যেভাবে একটি বিল চলে গেল বিএনপি নেতাদের দখলে

আনিস মণ্ডল
আনিস মণ্ডল

কুষ্টিয়ার বিখ্যাত নান্দিয়ার বিলের ইজারা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কোনো দরপত্রের মাধ্যমে কাউকে বিলটির দায়িত্বও দেওয়া হয়নি। অথচ স্থানীয় বিএনপির নেতারা সেখানে কয়েকশ মণ মাছ অবমুক্ত করেছেন। নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বিলের অংশীদারত্বও।

বিএনপি নেতাদের একজন দাবি করেছেন, বিলটি ইজারা নিয়েছে একটি মৎস্যজীবী সমিতি। আরেক নেতা বলেছেন, ইজারা নিয়েছেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জিহাদুজ্জামান জিকু। আবার অন্য এক নেতা জানিয়েছেন, বিলের ২৫ শতাংশ অংশীদার হতে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার প্রয়োজন এবং বিলটি মূলত জিকুই পরিচালনা করবেন।

ইজারা নিয়ে প্রশাসনের বক্তব্যেও রয়েছে অসংগতি। দরপ্রস্তাবের মাধ্যমে একটি মৎস্যজীবী সমিতি বিলটির ইজারা পেয়েছে বলে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হারুন অর রশিদ জানালেও জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলছেন, বিলটি এখনো ইজারা দেওয়া হয়নি।

ইজারা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই এভাবে বিলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনায় একদিকে সরকারের রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বিলের মাছের ওপর নির্ভরশীল জেলে, স্থানীয় বাসিন্দা ও ভোক্তাসহ অন্তত ৫০ হাজার মানুষের জীবিকা ও স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

দুই বছর উন্মুক্ত ছিল বিল

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তৎকালীন ইজারাদারদের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়লে বিলের মাছ হরিলুট হয়ে যায়। এরপর প্রায় দুই বছর বিলটি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল।

এসময় স্থানীয় জেলে পরিবার ও সাধারণ মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী বিলে মাছ ধরতেন। দীর্ঘদিন পর অনেক জেলে জালসহ মাছ ধরার সরঞ্জাম মেরামত করে পুরোদমে বাপ-দাদার পেশায় ফিরেছিলেন। স্থানীয় বাজারে দেশি ছোট মাছের সরবরাহ বাড়ায় দামও কমেছিল।

নান্দিয়ার বিল
মাছ অবমুক্ত করার সময় উপস্থিত ছিলেন জিহাদুজ্জামান জিকু (সাদা পাঞ্জাবি পরা)। ছবি: সংগৃহীত

ফেসবুকে ‘ইজারা পাওয়ার’ ঘোষণা

গত ২৬ জুন বিলে মাছ অবমুক্ত করার একটি পোস্ট ফেসবুকে শেয়ার করেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জিহাদুজ্জামান জিকু।

পোস্টে লেখা হয়, ‘ঐতিহ্যবাহী নান্দীয়া বিলের ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের সরকারি ইজারা পাওয়ার পর আজ ২৬ জুন মাছ অবমুক্ত করা শুরু করা হইলো।’

মাছ অবমুক্ত করার সময় জিকুর পাশাপাশি ঝাউদিয়া ও পাটিকাবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

তবে জেলা প্রশাসন ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলা ভূমি অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিলটির ইজারা কার্যক্রম এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সরকারি রাজস্ব আদায়ে খাস কালেকশনের মাধ্যমে সেখানে মাছ চাষের সুযোগ দেওয়া যায় কি না, তা পর্যালোচনা করছে প্রশাসন।

অভিযোগ উঠেছে, কোনো ইজারা ছাড়াই ইউএনও হারুন অর রশিদের সঙ্গে মৌখিক যোগাযোগের ভিত্তিতে স্থানীয় বিএনপি নেতারা বিলে মাছ অবমুক্ত করছেন।

ইউএনও বলছেন ‘ইজারা হয়েছে’, ডিসি বললেন ‘হয়নি’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও হারুন অর রশিদ প্রথমে বলেন, বিলটি ইজারা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘গত দুই-তিন বছর বিলটি ফাঁকা পড়ে ছিল। এবার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ধরেবেঁধে মৎস্যজীবী সমিতির দুই-তিনটি গ্রুপকে হাজির করি। সেখান থেকে বিড করে একটি গ্রুপ ইজারা পেয়েছে।’

তবে জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, ‘বিলটি এখনো ইজারা দেওয়া হয়নি। মাছ অবমুক্ত করার বিষয়ে আমি রেভিনিউ সাহেবকে [অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)] তদন্ত করতে বলছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি এখনও টেন্ডারে যায়নি। আগের টেন্ডার ফল করেছিল। এখন সরকারি রাজস্ব আদায়ের জন্য কোনো খাস প্রক্রিয়ায় যাওয়া যায় কি না, সেটি তিনি দেখছেন।’

জেলা প্রশাসকের ভাষ্য, নান্দিয়ার বিল থেকে প্রতিবছর ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা রাজস্ব আসত। তবে গত দুই বছর ধরে তা বন্ধ রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি বলেছি, কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকা রাজস্ব আনতেই হবে।’

সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, ‘দেশের সব উন্মুক্ত জলাশয় প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।’

