প্রথম দেখায় প্রেম কেন হয়? বিজ্ঞান যা বলছে
বহু রোমান্টিক সিনেমায় প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ার গল্প দেখা যায়। কিন্তু এটা কি কেবল সিনেমার কল্পনা, নাকি বাস্তবেও ঘটে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাস্তবেও প্রথম দেখায় প্রেম হতে পারে! এমনকি প্রথম দেখার তীব্র আকর্ষণ কখনো কখনো দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কেও পরিণত হতে পারে।
তবে মজার ব্যাপার হলো, দ্রুত প্রেমে পড়ে আমাদের মন নয়, মস্তিষ্ক। স্নায়ুবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও আচরণবিষয়ক নানা গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন, কীভাবে কাউকে দেখার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার প্রতি ভালো লাগা তৈরি হতে পারে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, রোমান্টিক প্রেম নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাও হচ্ছে। প্রথম দেখায় প্রেম খুব দ্রুত ঘটে বলে এটি নিয়ে গবেষণা করা কিছুটা কঠিন। তারপরও মানুষের প্রেমের শুরুর পর্যায় নিয়ে গবেষণা থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা পেয়েছেন, ওই সময় মানুষের মস্তিষ্ক ও শরীরে কী ঘটে।
প্রেমে পড়লে কী ঘটে
দশকের পর দশক ধরে করা গবেষণা বলছে, প্রেমের শুরুতে যে তীব্র আকর্ষণ তৈরি হয়, তার সঙ্গে শরীরের কিছু বিশেষ রাসায়নিক পরিবর্তন জড়িত। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো অ্যাড্রেনালিন ও ডোপামিন।
যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানভিত্তিক মনোবিজ্ঞানী স্যান্ড্রা ল্যাংসলাগ বলেন, প্রথম দেখায় প্রেম সম্ভবত খুবই আবেগী একটি ঘটনা। ফলে শরীরে সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠে। শরীরের এই অংশটি আমাদের বিপদ বা উত্তেজনার সময়ের করণীয় নিয়ে সংকেত দিয়ে থাকে।
তখন কী হয়?
তিনি বলেন, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। শরীর একটু ঘামতে শুরু করে। শ্বাস দ্রুত হয়। কখনো মুখ লাল হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ শরীরে যেন হঠাৎ খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।
মস্তিষ্কের ভেতরে থাকা ছোট্ট একটি অংশ হলো হাইপোথ্যালামাস। আমরা যখন কারও প্রতি আকৃষ্ট হই, তখন এটি শরীরে অ্যাড্রেনালিন ছড়িয়ে দিতে সংকেত দেয়। আর এই অ্যাড্রেনালিনই আমাদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়।
ডোপামিন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
নৃতত্ত্ববিদ হেলেন ফিশারের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় দেখা গেছে, আমরা যখন পছন্দের কাউকে দেখি তখন মস্তিষ্কের আনন্দের সঙ্গে যুক্ত অংশগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এখানে কাজ করে ডোপামিন, যাকে অনেক সময় ‘ভালো লাগার রাসায়নিক’ বলা হয়।
ডোপামিন আমাদের আনন্দের অনুভূতি বুঝতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এটি কোনো ঘটনা দীর্ঘদিন মনে রাখতেও ভূমিকা রাখে। তাই প্রথম দেখার সেই মুহূর্তটি অনেক সময় আমাদের মনে খুব গভীরভাবে গেঁথে যায়।
আমরা কাউকে এত দ্রুত পছন্দ করি কীভাবে
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম দেখায় প্রেমের পেছনে একটি মানসিক ক্ষমতা কাজ করে। সেটি হলো, আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অন্য মানুষ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারি।
নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক মনোবিজ্ঞানী ওয়েন্ডি গার্ডনারের মতে, মাত্র সাত সেকেন্ডেরও কম সময়ে আমরা অন্য একজন মানুষ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারি। এই ধারণা অনেক তার সঙ্গে মিলেও যায়।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, সাত সেকেন্ডেই আমরা একজন মানুষের পুরো বৈশিষ্ট্য বুঝে ফেলতে পারি। এগুলো বুঝতে ও জানতে অনেক বেশি সময় লাগে। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক খুব দ্রুত কিছু বাহ্যিক সংকেত বিশ্লেষণ করে একটি প্রাথমিক ধারণা তৈরি করতে পারে।
কেউ কীভাবে তাকাচ্ছে, হাসছে, হাঁটছে, কী পোশাক পরেছে, তার মুখের গঠন কেমন, এসব বিষয় আমরা অনেক সময় সচেতনভাবে খেয়াল না করলেও মস্তিষ্ক সেগুলো লক্ষ্য করে।
বিশেষ করে চোখে চোখ রাখা, হাসি এবং শরীরের অঙ্গভঙ্গি আমাদের কাছে একজন মানুষকে আকর্ষণীয় বা পছন্দের করে তুলতে পারে।
গার্ডনারের ভাষায়, মানুষ আসলে বাইরের বৈশিষ্ট্য দেখে খুব সহজেই প্রভাবিত হয়। আমরা যতই বলি, ‘আমি মানুষের চেহারা দেখি না’, বাস্তবে আমাদের মস্তিষ্ক অন্য মানুষের চেহারা ও আচরণ থেকে নানা সংকেত গ্রহণ করে।
কেবল চেহারাই কি প্রেমের কারণ
না। প্রথম দেখায় আকর্ষণ তৈরি হওয়ার পেছনে কেবল সৌন্দর্যই কাজ করে না। কখনো কখনো সম্পূর্ণ অপরিচিত দুজন মানুষের ধারণা মিলে যায়। বিশেষ করে যখন তারা মনে করেন, ‘আমরা হয়তো একইভাবে বিষয়টি দেখছি!’
মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় আই-শেয়ারিং।
ধরুন, আপনি একটি কফিশপে বসে আছেন। হঠাৎ মজার কিছু ঘটল। হয়তো কারও পোশাক দেখে আপনার হাসি পেল, কিংবা কোনো গান শুনে আপনার ভালো লাগল। আপনি মুচকি হেসে তাকালেন। ঠিক তখনই দেখলেন, কফিশপের অন্য প্রান্তে বসা একজন অপরিচিত মানুষও একই বিষয় দেখে হাসছেন। আপনাদের চোখে চোখ পড়ল।
এই ছোট্ট মুহূর্তটিই দুজন মানুষের মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত সংযোগ তৈরি করতে পারে। মনে হতে পারে, ‘এই মানুষটিও বিষয়টি আমার মতোই দেখছে।’
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এমন মুহূর্ত সাময়িকভাবে একাকীত্বের অনুভূতি কমিয়ে দেয়। আমরা মনে করি, অন্য একজন মানুষ আমাদের বুঝতে পারছেন। ফলে তার প্রতি ভালো লাগা ও বিশ্বাস তৈরি হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এমন অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে মানুষের প্রেমের সম্পর্কে সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।
অর্থাৎ প্রেমের শুরু কখনো বড় কোনো ঘটনা দিয়ে নাও হতে পারে। একটি ছোট্ট হাসি, একই সময়ে একই বিষয়ে আনন্দ পাওয়া কিংবা হঠাৎ চোখে চোখ পড়ে যাওয়া—এমন সামান্য ঘটনাও মানুষের মনে ছাপ ফেলতে পারে।
প্রথম দেখার প্রেম কি দীর্ঘস্থায়ী হয়
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আছে। প্রথম দেখায় কারও প্রতি তীব্র আকর্ষণ তৈরি হওয়া যতই সুন্দর অনুভূতি হোক, তা দিয়ে বোঝা যায় না সম্পর্কটি ভবিষ্যতে সফল হবে কি না।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী পল ইস্টউইক বলেন, প্রথম দেখার আকর্ষণের সঙ্গে ভবিষ্যতের সম্পর্ক কতটা ভালো হবে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই।
অর্থাৎ প্রথম দেখায় কাউকে খুব ভালো লেগেছে, এটা থেকে ভবিষ্যতের ভালো সম্পর্কের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। আবার এটাও বলা যায় না যে, সম্পর্কটি খারাপ হবে।
গবেষকরা বলছেন, কেবল দ্রুত আকর্ষণের ওপর নির্ভর না করে সময় দেওয়া ভালো। অল্প কথাবার্তার বদলে একটু গভীর ও অর্থপূর্ণ আলোচনা করলে অপরিচিত মানুষকে জানার সুযোগ তৈরি হয়। অনেক সময় পরে দেখা যায়, প্রথম দেখায় যে ধারণা হয়েছিল, পরে তা বদলে গেছে।
তাই একটু সময় নিন
প্রথম দেখায় প্রেম সুন্দর হতে পারে। সেই মুহূর্তে বুক ধড়ফড় করতে পারে, মুখে হাসি ফুটতে পারে। কিন্তু ওই সময়ে মানুষটি সম্পর্কে তেমন জানাশোনা থাকে না।
বরং সময়ের সঙ্গে তার চিন্তাভাবনা, স্বভাব, মূল্যবোধ, আচরণ এবং অন্য মানুষের সঙ্গে ব্যবহার সম্পর্কে জানা যায়। তখন প্রথম দেখার আকর্ষণ আরও গভীর ভালোবাসায় পরিণত হতে পারে। আবার কখনো সেই আকর্ষণ হারিয়েও যেতে পারে।
তাই প্রথম দেখায় কাউকে ভালো লাগতেই পারে। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানীরা।
কারণ হিসেবে তারা বলছেন, প্রেমের প্রথম মুহূর্তটি হয়তো কয়েক সেকেন্ডেই আসে, কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা গড়ে উঠতে সময় লাগে।



