চোখের রোগ ‘মায়োপিয়া’ সম্পর্কে জানেন কি, আক্রান্ত কি না বুঝবেন যেভাবে

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

মায়োপিয়া চোখের এমন একটি সমস্যা যেখানে ব্যক্তির দূরের জিনিস দেখতে কষ্ট হয়। দৃষ্টিজনিত এই সমস্যা যদি মাঝারি ও তীব্র হয়, সেক্ষেত্রে জটিলতা গুরুতর হতে পারে।

মায়োপিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিটি অপথালমোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শওকত কবীর।

মায়োপিয়া কী, কেন হয়

অধ্যাপক ডা. মো. শওকত কবীর বলেন, মায়োপিয়া হলো এক ধরনের দৃষ্টি স্বল্পতা, যেখানে রোগী দূরের জিনিস ঝাপসা দেখে, দূরের জিনিস দেখতে সমস্যা হয়। তবে কাছের জিনিস স্পষ্ট দেখতে পায়।

বংশগত বা জেনেটিক কারণে মায়োপিয়া হতে পারে। বাবা-মা দুজনেরই যদি মায়োপিয়া থাকে, তাহলে শিশুর উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে মায়োপিয়া হওয়ার।

পরিবেশগত বিভিন্ন কারণে মায়োপিয়া হতে পারে। যেমন: যারা দীর্ঘসময় ধরে কম্পিউটারে কাজ করে, মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার, কম আলোতে পড়া, ঘরের কৃত্রিম আলোতে বেশি সময় থাকা, সূর্যের আলো ও বাইরের পরিবেশে কম সময় কাটানো, শহুরে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত তাদের মায়োপিয়া বেশি হয়।

কনজেনাইটাল মায়োপিয়া বা জন্মগতভাবে শিশু মায়োপিক হতে পারে। এ ছাড়া ৩ ধরনের বয়সজনিত মায়োপিয়া হতে পারে।

লক্ষণ

১. দূরের জিনিস ঝাপসা দেখা বা কম দেখা (রাস্তার সাইনবোর্ড কিংবা শ্রেণিকক্ষে ব্ল্যাকবোর্ড ঝাপসা দেখা)

২. চোখ কুঁচকে দেখা

৩. চোখে ট্যারা ভাব হতে পারে

৪. মাথা ব্যথা হয়

৫. চোখ ব্যথা হয়

৬. চোখে ক্লান্তি বা চাপ অনুভূত হয়

ঝুঁকি

সাধারণত পাওয়ার অনুযায়ী মায়োপিয়াকে কয়েক ভাগ করা যেতে পারে। যেমন:

  • হালকা (লো মায়োপিয়া): যাদের পাওয়ার -৩ পর্যন্ত থাকে
  • মাঝারি (মডারেট মায়োপিয়া): -৩ থেকে -৬ পর্যন্ত পাওয়ার
  • তীব্র (হাই মায়োপিয়া): যাদের -৬ এর উপরে থাকে

যাদের হালকা মায়োপিয়া থাকে, তাদের সাধারণত মায়োপিয়াজনিত জটিলতা তৈরি হয় না। কিন্তু মাঝারি থেকে তীব্র মায়োপিয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম জটিলতা হতে পারে। যেমন: রেটিনার সমস্যা হয়, রেটিনাতে ছিদ্র হয়, মায়োপিক ম্যাকুলোপ্যাথি, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, রেটিনা ছিঁড়ে যাওয়াসহ গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

অধ্যাপক ডা. মো. শওকত কবীর বলেন, মায়োপিয়ার চিকিৎসা রোগীর বয়স, পাওয়ার ও জটিলতা অনুযায়ী করা হয়। প্রথমত রোগীর ইতিহাস জানতে হবে এবং পরবর্তীতে দৃষ্টি পরীক্ষা (ভিজ্যুয়াল অ্যাকুইটি) করা হয় দূরের এবং কাছের দৃষ্টি সম্পর্কে জানার জন্য। এরপর নির্ধারিত যন্ত্রে রিফ্র্যাকশন পরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়ার পরীক্ষা করে রোগীকে মাইনাস পাওয়ারের চশমা দেওয়া হয়। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে যাদের বয়স ১০ বা ১০ এর নিচে তাদের সাইক্লোপ্লেজিক রিফ্রেকশন করতে হয় পাওয়ারজনিত ভুল এড়ানোর জন্য।

প্রাথমিকভাবে রোগীকে মায়োপিয়ার জন্য চশমা দেওয়া হয়। যাদের বয়স ১৫ বছরের বেশি, তাদের কন্টাক্ট লেন্স দেওয়া যেতে পারে। ২০ বছরের বেশি বয়স হলে তাদের ক্ষেত্রে ল্যাসিক বা পিআরকে (ফটোরিফ্র্যাক্টিভ কেরাটেক্টমি) কিংবা এসএমআইএলই (স্মল ইনসিশন লেনটিকিউল এক্সট্র্যাকশন) অস্ত্রোপচার করা যেতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাদের বেশি মায়োপিয়া তাদের ল্যাসিক বা অন্য কোনো মাধ্যমে ঠিক না হলে চোখের ভেতরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কন্টাক্ট লেন্স বসিয়ে দেওয়া হয়।

মায়োপিয়া প্রতিরোধে প্রতিদিন বাইরের কার্যক্রমে দিনে ২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় অংশ নিতে হবে, দীর্ঘসময় কম্পিউটার, ডিজিটাল স্ক্রিনে কাজ করার সময়, বই পড়ার সময় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অতিরিক্ত মুঠোফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে, শিশুদের স্ক্রিন টাইম কমাতে হবে, পড়ালেখা কিংবা কাজের ফাঁকে চোখের বিশ্রাম দিতে হবে মাঝেমাঝে। সুষম ও পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে হবে। এর পাশাপাশি নিয়মিত চোখের পরীক্ষা করাতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে মায়োপিয়া শনাক্ত হলে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ভবিষ্যতের গুরুতর জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে। সেজন্য চোখের যেকোনো সমস্যায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।