সোডিয়াম বাতির আলোর সেই ঢাকা শহর

নাদিয়া রহমান
নাদিয়া রহমান

এক সময় ঢাকা শহরের সন্ধ্যা আর রাত মানেই ছিল সোডিয়াম বাতির আলো। সেই আলো চোখ ধাঁধানো সাদা ছিল না, ছিল হালকা হলুদ, নরম, একটু ধোঁয়াটে। অল্প আলো আর অল্প আঁধারের মিশেলে কিছুটা রহস্যও তৈরি করতো বটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধানমন্ডির রাস্তা কিংবা ফুটপাথ সবখানেই এই আলো জ্বেলে উঠত সন্ধ্যা হলে। দিনের কোলাহল শেষে সোডিয়াম লাইটের নিচে শহরটা অন্য আরেক রূপে হাঁটতে শিখত।

ধানমন্ডির কথা মনে পড়লে আজও নিজের ছোটবেলার এই হলদে আলোর সময়গুলোর কথা মনে পড়ে যায়। এক-দুই তলা বাড়ি, সামনে গাছ, বারান্দার গ্রিল ছুঁয়ে পড়া এই হলুদ আলো। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিকশা, ধীরে হেঁটে যাওয়া মানুষ, কোথাও দূরে ভেসে আসা টিভির শব্দ—সোডিয়াম লাইটের আলোয় সবকিছুই একটু ধীর, একটু নরম লাগত। আলোটা যেন মানুষকে তাড়া করত না, বরং থামতে দিত। দোকানের ঝাঁপ নামত, চায়ের কাপে গল্প জমত, আর আলোটা সেই মুহূর্তগুলোকে নীরবে ধরে রাখত। এই আলোয় শহরের দাগ, বয়স, ইতিহাস, সবকিছু স্পষ্ট হতো। রাত মানেই বিশ্রাম, শহরেরও, মানুষেরও।

আজকের ঢাকায় সেই আলো আর নেই। তার জায়গা নিয়েছে অতিরিক্ত উজ্জ্বল, সাদা এলএডি লাইট। আলো বেড়েছে, কিন্তু আরাম কমেছে। রাত আর বিশ্রামের সময় নয়, বরং দিনেরই এক দীর্ঘ সংস্করণ। এই আলো চোখে লাগে, মাথায় লাগে। কোথাও থামার সুযোগ নেই, কোথাও ছায়া নেই। সবকিছু সমানভাবে আলোয় ভাসছে, ফলে কিছুই আর আলাদা করে চোখে পড়ে না।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শহরে আজও সোডিয়াম লাইট ব্যবহার করা হয়। নিউইয়র্ক, শিকাগো কিংবা লস অ্যাঞ্জেলসের পুরোনো পাড়াগুলোতে এখনো সেই হলুদ আলো টিকে আছে। সেখানে নগর পরিকল্পনায় বোঝা গেছে, আলো শুধু দেখার জন্য নয়, অনুভবের জন্যও। কম উজ্জ্বল আলো মানুষের ঘুম, মন এবং শহরের রাতের স্বাভাবিক ছন্দ রক্ষা করে। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা আলোকে কেবল উন্নয়নের প্রতীক বানিয়েছি। যত বেশি উজ্জ্বল, তত আধুনিক, এই ধারণায় শহরের নান্দনিকতা বলি দেওয়া হয়েছে। কেউ ভাবেনি, আলোও একটা ভাষা। সোডিয়াম লাইট ছিল ঢাকার রাতের ভাষা—ধীর এবং সহনশীল। আমরা সেই ভাষা মুছে দিয়ে এমন আলো বসিয়েছি, যার কোনো সৌন্দর্য নেই, কোনো স্মৃতি নেই।

আর সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি হলো এলএডি আলোকে আমরা শক্তি সাশ্রয়ী মনে করি। বাস্তবে আলো এত বেশি উজ্জ্বল আর অতিরিক্তভাবে ব্যবহার করা হয় যে শক্তি সাশ্রয়ের ধারণাটাই নষ্ট হয়ে যায়। যেখানে আগে একটি সোডিয়াম লাইট যথেষ্ট ছিল, সেখানে এখন একাধিক এলএডি লাইট বসানো হয়। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আলো, ভুল উচ্চতায় বসানো লাইট এবং সারারাত জ্বলে থাকা ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ অপচয় কমছে তো না-ই, বরং বাড়ছে। এলএডি আলো আরও একটি বড় ক্ষতি করছে—আলো দূষণ। এই আলো আকাশে ছড়িয়ে পড়ে, তারাগুলো ঢেকে দেয়, চাঁদের উপস্থিতি ফিকে করে তোলে। পাখি, পোকামাকড়, এমনকি গাছের স্বাভাবিক জীবনচক্রও এতে ব্যাহত হয়। শহর যেন আর রাতে অন্ধকার হতে জানে না, আর অন্ধকার না থাকলে বিশ্রামও থাকে না।

ঢাকা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আলোকিত, কিন্তু অনেক কম অনুভূতিময়। হয়তো ভবনগুলো বদলানো যেত, রাস্তাও চওড়া করা যেত, কিন্তু রাতের আলোটা রেখে দেওয়া যেত। কারণ সেই আলো শুধু রাস্তা দেখাত না, শহরকে এক ভিন্ন আবহ দিত। এখন শহরে চাঁদ উঠলে সেই চাঁদের দিকে খেয়াল যায় না। এতও চোখ ধাঁধানো আলোয় চাঁদ বড় ফিকে এখন। কিন্তু সোডিয়াম বাতির সেই আলো কখনো চাঁদকে মুছে দেয়নি, বরং শহরকে তার সঙ্গে শান্তভাবে বাঁচতে শিখিয়েছিল। অনেক রাত গিয়েছে, ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে ফিরেছি নিরাপদ এই হলদে বাতির শহর দিয়ে।