সেন্টেড ক্যান্ডেলের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো জানেন? কাদের ঝুঁকি বেশি?

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে, ঘরকে সুবাসিত রাখতে, বিশেষ উপলক্ষ কিংবা বিশেষ দিনকে আকর্ষণীয় করে তুলতে সেন্টেড ক্যান্ডেল বা সুগন্ধি মোমবাতি একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। সেন্টেড ক্যান্ডেল ভালো লাগার বিষয় অবশ্যই।

কিন্তু এটি কি স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি করে? এই বিষয়ে কথা বলেছেন সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন) ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ।

সেন্টেড ক্যান্ডেল কি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী?

ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ বলেন, ঘরের ভেতরের বাতাস দূষিত হওয়ার একটি বড় কারণ মোমবাতি। তবে এর প্রভাব আমরা বুঝতে পারি না। সচেতনভাবে ব্যবহার করলে সাধারণত সব মোমবাতিই নিরাপদ। তবে কিছু সুগন্ধযুক্ত মোমবাতি তুলনামূলক বেশি ক্ষতিকর। সেন্টেড মোমবাতি আমাদের একটা আরামদায়ক অনুভূতি দেয় কিন্তু মোমবাতি থেকে নির্গত ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করে। মোমবাতিতে মোম বা প্যারাফিন ব্যবহার করলে ক্ষতিকর উপাদান কম তৈরি হয়। কিন্তু এর সঙ্গে সালফার থাকলে তার দহনে সালফার ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়।

উৎসব বা কোনো ঘরোয়া আয়োজনে বাড়িতে সুগন্ধি মোমবাতি অনেকেই ব্যবহার করে থাকেন। মোমের আলোর পাশাপাশি হালকা সুগন্ধে ঘর ভরে থাকে। এই মোমবাতিগুলো দেখতে সুন্দর, এর প্রশান্তিদায়ক সুগন্ধ মনকে সতেজ করে, উৎসবের আমেজকে করে আরও মনোরম। ইদানীং সুগন্ধি দেওয়া নানা রঙের, আকারের মোমবাতি দিয়ে ঘর সাজানোর একটা ফ্যাশন দেখা যাচ্ছে। অনেকে বাথরুমে বেসিনের বা বাথটবের পাশে নানা ধরনের সুগন্ধযুক্ত মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখেন। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে শাওয়ার নেওয়ার সময় ক্লান্তি নাকি নিমেষে উধাও হয় তাতে! মানসিক স্বাস্থ্য, বিশেষ করে মানসিক প্রশান্তি, স্ট্রেস, উদ্বেগ, অবসাদের নানা সমস্যা দূরে রাখতে সাহায্য করে এটি। তবে সরাসরি বৈজ্ঞানিক কোনো উপকার অবশ্য এতে নেই।

ঝুঁকি বা ক্ষতিকর প্রভাব? কাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে?

  • মোমবাতিগুলো সস্তা প্যারাফিন মোম, কৃত্রিম সুগন্ধি ও রঙ দিয়ে তৈরি এবং যখন সেগুলো পোড়ানো হয়, তখন তা থেকে কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, বেনজোপাইরিন এবং অন্যান্য উদ্বায়ী যৌগ নির্গত হয়। মোমবাতির দহনে যে অতিসূক্ষ্ম কণা তৈরি হয়, তা বায়ুদূষণ করে, আর নিশ্বাসের মাধ্যমে তা আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে।

  • সাধারণ মোমবাতি থেকে নির্গত হয় কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও সালফার ডাই-অক্সাইড। সেন্টেড ক্যান্ডেল থেকে অতিরিক্ত অ্যালডিহাইড, বিশেষ করে ফর্মালডিহাইড নির্গত হয়, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া কোনো কোনো সুগন্ধি মোমবাতির দহনে বেনজিন ও পলিসাইক্লিক অ্যারোম্যাটিক হাইড্রোকার্বনের মতো উদ্বায়ী জৈব যৌগ তৈরি হয়, যা শরীরে ক্যানসারের কারণ হতে পারে।

  • তাই বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণে তৈরি কৃত্রিম সুগন্ধি এড়িয়ে চলা উচিত। এমনকি প্রাকৃতিক তেল থেকে তৈরি সুগন্ধিও পোড়ানো উচিত নয়। কারণ, অনেক সময় এসবেও ফর্মালডিহাইড থাকে। বাতাসে অতিক্ষুদ্র কণার ঘনত্ব পিএম ২ দশমিক ৫-এর বেশি হলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মোমবাতি দহনে বাতাসে অতিক্ষুদ্র কণার ঘনত্ব পিএম ২ দশমিক ৫ থেকে অনেক বেড়ে যায়।

  • আমরা যখন বন্ধ ঘরে মোমবাতি জ্বালাই, তা থেকে নির্গত ধোঁয়া আমাদের ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে এবং শ্বাসকষ্টের সমস্যা তৈরি করে। বিশেষত হাঁপানিতে আক্রান্ত শিশু ও বয়স্করা এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এছাড়া সিওপিডি নামক শ্বাসকষ্টের সমস্যায় যারা ভুগেন তাদের শ্বাসকষ্টের সমস্যাও এর মাধ্যমে বৃদ্ধি পেতে পারে।

  • দহনে তৈরি গ্যাস ত্বক, কণ্ঠনালি ও চোখের ক্ষতি করতে পারে। ফলে অ্যালার্জি, মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে।

  • যারা হৃদরোগী বা অন্তঃসত্ত্বা নারী তাদের জন্যও এই ধোঁয়া ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ব্যবহারে সতর্কতা

১. প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে মোমবাতিতে সুগন্ধি যুক্ত করা হলে এর দহনে কোনো প্রকার ক্ষতিকর গ্যাস তৈরি হয় না। সুগন্ধি হিসেবে রাসায়নিক যুক্ত করা নেই এমন মোমবাতি দেখে কিনতে হবে।

২. বন্ধ ঘরে মোমবাতি জ্বালাবেন না। মোমবাতি জ্বালানোর আগে ঘরের দরজা বা জানালা খোলা আছে কি না দেখে নিন।

৩. মোমবাতির কাছাকাছি অবস্থান করা বা শ্বাস নেওয়া যাবে না।

৪. দীর্ঘ সময় মোমবাতি জ্বালানো যাবে না বা বেডরুমে মোমবাতি না জ্বালানোই ভালো।

৫. মোমবাতি জ্বলা অবস্থায় কালো ধোঁয়া তৈরি হলে সেই মোমবাতি ব্যবহার করা যাবে না।