এ অবস্থায় নান্দিয়ার বিল ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে এত তাড়াহুড়া কেন—জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এ ধরনের কোনো লিখিত নির্দেশনা আমরা পাইনি। এমন নির্দেশনা থাকলে অবশ্যই সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ইজারা চূড়ান্ত নয়, ভাগাভাগি শেষ

জেলা প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, বিলটির ইজারা কার্যক্রম এখনো সম্পন্ন হয়নি। তবে এরইমধ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যে বিলের অংশীদারত্ব ভাগাভাগি হয়ে গেছে।

২৮৯ একর আয়তনের নান্দিয়ার বিল ঘিরে রয়েছে সাত থেকে আটটি গ্রাম। এর মধ্যে রয়েছে নান্দিয়া, হাড়ুলিয়া, চাঁনপুর, মাছপাড়া, ঝাউদিয়া, গোয়ালবাড়ি ও সিঁদুরঘাট। বিলটি আবার ইজারাদারদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার খবরে এসব এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

মাছপাড়া গ্রামের মুনিব মণ্ডল বলেন, ‘আমি মাছ ধরতে পারি না। তবে অনেকেই কাজকাম করে এসে সন্ধ্যায় দুইটা মাছ ধরে বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে খেতে পারত। সেসব আবার বন্ধ হয়ে যাবে। আমি বাজার থেকে মাছ কিনি, সেখানেও এক সপ্তাহ ধরে মাছের দাম খুব বেশি। ইজারা নেওয়ার কথা বলেই সবাইকে বিলে নামা বন্ধ করে দিয়েছে।’

নান্দিয়ার বিল
ছবি: স্টার

এরইমধ্যে ছাড়া হয়েছে ৩০০–৪০০ মণ মাছ

ইজারা চূড়ান্ত না হলেও জিহাদুজ্জামান জিকুর নেতৃত্বে বিলে ইতোমধ্যে ৩০০ থেকে ৪০০ মণ মাছ অবমুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জিকুর ব্যবস্থাপক ও ব্যবসায়িক অংশীদারের নির্দেশে চুয়াডাঙ্গা থেকে মাছ এনে বিলে ছাড়ছেন নান্দিয়ার দিদার আলী।

তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে ৩০০ থেকে ৪০০ মণ মাছ ছাড়া হয়েছে।’

দিদার আলী বলেন, ‘আমি ১৫ বছর ধরে এই বিলে মাছ দিই। আবার মৌসুম শেষে মাছ কিনে অন্যান্য জেলায় বিক্রি করি। নান্দিয়ার বিলের মাছের ভালো দাম পাওয়া যায়।’

‘আশপাশের বিলেও মাছ কমবে’

নান্দিয়ার বিল ইজারা দেওয়া হলে আশপাশের ছোট বিল ও জলাশয়েও দেশি মাছের সরবরাহ কমে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

বামন গ্রামের শাহজালাল বলেন, ‘নান্দিয়ার বিলে সারাবছর পানি থাকে। সেখানেই দেশি মাছ ডিম ফোটায়। কিন্তু ইজারাদাররা বাঁশ-কাঠ দিয়ে এমনভাবে পথ আটকে দেয় যে আশপাশের ছোট খাল-বিলে মাছ যেতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘চাঁপাইগাছি বিলও একসময় মাছের ঘাঁটি ছিল। নান্দিয়ার বিল ইজারা দেওয়ার পর চাঁপাইগাছিতে আর মাছ যেতে পারে না।’

শাহজালালের ভাষ্য, গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ দিনভর কাজ শেষে সন্ধ্যায় জাল কাঁধে নিয়ে বিলে মাছ ধরতে যেতেন। কেউ কেউ ছোট পলো, থর্কুসসহ দেশি মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে রাতভর বিলে ঘুরতেন। বিলটি আবার ইজারাদারদের নিয়ন্ত্রণে গেলে গ্রামীণ জীবনের এসব পরিচিত দৃশ্য আর দেখা যাবে না।

বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে অসংগতি

ইজারা পাওয়ার আগেই বিলে মাছ ছাড়ছেন কেন—জানতে চাইলে বিএনপি নেতা, চালকল মালিক ও কুষ্টিয়া চেম্বারের সদস্য জিহাদুজ্জামান জিকু বলেন, ‘আমি স্থানীয় সন্তান হিসেবে মাছ ছাড়ার সময় সেখানে গিয়েছিলাম। মৎস্যজীবী সমিতি হিসেবে ইজারা নিয়েছেন ঝাউদিয়া ও পাটিকাবাড়ি বিএনপির নেতারা।’

তবে ঝাউদিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ডা. সাদ আহমেদ ভিন্ন তথ্য দেন।

তিনি বলেন, ‘বিল ইজারা নিয়েছেন গোল্ডেন অটোরাইস মিলের জিহাদুজ্জামান জিকু। আমাদের এবং পাটিকাবাড়ি বিএনপিকে ২৫ শতাংশ করে মোট ৫০ শতাংশ ভাগ দিয়েছেন।’

বিলের কতভাগ অংশীদারত্ব পেয়েছেন—জানতে চাইলে পাটিকাবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সেলিম রেজা বলেন, ‘এটি দুই-তিন কোটি টাকার খেলা। শেয়ার নিলেই তো হবে না, টাকার ভাগও দিতে হবে। ২৫ শতাংশ শেয়ার নিতে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা লাগবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিলটি মূলত জিকুই পরিচালনা করবেন। আমাদের নেতাকর্মীরাও কিছু ভাগ পাবেন।’