগ না করেই খুব দ্রুত পরবর্তী অর্জনের দিকে মনোনিবেশ করে ফেলি।

  • সামনে এগিয়ে যাওয়ার এই পরিকল্পনা আমাদের সফলতার পথে হাঁটতে শেখায়। তবে এর ফলে সদ্য পাওয়া আনন্দের অনুভূতিও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ফিকে হয়ে যায়।

নেতিবাচক উপেক্ষা করে ইতিবাচক স্মৃতিকে প্রাধান্য দিতে পারেন যেভাবে

যদিও আমাদের ব্রেন নেতিবাচক বিষয়গুলোকেই বেশি প্রাধান্য দেয়, ড. মেখলা কিছু বিষয়গুলো অনুশীলনের পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে ইতিবাচক স্মৃতিগুলো আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

  • কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস গড়ে তুলুন। আপনি যে বিষয়গুলোর জন্য কৃতজ্ঞ, সেগুলোর জন্য প্রতিদিন অন্তত একবার মনে মনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন।

  • জীবনে ভালো কিছু ঘটলে সময় নিয়ে তা উপভোগ করুন।

  • জীবনে নেতিবাচক কিছু ঘটলে শুধু তা থেকে পাওয়া কষ্ট নিয়ে না ভেবে, বরং সেখান থেকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করুন। ইতিবাচক মনোভাব ও সেলফ-মোটিভেশনের মাধ্যমে তা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করুন।

  • একাগ্রতা বা মেডিটেশনের অনুশীলন আমাদের অতিরিক্ত বা নেতিবাচক চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে।