‘হিস্ট্রিওনিক পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার’ সম্পর্কে জানেন? লক্ষণগুলো কী

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

মানুষ মাত্রই অন্যের মনোযোগ পেতে চায়—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন তা অতিরিক্ত, নিয়ন্ত্রণহীন, সম্পর্ক এবং যাপিত জীবনে সমস্যা তৈরি করে, তখনই এটিকে ডিজঅর্ডার বলা হয়ে থাকে। অন্যের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকার প্রবণতাই হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক, কথাসাহিত্যিক এবং মনোশিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল।

হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার কী

অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারে (এইচপিডি) ব্যক্তি সবসময় অন্যের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চায়। তারা এমনভাবে কথা বলে, আচরণ করে বা নিজেকে উপস্থাপন করে যেন সবাই তাদের দিকে তাকায়, তাদের নিয়ে ভাবে। শুধুমাত্র মনোযোগ পেতেই তাদের ভালো লাগে তা নয়, মনোযোগ না পেলেও তারা অস্বস্তি, অস্থিরতা বা শূন্যতা অনুভব করে।

কারণ

এই ধরনের ব্যক্তিত্বের সমস্যায় সুনির্দিষ্ট একক কারণ নেই। এটি সাধারণত বহু কারণের সমন্বয়ে ঘটে থাকে।

  • হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারে শৈশবের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক—অতিরিক্ত প্রশংসা বা সম্পূর্ণ অবহেলা—দুটোই ভূমিকা রাখতে পারে।

  • ‘ভালোবাসা পেতে হলে আমাকে বিশেষ কিছু করতে হবে’—এমন বিষয় শেখার ফলে নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য ব্যক্তিত্বে ছাপ ফেলে দেয়।

  • বাহ্যিক সৌন্দর্য বা নাটকীয় আচরণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা আচরণে বিদঘুটে ভাবে দেখা যায়।

  • পরিবার কিংবা সামাজিক প্রভাবও ত্রুটিপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী।

  • মানসিক গঠন (পার্সোনালিটি ট্রেইটস), আবেগপ্রবণতা এসবও কারণ হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে।

  • কিছু ক্ষেত্রে মেজাজ বা নিউরোবায়োলজির মতো জৈবিক কারণ ভূমিকা রাখতে পারে।

লক্ষণ

অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারের লক্ষণগুলো বেশ নাটকীয় ও চোখে পড়ার মতো।

১. ব্যক্তি অ্যাটেনশন-সিকিং বিহেভিয়ার বা সবসময় আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে চায়।

২. অন্য কেউ গুরুত্ব বা প্রশংসা পেলে অস্বস্তি ও অস্থিরতায় ভোগে।

৩. অতিরিক্ত আবেগীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে আবেগ দ্রুত বদলায়।

৪. অনুভূতি অনেক সময় ওভার-এক্সপ্রেসড বা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের মনে হয়।

৫. এদের কথা বলায় নাটকীয়তা বা ড্রামাটিক স্টাইল থাকলেও বিষয়বস্তুর গভীরতা কম থাকে।

৬. পোশাক বা আচরণ কিংবা ফিজিক্যাল লুক ব্যবহার করেও মনোযোগ আকর্ষণের প্রবণতা থাকে।

৭. তারা সহজেই প্রভাবিত হয়ে যায় বা অন্যের মতামতের আলোকে সহজে প্রভাবিত হয়।

৮. শেলো রিলেশনশিপ বা সম্পর্ককে বাস্তবের চেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ মনে করেন; মূলত ঘনিষ্ঠ নয়।

চিকিৎসা

হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারের চিকিৎসা সম্ভব। তবে ধৈর্য ও সময় লাগে। মূল কথা হলো হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারে ব্যক্তি সবসময় মনোযোগের কেন্দ্র হতে চায় এবং আবেগকে খুব নাটকীয়ভাবে প্রকাশ করে। এটি সাধারণ অভ্যাস নয়, বরং ব্যক্তিত্বের গভীরে গড়ে ওঠা একটা বিশেষ প্যাটার্ন। এর চিকিৎসায় সবচেয়ে কার্যকর হলো সাইকোথেরাপি, যেখানে ধীরে ধীরে ব্যক্তি নিজের আচরণ বুঝতে শেখেন।

সাইকোথেরাপি (টক থেরাপি) হলো এইচপিডি চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; এর মাধ্যমে আত্মসচেতনতা বা ইনসাইট বাড়ানোর মাধ্যমে নিজের আচরণ বোঝাতে সহযোগিতা করা হয়।

চিকিৎসায় আবেগীয় বুদ্ধি (ইকিউ) শেখানোর দিকেও নজর দিতে হয়।

কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির (সিবিটি) মাধ্যমে রোগীর চিন্তা ও আচরণের প্যাটার্ন পরিবর্তন, নেতিবাচক চিন্তায় ইতিবাচক ভাবনা প্রতিস্থাপিত করা হয় বা পরিবর্তনে সহযোগিতা করা হয়।

গ্রুপ থেরাপির মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে অন্যদের সঙ্গে সুস্থ মিথস্ক্রিয়া বা হেলদি ইন্টারেকশন শেখানোর মাধ্যমে অবস্থার উন্নতি ঘটানো যায়।

অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারের জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। তবে যদি সঙ্গে হতাশা বা উদ্বেগ থাকে, তখন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ দিতে পারেন।