রক্ত পরীক্ষায় জানা যাবে কোন অঙ্গ কতটা বুড়িয়ে গেছে!

স্টার অনলাইন ডেস্ক

জন্মদিন বলে দেয় একজন মানুষের বয়স কত। কিন্তু শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যে একই গতিতে বুড়িয়ে যায়, তা নয়। একই বয়সের মানুষের হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক, ফুসফুস বা কিডনির জৈবিক বয়স একেক রকম হতে পারে।

নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এমন একটি পদ্ধতির সম্ভাবনা দেখিয়েছেন, যার মাধ্যমে একদিন রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করেই শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের জৈবিক বয়স সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

তবে এটি এখনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকে করা যায় এমন কোনো রক্ত পরীক্ষা নয়। গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ন্যাচার মেডিসিন সাময়িকীতে।

Microscopic view of a stained human cerebellum tissue sample showing its folded tissue architecture.

কীভাবে বোঝা যাবে

সায়েন্স এলার্ট ওই গবেষেণা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষকরা ৯৮৩ জন মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে সংগ্রহ করা ৪০ ধরনের টিস্যুর ২৫ হাজার ৭১২টি মাইক্রোস্কোপিক ছবি বিশ্লেষণ করেন। এসব টিস্যু শরীরের ২৯টি অঙ্গ থেকে নেওয়া হয়েছিল।

এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে এসব টিস্যুর ছবি বিশ্লেষণ করা হয়। বিভিন্ন বয়সের মানুষের টিস্যু দেখে এআইকে শেখানো হয়, বয়স বাড়ার সঙ্গে অঙ্গের কোষ ও টিস্যুতে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে।

ধীরে ধীরে এআই এমন কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন শনাক্ত করতে শেখে, যেগুলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষকেরা এই পদ্ধতিকে এক ধরনের ‘টিস্যু ঘড়ি’ হিসেবে দেখছেন।

ধরা যাক, একজন মানুষের বয়স ৬০ বছর। কিন্তু তার ফুসফুসের টিস্যু যদি ৬৫ বা ৭০ বছর বয়সী মানুষের টিস্যুর মতো দেখতে হয়, তাহলে সেই ফুসফুসকে প্রত্যাশার তুলনায় বেশি বয়সী হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের হিসাব করা বয়সের সঙ্গে মানুষের প্রকৃত বয়সের পার্থক্য গড়ে প্রায় পাঁচ বছর ছিল।

সব অঙ্গ একইভাবে বুড়িয়ে যায় না

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, শরীরের সব অঙ্গ একই গতিতে বুড়িয়ে যায় না।

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অনেকগুলো অঙ্গে বয়স বাড়ার লক্ষণ দেখা গেছে। আবার কারও ক্ষেত্রে শরীরের অন্য অঙ্গগুলোর তুলনায় শুধু একটি অঙ্গ, যেমন হৃদযন্ত্র, ফুসফুস বা পাকস্থলী বেশি বয়স্ক মনে হয়েছে।

টিস্যুতে বয়স বাড়ার বিভিন্ন লক্ষণের মধ্যে ছিল টিস্যু সংকুচিত হওয়া, শক্ত ও দাগের মতো হয়ে যাওয়া, ক্ষুদ্র রক্তনালীর সংখ্যা কমে যাওয়া, পেশিতে অতিরিক্ত চর্বি জমা এবং স্নায়ু পাতলা হয়ে যাওয়া।

Organs age at different speeds: A blood test might soon tell which ones

রক্ত থেকে অঙ্গের বয়স বোঝার চেষ্টা

অঙ্গের জৈবিক বয়স সরাসরি জানতে সাধারণত শরীর থেকে টিস্যু সংগ্রহ করতে হয়। এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আক্রমণাত্মক বা কষ্টকর পদ্ধতি।

