গ্রামীণ শৈশবের এই স্মৃতিগুলো কি মনে পড়ে

অনিন্দিতা চৌধুরী
অনিন্দিতা চৌধুরী

আজকের এই ভীষণ শহুরে জীবনে বসে গ্রামকে দূরদেশ বলে মনে হওয়ার মানুষদের মধ্যে নিঃসন্দেহে আমিও পড়ি। তবে একেবারে দূরে ঠেলে দিতে পারি না ওসব সবুজ আর সবুজের মাঝে বুনতে থাকা আমার একসময়ের জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব করা অবুঝ মনখানাকে। কেননা জীবনের একেবারে গোড়াপত্তনটা আমার হয়েছিল গ্রামেই।

ঠিক বংশানুক্রমে পাওয়া কোনো বাড়িতে থাকার সুযোগ হয়নি, বরং ওখানে মায়ের চাকরির সুবাদে একখানা তিনতলা কোয়ার্টারে থেকে ভিনদেশি সাজটা কখনো একেবারে ছাড়িয়ে নেওয়াও হয়নি। তবু সেই প্রিয় গ্রামটি প্রথম শৈশব থেকে কৈশোরের যাত্রায় যেটুকু আমাকে আপন করেছিল, সেটুকুর কৃতজ্ঞতা আজও স্মৃতিতেই দিয়ে যাই।

কিশোরীর প্রথম সাজ, ‘লেইস ফিতা’

একটি কাঁচের বাক্স। তাতে দুই-তিন স্তরে ভাগ করা রাজ্যের যত মন ভালো করা, খুশির জিনিসপত্তর। উপর থেকে যতটুকুন দেখা যায়, ওখানা সিনেমার ট্রেইলারের মতো। বহনকারীকে ডেকে থামিয়ে যখন একটু আসর করে বসা হয়, তখন দেখা যায়, এর ভেতরে কত গোপন রাস্তা লুকিয়ে আছে। এমন কারিগরি শুধু বাক্সেরই, দেখে চোখ কপালে ওঠে। বাকি জিনিসপাতি তো সাত রাজ্যের মণিমুক্তোর চেয়ে এক রত্তি কম কিছু নয়!

কাঁচের চুড়ি, রঙ-বেরঙের চুল বাঁধার ফিতা, আলতার শিশি, কুমকুম, টিপ, ঠোঁট রাঙানোর জবরদস্ত সব বাহার। উঠতি বয়সের মেয়েগুলো যখন দুপুর কিংবা বিকালে ‘লেইস ফিতা লেইস’ ডাকটা শুনতে পেত, তখন যেন বাঁচিয়ে টাচিয়ে রাখা সব পয়সার ঝনঝন আওয়াজেই কেনা হয়ে যেত এক ঝুড়ি আনন্দ। এই দৃশ্যটা আমরা যারা নব্বই দশকে বেড়ে ওঠার সময়ে গ্রামে ছিলাম, তাদের জন্য একটু বেশিই পরিচিত ছিল।

প্রথম কৌটোতে করে কেনা আইশ্যাডো, প্রথম লালের বাইরে অন্য নেইলপলিশ দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা, এমন বহু প্রথম সাজগোজের চেষ্টা আর অপচেষ্টার উৎস ছিল এই লেইস ফিতার বাক্স। হয়তো অনেকেরই হয়। আমাকে সবচেয়ে টানতো, পাথরের টিপ। না ওগুলো কখনোই ঠিক দামি বা অদামি কোনো পাথর দিয়ে তৈরি হতো না। কিন্তু লোকমুখে এটাই ওর নাম। সাদা কিংবা অন্য রঙের নকশাকাটা, লম্বাটে ধাঁচের সেইসব পাথুরে টিপ দেখে আমি অবাক হয়ে যেতাম। মনে হতো, এর থেকে সুন্দর নকশা বুঝি কোথাও জন্ম নেয়নি। নিজেকে অত মানাবে কি না বুঝতাম না, তবে কাব্য-কবিতার সংযোগ ঘটার পরে মনে হতো, বনলতা সেনকে এই লেইস ফিতার জাদুকরি বাক্সের একখানা টিপ পরিয়ে দিলে বেশ হতো।

