ঝাল খাবারে আলসার হয় না, প্রমাণ করতে ব্যাকটেরিয়া গিলেছিলেন চিকিৎসক

মো. সাঈম আল রেজা
মো. সাঈম আল রেজা

একসময় মানুষের বদ্ধমূল ধারণা ছিল—অতিরিক্ত ঝাল খাবার, মানসিক চাপ আর পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিডই আলসারের মূল কারণ। কিন্তু আলসারের আসল কারণ যে কোনো খাবার নয়, বরং একটি ব্যাকটেরিয়া তা প্রমাণ করতে এক চিকিৎসক নিজেই গিলে খেয়েছিলেন ব্যাকটেরিয়াযুক্ত তরল।

আলসার নিয়ে এই গবেষণা করেন অস্ট্রেলীয় দুই চিকিৎসক ড. ব্যারি মার্শাল ও ড. রবিন ওয়ারেন। আলসারের প্রকৃত কারণ আবিষ্কারের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৫ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান তারা।

যুগ যুগ ধরে মানুষের ধারণা ছিল, আলসারের মূল কারণ মানসিক চাপ ও ঝাল খাবার। তাই তারা রোগীদের অ্যাসিডিটির ওষুধ সেবন ও খাদ্যাভ্যাস বদলানোর পরামর্শ দিতেন। এতে সাময়িক উপশম মিললেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কষ্টদায়ক রোগটি বারবার ফিরে আসত।

তবে ১৯৭৯ সালে ডা. রবিন ওয়ারেন প্রথম পাকস্থলীর প্রদাহে আক্রান্ত রোগীদের নমুনায় একধরনের সর্পিল আকারের ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পান। তৎকালীন বিশেষজ্ঞদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, পাকস্থলীর তীব্র অম্লীয় পরিবেশে কোনো ব্যাকটেরিয়ার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

ওয়ারেনের এই পর্যবেক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেন ড. ব্যারি মার্শাল। এই ব্যাকটেরিয়াই কি আলসার ঘটাচ্ছে কি না, সেটা অনুসন্ধানে নেমে পড়েন দুই বিজ্ঞানী।

তাদের এই ধারণাকে একবাক্যে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না কেউই। অনেকেই এতে সন্দেহ পোষণ করলে ড. মার্শাল এক নজিরবিহীন উদ্যোগ নেন। এমন একটি কাজ করেন তিনি, যা আধুনিক যুগের প্রতিষ্ঠিত নৈতিক মানদণ্ডে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি নিজেই নিজেকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার গিনিপিগে রূপান্তর করেন—পান করেন ‘হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি’ নামে পরবর্তীকালে পরিচিতি পাওয়া সেই ব্যাকটেরিয়াযুক্ত তরল।

কয়েক দিনের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন মার্শাল। বমি, তিক্ত ভাব ও মুখে দুর্গন্ধের মতো আলসারের সব পরিচিত উপসর্গ দেখা দেয় তার মধ্যে। পরীক্ষায় দেখা যায়, তার পাকস্থলীতে প্রদাহ হয়েছে এবং সেখানে ওই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে। পরে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

সে আমলে ড. মার্শালের নিজেকে নিয়ে করা এই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা তাৎক্ষণিকভাবে আলসারের মূল কারণ নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটায়নি। তবে পরবর্তীতে গবেষণার মাধ্যমে বিষয়টির প্রমাণে তার এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

এই আবিষ্কার আলসারের চিকিৎসায় আমূল পরিবর্তন আনে। শুধু পাকস্থলীর অ্যাসিড কমানো এবং উপসর্গ আবার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকেন না চিকিৎসকরা। রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দ্রুত এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ করে তোলার প্রচেষ্টা নেন তারা।

অনেক রোগীর ক্ষেত্রে যে অসুখকে একসময় দীর্ঘস্থায়ী ও বারবার ফিরে আসা সমস্যা হিসেবে দেখা হতো, তা এখন সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।

এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু আলসারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘ সময় এই ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমিত থাকলে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

যদিও এই ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত অনেক মানুষ কখনোই আলসার বা ক্যানসারে আক্রান্ত হন না।

একটি বড় আকারের গবেষণার ফল থেকে দেখা গেছে, এখনো প্রায় প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে চারজনই এই ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত। ওই গবেষণায় আরও জানা গেছে, ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের ৫৮ দশমিক দুই শতাংশ থেকে এই হার কমে ২০১১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৪৩ দশমিক এক শতাংশে নেমেছে।

দীর্ঘদিন ধরে আলসারের চিকিৎসার কেন্দ্রে ছিল অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ। তবে দুই বিজ্ঞানীর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারে বিষয়টি অনেকটাই বদলে যায়। চিকিৎসকরা এখন রোগীর উপসর্গ নিয়ন্ত্রণের বদলে রোগ নিরাময়ে মনোযোগ দিচ্ছেন।

 

লেখক পঞ্চম বর্ষের মেডিকেল শিক্ষার্থী। 

ই-মেইল: mdsarn12012098@gmail.com