তাই গবেষকেরা আরও সহজ একটি উপায় খুঁজেছেন।

তারা টিস্যুর বয়সের সঙ্গে একই ব্যক্তির রক্তে থাকা জিনের কার্যকলাপের পরিবর্তনের সম্পর্ক খুঁজে দেখেন। অর্থাৎ, কোনো অঙ্গ প্রত্যাশার তুলনায় বেশি বয়স্ক দেখালে রক্তে তার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় কি না, সেটিই তারা পরীক্ষা করেন।

এর ভিত্তিতে তারা আরেকটি এআই মডেল তৈরি করেন, যা শুধু রক্তের তথ্য ব্যবহার করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কতটা বয়স্ক দেখাচ্ছে, তা অনুমান করতে পারে।

এই পদ্ধতি পুরো শরীরের বয়স, পরিপাকতন্ত্র এবং যকৃতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো ফল দেখিয়েছে।

রোগের সঙ্গেও মিল পাওয়া গেছে

গবেষকেরা দেখতে চেয়েছিলেন, রক্তের মাধ্যমে অনুমান করা অঙ্গের বয়সের সঙ্গে বিভিন্ন রোগের কোনো সম্পর্ক আছে কি না। এ জন্য আট ধরনের রোগে আক্রান্ত মানুষের রক্তের তথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়।

ফলাফলে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া যায়।

যেসব মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বয়সের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

আবার পরিপাকতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে খাদ্যনালীর শেষ অংশ, পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্রে বেশি বয়সের লক্ষণ দেখা যায়।

অ্যালঝাইমার রোগীদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কই ছিল একমাত্র অঙ্গ, যার বয়সের ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, অঙ্গের বয়স বেড়ে যাওয়াই এসব রোগের কারণ। রোগের কারণে অঙ্গটি বেশি বয়স্ক হতে পারে। আবার অঙ্গের দ্রুত বয়স বাড়া ও রোগ, দুটিই একই সময়ে ঘটতে পারে।

Tracking organ aging and disease | National Institutes of Health (NIH)

এখনই পরীক্ষা করানো যাবে না

গবেষণাটি আশাব্যঞ্জক হলেও এর বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

গবেষণায় ব্যবহৃত বেশিরভাগ টিস্যু মৃত ব্যক্তিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। একই মানুষকে জীবিত অবস্থায় বহু বছর ধরে অনুসরণ করে অঙ্গের বয়স কীভাবে বদলেছে, তা দেখা হয়নি।

এ ছাড়া রক্তের মাধ্যমে অঙ্গের বয়স অনুমান করার পদ্ধতিটি মূলত এমন মানুষের তথ্য দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে, যাদের ইতোমধ্যে কোনো রোগ শনাক্ত হয়েছিল।

তাই এই পদ্ধতি রোগের কোনো লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই তা শনাক্ত করতে পারবে কি না, এখনো জানা যায়নি।

গবেষকদের মতে, মানুষের ওপর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একই ধরনের ফল এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পরই এটি চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। বাস্তবে হাসপাতালে ব্যবহারের পর্যায়ে যেতে আরও কয়েক বছর, এমনকি প্রায় এক দশকও সময় লাগতে পারে।

শরীরের বয়স কেবল একটি সংখ্যা নয়

এই গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে, মানুষের জৈবিক বয়সকে কেবল একটি সংখ্যা দিয়ে বোঝা হয়তো যথেষ্ট নয়।

একই শরীরের ভেতরে থাকা হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক, ফুসফুস বা অন্য অঙ্গগুলো একই গতিতে বয়সের ছাপ বহন করে না। কারও একটি অঙ্গ হয়তো বয়সের তুলনায় অনেক তরুণ, আবার অন্য কোনো অঙ্গ হয়তো প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে।

ভবিষ্যতে রক্তের একটি নমুনা থেকেই যদি এসব পার্থক্য নির্ভরযোগ্যভাবে জানা সম্ভব হয়, তাহলে রোগের ঝুঁকি বোঝা এবং ব্যক্তিভেদে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।