হজমে সহায়তা-মুখগহ্বরের সুস্থতাসহ তেজপাতার আরও যত উপকারিতা
তেজপাতাকে রান্নাঘরের ‘অদৃশ্য তারকা’ বলা যেতে পারে। ভাবছেন, এমন বিশেষণ কেন ব্যবহার করলাম? তেজপাতা আমাদের রান্নাঘরের পরিচিত একটি সুগন্ধি মসলা। রান্নার সময় এই মসলা ব্যবহার করা হলেও পরিবেশনের আগে তা ফেলে দেওয়া হয়। ব্যাপারটা অনেকটা এমন—কাজের সময় তাকে দরকার, কিন্তু কাজ শেষ হলেই যেন তার মূল্য ফুরিয়ে যায়।
পোলাও, বিরিয়ানি, খিচুড়ি, মাংস, ডাল, তরকারিসহ বিভিন্ন খাবারে স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়াতে তেজপাতার ব্যবহার হয়ে আসছে বহু বছর ধরে।
তেজপাতা মূলত লরাস নোবিলিস গাছের শুকনো পাতা। রান্নায় তেজপাতা সাধারণত খাওয়ার জন্য নয়, বরং খাবারে সুগন্ধ ও স্বাদ যোগ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। তবে এতে থাকা বিভিন্ন উপাদানের রয়েছে নানা স্বাস্থ্য উপকারিতা। এ বিষয়ে আমাদের বিস্তারিত জানিয়েছেন এমএইচ শমরিতা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের পুষ্টিবিদ আঞ্জুমান আরা শিমুল।
তেজপাতার পুষ্টিগুণ
তেজপাতা খুব অল্প পরিমাণে ব্যবহৃত হয়, তাই এটি দৈনিক পুষ্টির বড় কোনো উৎস নয়। তবে এতে রয়েছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
১০০ গ্রাম তেজপাতায় রয়েছে:
ক্যালরি: ৩১৩ কিলোক্যালরি
কার্বোহাইড্রেট: ৭৪.৯ গ্রাম
প্রোটিন: ৭.৬ গ্রাম
ফাইবার: ২৬.৩ গ্রাম
ফ্যাট: ৮.৩ গ্রাম
তেজপাতার স্বাস্থ্য উপকারিতা
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য
তেজপাতায় পলিফেনল ও ফ্ল্যাভোনয়েড নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে। অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের সুদূরপ্রসারী কিছু নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে আমাদের শরীরের ওপর, যেমন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং প্রদাহজনিত বিভিন্ন সমস্যা। নিয়মিত তেজপাতা গ্রহণ করলে তা শরীরের স্বাভাবিক ডিটক্সিফিকেশন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে।
রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, তেজপাতা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে এবং লিপিড প্রোফাইলে কিছু ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শুধু তেজপাতা খেয়েই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যায়—এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
হজমে সহায়তা
তেজপাতা হজমে সহায়তা করতে পারে এবং খাবার গ্রহণের পর তা থেকে পুষ্টি শোষণেও ভূমিকা রাখতে পারে। তেজপাতা পেটব্যথা, পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া ও পেটের অস্বস্তি কমাতে এবং ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম প্রতিকারেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
প্রদাহ কমাতে সহায়ক
তেজপাতায় ইউজেনল ও পার্থেনোলাইডের মতো কিছু প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে, যা শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করতে পারে। এছাড়াও, হাড়ের জোড়ায় ব্যথার ক্ষেত্রেও এটি উপশম দিতে পারে। তবে এটি প্রদাহজনিত রোগের চিকিৎসার বিকল্প নয়।
হৃদযন্ত্রের সুস্থতা
তেজপাতা রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে এবং ব্যাড কোলেস্টেরলের (এলডিএল) মাত্রা কমানোর মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তেজপাতায় উপস্থিত কিছু উপাদান রক্তনালীগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও, তেজপাতায় থাকা পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে এসব প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।
শ্বসনতন্ত্রের সুস্থতা
তেজপাতার সুগন্ধি তেল সর্দি, কাশি ও নাক বন্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা উপশম দিতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
জীবাণুর বৃদ্ধি কমাতে
তেজপাতার এসেনশিয়াল অয়েলের কিছু উপাদান পরীক্ষাগারে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বিরুদ্ধে কার্যকারিতা দেখিয়েছে।
মুখগহ্বরের সুস্থতা
মুখের দুর্গন্ধ, দাঁতের ক্ষয় এবং মাড়ির সমস্যার জন্য দায়ী কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে তেজপাতা কাজ করে থাকে এবং মুখগহ্বরের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
কতটুকু খাওয়া নিরাপদ?
রান্নায় ব্যবহৃত ১–২টি তেজপাতা সাধারণত নিরাপদ। তবে শুকনো তেজপাতা পুরোপুরি চিবিয়ে খাওয়া কঠিন এবং এটি গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই রান্নার পর তেজপাতা সরিয়ে ফেলা ভালো।
তেজপাতা খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা
• যাদের তেজপাতায় অ্যালার্জি আছে।
• অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অতিরিক্ত মাত্রায় তেজপাতার নির্যাস বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।
• ডায়াবেটিসের ওষুধ গ্রহণকারীদের তেজপাতার সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
• রক্ত পাতলা করার ওষুধ গ্রহণকারীদের অতিরিক্ত ভেষজজাতীয় উপাদান ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত।