নীল ফ্রেমের হাওয়াই মিঠাই

তবে জাদুর বাক্স এই একখানাই ছিল না। সাজুগুজুর পর্যায়ে আসার আগে জিভের অ্যাডভেঞ্চারটা বেশি মনে ধরতো। সেজন্য ছিল এক নীল কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা, আরেক কাঁচের বাক্সে গোল গোল গোলাপি রঙা হাওয়াই মিঠাই। মায়ের সরকারি চাকরির সুবাদে মফস্বলে বেশ অট্টালিকাসম এক সরকারি কোয়ার্টারে থাকতাম আমরা। একেবারেই ছোট ছিলাম যখন, তখন এই হাওয়াই মিঠাই-ওলাকেই মনে হতো সেসব সোনালি বিকেলের জাদুকর। তার টুংটাং ঘণ্টির আওয়াজ শুনলে ছাদ থেকে হুমড়ি খেয়ে নিচে নামার সেই দৌড়টা এখনো মনে আছে। ওই দৌড়ের মধ্যেই আবার কয়েকটা সিকি পয়সা হাতে নিয়ে নিতে হবে। এখনকার ডেডলাইনগুলো যখন মিস হয়ে যাওয়ার প্রান্তে থাকে, তখন শৈশবের সেই ভোঁদৌড় মনে পড়ে যায়। কোনোদিন দৌড়ে জিততাম। পেয়ে যেতাম মিঠাই বিলোনো জাদুকরকে। তৃপ্তির স্বাদে ছোট ছোট হাঁয়ের মাঝে পুরে দিতাম। এখন ওগুলো আর চোখে পড়ে না। বেশিরভাগই দেখি বিশাল বিশাল প্যাকেটে বিক্রি হচ্ছে। জিভের স্বাদ হাওয়াই মিঠাইকে ছেড়ে দিয়েছে, তা বেশ অনেক বছর। তবে ওই বাক্স আর বাক্সওয়ালা যদি কখনো ঠিক একই সুরে ঘণ্টি বাজিয়ে ডাকে—সাড়া না দিয়ে থাকা যাবে বলে মনে হয় না!

ছাইপাঁশ হজমি গুঁড়ো

এ যে কী বস্তু, তা কেউ কখনো জিভে ঠেকিয়ে না দেখলে বয়ান করা মুশকিল। বড় হওয়ার পর বহু শব্দবাজির বদৌলতে বুঝতে পারলাম, এই হজমি গুঁড়োই ছিল সেই সময়ের গিলটি প্লেজার। বেমালুম বুঝতে পারছি, কাজখানা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু দিব্যি করে যাচ্ছি, কারণ ভালো লাগছে। তা এই বিষয়টি এতটা অনুচিত ছিল, কেননা অভিভাবক মহলে ওটাকে মোটামুটি নিষিদ্ধ রাখা হয়েছিল। আমাদেরকে পই পই করে বলে দেয়া হতো, এ গুঁড়ো কাঠকয়লার। কিন্তু শিশুমনের বিশ্বাসকে নাড়ানো অত্যন্ত মুশকিল বিষয়। স্বাদের সঙ্গে তারা কোনোভাবেই বেঈমানি করে না। তাই আমরাও লুকিয়ে-চুরিয়ে এক টাকায় এক ছড়ি কালো হজমি কিনে, তাতে আচ্ছা করে লবণ-মরিচ মেখে বিলিয়ে দিতাম দরিয়া দিলে। সেই হজমির এক চিমটি স্বাদের কথা ভেবে জিভে একখানা চকাস করে শব্দ আসলে বুঝে নিতে হবে—ও মধু আপনিও চেখেছেন। মধু বলে একটু আতিশয্য করলাম ঠিকই, তবে স্বাদখানা মিষ্টির ধারেকাছেও ছিল না। না পুরোপুরি টক, না মিষ্টি, না শুধু ঝাল—এমন বহুমুখী স্বাদের মতো থ্রিল ওই নিষিদ্ধ দ্রব্যটি ছাড়া মেলা মুশকিল, একথা হলফ করে বলা যায়। কিন্তু স্বাস্থ্যঝুঁকি কী আছে, তা স্মৃতি বাতলে দেয়নি। শৈশবের সেই বিশ্বাস টিকিয়ে রাখাটাই বরং জরুরি।

ঝুরঝুরে শনপাপড়ি, ঝলমলে স্মৃতি

সাদা পাউডারের মতো শনপাপড়ি, কাগজে মুড়ে দিত দোকানদার। এমন মোলায়েম, যে মুখে দিলেই গলে যেতো। এক টাকায় তিন থেকে চারটি পাওয়া যেত। আট আনার ভালোই মূল্য ছিল, তাই ষোলআনা রসনাবিলাসে ভুল হতো না। এরপর বহু বছরে খাস্তা তিলের খাজা গোছের শনপাপড়ি দেখেছি, আঠা আঠা ভাব। স্বভাব ও স্বাদে আঠালো বিষয়বস্তু পছন্দ নয় বলে মনে মনে পছন্দের শনপাপড়ি আর ঝুরঝুরে স্বাদ হয়ে রয়ে গেছে সেই আটআনি স্মৃতিটাই।

মন এখনো নিজেকে সুইট সিক্সটিন দাবি করলেও সেই অম্লমধুর শৈশবের জায়গাটায় আর ফেরা হয়নি। শুধু অবসরে মনে পড়ে যায় হাওয়াই মিঠাই ঘণ্টি আর লেইসফিতার ডাক, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফেলে আসা শৈশব!