মেনিনজাইটিস কেন হয় জানেন? ঝুঁকিতে কারা

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি, স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়া এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে মেনিনজাইটিস। রোগটি সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকা ও সময়মতো চিকিৎসার অভাব জটিলতা বাড়ায়।

মেনিনজাইটিস সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী।

মেনিনজাইটিস কী

অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, মেনিনজাইটিস হলো মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডকে ঘিরে থাকা সুরক্ষামূলক ঝিল্লি, যাকে মেনিনজেস বলা হয়, তার প্রদাহ বা সংক্রমণ। অর্থাৎ কোনো জীবাণু বা বিশেষ পরিস্থিতিতে শরীরের প্রতিরক্ষা ভেঙে গেলে ওই ঝিল্লিতে সংক্রমণ হয়। এটি দ্রুত মারাত্মক হতে পারে, তাই সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা খুবই জরুরি। মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডকে তিন স্তরের ঝিল্লি ঘিরে রাখে। যেমন:

  • ডিউরা মেটার
  • অ্যারাকনয়েড মেটার
  • পিয়া মেটার

এই ঝিল্লিগুলোর প্রদাহই মেনিনজাইটিস।

কেন হয়

১. ভাইরাল

মেনিনজাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ কারণ হচ্ছে ভাইরাল সংক্রমণ। যা মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে এটি তুলনামূলক কম গুরুতর। নিজে থেকেই ভালো হতে পারে। অ্যান্টেরোভাইরাস, হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস, মাম্পস ভাইরাস হলো এর মূল কারণ। শ্বাসতন্ত্রের ড্রপলেট, দূষিত পানি ও খাবার, শরীরের তরল পদার্থের মাধ্যমে এটি ছড়ায়।

২. ব্যাকটেরিয়াল

সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস। দ্রুত চিকিৎসা না হলে মৃত্যু বা স্থায়ী জটিলতা হতে পারে। নেইসেরিয়া মেনিনজাইটাইডিস, স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনিয়া, হ্যামোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা হচ্ছে সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া। নাক বা গলার সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে পড়ে, রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কের ঝিল্লিতে পৌঁছে যায়, কখনো সরাসরি কানের সংক্রমণ, সাইনাস, মাথার আঘাত থেকেও ছড়াতে পারে।

৩. টিউবারকুলাস (টিবি মেনিনজাইটিস)

শরীরে আগে থেকেই টিবি থাকলে রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারে। ধীরে ধীরে উপসর্গ বাড়ে। বাংলাদেশে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

৪. ফাঙ্গাল সংক্রমণ

সাধারণত যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম (ডায়াবেটিস, ক্যানসার, এইচআইভি রোগী) তাদের হয়। ক্রিপটোকক্কাস নামক ছত্রাকের কারণে এটি হতে পারে।

লক্ষণ

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে মেনিনজাইটিসের লক্ষণ

  • উচ্চ জ্বর
  • তীব্র মাথাব্যথা
  • ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া (নেক রিজিডিটি)
  • বমি-বমি ভাব
  • আলো সহ্য না হওয়া (ফটোফোবিয়া)
  • অচেতনতা বা খিঁচুনি

শিশুদের ক্ষেত্রে মেনিনজাইটিসের লক্ষণ

  • অস্বাভাবিক কান্না
  • খেতে না চাওয়া
  • শরীর ঢিলে বা অতিরিক্ত খিটখিটে
  • মাথার উপরের নরম অংশ ফুলে যাওয়া (বালগিং ফনটানেল)
  • ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিসে ত্বকে লালচে বা বেগুনি দাগ (র‌্যাশ) হতে পারে।

ঝুঁকিতে কারা

৫ বছরের নিচের শিশু, বয়স্ক মানুষ, যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, হোস্টেল বা ডরমিটরিতে থাকা মানুষ, টিকা না নেওয়া ব্যক্তি, দীর্ঘদিন কানের বা সাইনাসে ইনফেকশন আছে যাদের, তাদের মেনিনজাইটিস আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, মেনিনজাইটিস নির্ণয়ে লুম্বার পাঙ্কচার (সিএসএফ পরীক্ষা) করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া রক্ত পরীক্ষা এবং কিছু ক্ষেত্রে সিটি স্ক্যান, এমআরআই করা হয়।

মেনিনজাইটিসের চিকিৎসা নির্ভর করে কারণ (ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, টিবি বা ফাঙ্গাল), রোগীর বয়স ও রোগের তীব্রতার ওপর। বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিসে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হয়।

ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস হলে রোগীকে দ্রুত আইভি অ্যান্টিবায়োটিক, কখনো স্টেরয়েড যেমন: ডেক্সামেথাসোন দিতে হবে। ভাইরাল সংক্রমণ থেকে হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহায়ক চিকিৎসা, যেমন: রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে, পর্যাপ্ত তরল এবং জ্বর ও ব্যথার ওষুধ দিতে হবে, হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস হলে অ্যাসাইক্লোভির দিতে হবে। অধিকাংশ ভাইরাস মেনিনজাইটিস ৭ থেকে ১০ দিনে সেরে যায়।

এছাড়া টিবি মেনিনজাইটিস হলে রোগীকে অ্যান্টি-টিবি ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে দিতে হবে। ফাঙ্গাল মেনিনজাইটিসে অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ দিতে হবে দীর্ঘমেয়াদে। সময়মতো এবং সঠিক চিকিৎসা না হলে মেনিনজাইটিসের কারণে শ্রবণশক্তি নষ্ট হওয়া, স্মৃতি শক্তি দুর্বল হওয়া, খিঁচুনি, মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

প্রতিরোধ

মেনিনজাইটিস প্রতিরোধে সময়মতো টিকা নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। হ্যামোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি, নিউমোকক্কাল, মেনিনগোকক্কাল ভ্যাকসিন নিতে হবে। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সংক্রমিত ব্যক্তির কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে, সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে কিছু ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক অ্যান্টিবায়োটিক নিতে হবে।

যদি হঠাৎ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মারাত্মক হতে পারে।