ডায়োজেনিস সিনড্রোম কী, ঝুঁকিতে কারা?
ডায়োজেনিস সিনড্রোম এমন একটি আচরণগত সমস্যা, যা মূলত চরম আত্ম-অবহেলা ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন অবস্থা সৃষ্টি করে। সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
এই সিনড্রোম সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক, কথাসাহিত্যিক এবং মনোশিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল।
ডায়োজেনিস সিনড্রোম কী
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, ডায়োজেনিস সিনড্রোম একধরনের আচরণগত সমস্যা এবং মানসিক অবস্থা। এই সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেকে চরমভাবে অবহেলা করে, নিজের যত্ন নেয় না কিংবা যত্নহীনতায় ভোগে। সামাজিকভাবেও সবার কাছ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অপ্রয়োজনীয় জিনিস জমিয়ে রাখার প্রবণতাও বেড়ে যায় তাদের আচরণে।
এটি মানসিক রোগের শ্রেণিবিন্যাসে কোনো স্বতন্ত্র ক্যাটাগরি নয়, আমেরিকান সাইকিয়াট্রি অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক প্রণীত ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিজঅর্ডারস বা ডিএসএম-৫ ডায়াগনোসিসও নয়, বরং একটা সিনড্রোম বা আচরণগত প্যাটার্ন। এটি বিভিন্ন মানসিক বা স্নায়বিক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে থাকে বা হয়।
কেন হয়
ডায়োজেনিস সিনড্রোম সাধারণত একক কারণে হয় না। বহুমাত্রিক কারণের মিথস্ক্রিয়ায় এমনটা ঘটে থাকে।
কিছু মানসিক সমস্যার সঙ্গে এটি সম্পর্কিত হতে পারে। মানসিক রোগের মধ্যে আছে বিষণ্নতা রোগ, ভুলে যাওয়া রোগ বা ডিমেনশিয়া, সিজোফ্রেনিয়ার মতো জটিল মানসিক রোগ, ব্যক্তিত্বের সমস্যা বা পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, বিশেষত প্যারানয়েড বা স্কিজয়েড ট্রেইসের লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে ডায়োজেনিস সিনড্রোম।
স্নায়বিক কারণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফ্রন্টাল লোব ডিসফাংশন। মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব ক্ষতিগ্রস্ত হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা লোপ পায়, নিজের অবস্থা বোঝার ক্ষমতা কমে যায়।
সামাজিক কারণের মধ্যে প্রধানত একাকীত্ব, সঙ্গীর মৃত্যু, সামাজিক সহায়তার অভাব বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা যায়।
কখন সমস্যাটির ট্রিগার অন হতে পারে
আকস্মিক মানসিক আঘাত (প্রিয়জনের মৃত্যু, ট্রমা, একাকীত্ব) জীবনের বড় পরিবর্তন বয়ে নিয়ে আসে ও সংকট তৈরি করতে পারে, যা ডায়োজেনিস সিনড্রোমকে ট্রিগার করে।
ঝুঁকিতে কারা
ডায়োজেনিস সিনড্রোমের বেশি ঝুঁকিতে থাকেন বয়স্ক মানুষ, বিশেষ করে একা বসবাসকারী, পূর্ববর্তী মানসিক রোগ, দীর্ঘদিনের একাকীত্ব, দারিদ্রতা, সামাজিক সহায়তার ঘাটতি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাদকাসক্তরাও এতে আক্রান্ত হতে পারেন।
লক্ষণ
ডায়োজেনিস সিনড্রোমের লক্ষণগুলো সাধারণত খুব স্পষ্ট, যেমন:
আত্ম-অবহেলা: ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব, দীর্ঘদিন গোসল না করা, দাঁত না মাজা, অপরিচ্ছন্ন পোশাক পরা, খাওয়া-দাওয়ার অবহেলা।
অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন বাসস্থান: বাসা অত্যন্ত নোংরা ও অগোছালো থাকা, ময়লা-আবর্জনা জমে থাকা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হওয়া।
হোর্ডিং আচরণ: অপ্রয়োজনীয় জিনিস (পুরোনো কাগজ, কাপড়, ভাঙা জিনিস ইত্যাদি) জমিয়ে রাখা, কখনো আবর্জনাও ফেলে না দেওয়া।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলা, একা থাকতে চাওয়া, পরিবার, প্রতিবেশী বা বন্ধুদের থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।
সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব: নিজের সমস্যাকে সমস্যা হিসেবে স্বীকার না করা, কারো সাহায্য বা চিকিৎসা নিতে অস্বীকৃতি জানানো।
চিকিৎসা
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, ডায়োজেনিস সিনড্রোমের চিকিৎসা সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। কারণ রোগীরা সাধারণত চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হন না। কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তিও করানো লাগতে পারে।
চিকিৎসায় একাধিক বিশেষজ্ঞের সমন্বিত ভূমিকার প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষেজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, সমাজকর্মী ও পারিবারিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন হয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চিকিৎসা সম্ভব।
কারণভিত্তিক চিকিৎসা: সমস্যার অন্তর্গত কারণ বা ডায়াগনোসিস করার পর চিকিৎসা চালাতে হবে। এক্ষেত্রে বিষণ্নতা থাকলে রোগীকে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ, ডিমেনশিয়া থাকলে কগনিটিভ সহায়তা, সাইকোসিস থাকলে অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। এসব ওষুধ খেতে প্রথমে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখিয়ে যথাযথ ডায়াগনোসিস এবং চিকিৎসা পরিকল্পনা ঠিক করে অগ্রসর হতে হবে।
আচরণগত হস্তক্ষেপ কিংবা বিহেভিওরাল ইন্টারভেনশন: ধীরে ধীরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি শেখানো, জিনিসপত্র গোছানোর অভ্যাস তৈরি করা। কিন্তু জোর করা যাবে না।
সামাজিক সহযোগিতা: সামাজিক সহযোগিতা চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অনুষদ। এর মধ্যে রয়েছে কমিউনিটি কেয়ার, কেয়ারগিভার সাপোর্ট।
লিগ্যাল ইন্টারভেনশন: কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনগত দিকটাকে গুরুত্ব দিতে হবে, লিগ্যাল ইন্টারভেনশন বা আইনি হস্তক্ষেপও চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, ডায়োজেনিস সিনড্রোম অলসতা বা অভ্যাসগত অগোছালো জীবন নয়, বরং এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সংকটের প্রকাশ। আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহযোগী হতে হবে পরিবার, সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে।



