অতি সদয় হতে গিয়ে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ক্ষতি করছেন কি?
‘মানুষের মন জুগিয়ে চলা’—এই অভ্যাসের সঙ্গে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ভালোভাবেই পরিচিত। অনেক সময় আমরা না বলতে চাইলেও পরিস্থিতির কারণে হ্যাঁ বলতে বাধ্য হই। এমন সময়ে নিজের চাহিদা ও প্রয়োজনকে প্রাধান্য না দিয়ে অন্যের চাহিদা পূরণে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সাধারণত আমরা এটিকে মানসিক বিষয় হিসেবে দেখলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিন্তু শরীরের ওপরও যে এর বিরূপ প্রভাব রয়েছে তা নিয়ে মাথা ঘামাই না।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে সবাইকে খুশি রাখার চেষ্টা করেন, তাদের মধ্যে ক্রমাগত মানসিক চাপ তৈরি হয়। এই চাপ দেহে প্রদাহ বৃদ্ধি করে এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তোলে, যার ফলে নানা ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
হার্ভার্ড হেলথের তথ্য অনুযায়ী, মানসিক চাপ দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফলে শরীর কিছুটা ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া শুরু করে, যা প্রাথমিকভাবে ছোটখাটো প্রদাহের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
অন্যভাবে বলতে গেলে, রোগপ্রতিরোধের জন্য শরীর সতর্ক হয়ে যায়, রোগপ্রতিরোধক কোষগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অধিক সক্রিয় হয়ে পড়ে এবং প্রদাহ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়—এমন পরিস্থিতিতে অটোইমিউন ডিজিজগুলো শরীরে বাসা বাঁধতে পারে।
সুইডেনের একটি জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, যারা মানসিক চাপ সম্পর্কিত রোগে ভুগছিলেন, তাদের মধ্যে কয়েক বছরের মধ্যেই অটোইমিউন ডিজিজের সংক্রমণ দেখা গেছে।। প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে বছরে প্রায় শতকরা ৯ দশমিক ১ জনের ক্ষেত্রে এ ধরনের রোগ দেখা গেছে, যেখানে মানসিক চাপমুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল শতকরা ৬ জন।
তবে এর মানে এই নয় যে মানসিক চাপ সরাসরি অটোইমিউন ডিজিজের কারণ। বরং তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে নিজেরই সুস্থ কোষ ও টিস্যুর ওপর আক্রমণ করে বসে।
যখন কেউ অন্যদের খুশি রাখতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছাগুলো চাপা পড়ে যায় এবং মনের গভীরে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে। এটি শুধু কোনো এক রাতের মন খারাপ বা নির্ঘুমতার গল্প নয়। বরং অপ্রয়োজনীয় বিবাদ এড়াতে গিয়ে দিনের পর দিন জমে ওঠা অসংখ্য ছোট ছোট ‘না বলা’ সিদ্ধান্ত এবং আর সেই সঙ্গে হতাশাগুলো যেন ডালপালা ছড়িয়ে বড় হতে থাকে আর তৈরি করে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ। আলাদাভাবে এগুলো হয়তো তেমন প্রভাব ফেলে না, কিন্তু একসঙ্গে মিলে আমাদের ভেতরে সারাক্ষণ মানসিক চাপের অবস্থাটা ধরে রাখে।
পরিশেষে বলা যায়, অতিরিক্ত মানিয়ে চলা, নিজের চাওয়া–পাওয়াকে উপেক্ষা করা এবং সবসময় টানাপোড়েনের মধ্যে থাকা বাইরে থেকে হয়তো মহানুভবতা বা সহমর্মিতার পরিচয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু শরীরের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এসব অভ্যাস দেহে প্রদাহকে উসকে দিতে পারে, শরীরকে সারাক্ষণ সতর্ক অবস্থায় রাখে এবং শারীরিক চাপের সংকেত পাঠাতে থাকে। এটি শুধু মানসিক ক্লান্তির বিষয় নয়; বরং নীরবে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতা ও অটোইমিউন সমস্যার ঝুঁকিকেও ইঙ্গিত করে।
সবসময় নিজের দিকটা উপেক্ষা করে অন্যকে খুশি রাখার এই অভ্যাস থেকে সরে আসা কেবল মানসিক প্রশান্তি এনে দেয় না, বরং দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও শক্ত ও স্থিতিশীল করে তুলতেও সহায়ক হতে পারে।
অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী


