‘ন্যানোশিপ’ কি জানেন? সিচুয়েশনশিপের সঙ্গে পার্থক্য কী?

অনিন্দিতা চৌধুরী
অনিন্দিতা চৌধুরী

আধুনিক সম্পর্কের অভিধানে প্রায়ই এমন সব শব্দ জটলা বেঁধে বসে যে, সে জট ছাড়ানো সম্পর্কের জট ছাড়ানোর চাইতে খুব একটা সহজ কিছু হয় না। ‘ন্যানোশিপ’ও এমনই একটি শব্দ।

রিলেশনশিপ শব্দটি যখন মিলেনিয়ালদের জগতে ছড়ি ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছিল, তখন সেখানে সিচুয়েশনশিপ বা বিভিন্ন অন্য শিপের আলাপ উঠে আসে। এর মধ্যে ন্যানোশিপ অপেক্ষাকৃত নতুন। তবে শব্দ নতুন হলেও ধারণাটা কি ততটাই নতুন? চলুন, জেনে নেওয়া যাক।

ন্যানোশিপ আসলে কী

বলিউডের ‘তামাশা’ সিনেমাটির কথা মনে আছে কি? এক্সপেরিমেন্টাল ঘরানার এই রম-কমটিতে পরবর্তীতে সেই একই বলিউডি ধাঁচের মতো নায়ক-নায়িকার মিল ঘটলেও শুরুতে কিন্তু প্রধান দুই চরিত্র দারুণভাবে নিজেদেরকে না বলেকয়েও কর্সিকার সেই দুর্দান্ত পটভূমিতে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন ন্যানোশিপের জাহাজে। ঘুরে বেড়িয়েছিলেন অত্যন্ত চেনাজানা মানুষের মতো, কিন্তু তাতে ছিল না কোনো কথা দেওয়া-নেওয়ার কথা কিংবা সম্পর্কে বদ্ধ হওয়ার কোনো জল্পনা-কল্পনা।

প্রথাগত প্রেম বা রোমান্টিক সম্পর্কের মতো ন্যানোশিপে কোনো প্রতিশ্রুতির অবকাশ থাকে না। ভবিষ্যত নিয়ে নিজেদের মধ্যে তেমন কোনো পরিকল্পনাও গড়ে ওঠে না। তাড়াহুড়ার এই জীবনে যেন ইনস্ট্যান্ট কফির মতোই ন্যানোশিপ এনে দেয় ক্ষণিকের চমক, ক্ষণিকের ভালোলাগা আর তাতে বয়ে চলে দুটি মানুষ। প্রথাগত ধারণায় এটিকে যতটাই ‘যাচ্ছেতাই’ মনে হোক না কেন, একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এতে মানুষের তাৎক্ষণিক ভালোলাগা আর আগ্রহকেই কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়।

ব্যক্তির চাহিদা, তার পছন্দ শুধু জামাকাপড়ের ব্র্যান্ড বা গানের প্লেলিস্টেই বন্দি থাকে না। তা বিবর্তিত হয় মানুষের ক্ষেত্রেও। তাই সেই বিবর্তনকে খুব স্পষ্টভাবে যারা স্বীকার করেন, তাদের জন্য ন্যানোশিপ বেশ ভালো একটি কৌশল, প্রেমকে দেখার ও জানার। হতে পারে কোনো বন্ধুর বাড়িতে নিমন্ত্রণে কিংবা সকালবেলা পার্কে ঘুরতে গিয়ে কাউকে ভালো লেগে গেল। তাদের সঙ্গে দু-চারটি কথা হলো, তবে সে কথার ঘরানা অনেকটাই রোমান্টিক। একে অন্যের সঙ্গে বেশ প্রেম প্রেম ভাব করলেন। ভালো সময়ও কাটালেন। কিন্তু এরপর যে যার জীবনে এমনভাবে ফিরে গেলেন, যেন সেই ব্যক্তিটির সঙ্গে আপনার এমন ধরনের মিথষ্ক্রিয়া কখনো ঘটেইনি। কিংবা মনে হয়তো থেকে গেল, কিন্তু তা নিয়ে আর এগোনোর চিন্তা এলো না কারো মধ্যেই।

বর্তমানে ডেটিং অ্যাপগুলোতে কিছু পছন্দের ওপর ভিত্তি করে দুটো প্রোফাইলকে ‘ম্যাচ’ করা হয়। সেখান থেকে নিজের সুযোগ আর সময়মতো অনেকেই দেখা করেন বা সামাজিক মাধ্যমে কিছুদিন কথা চালিয়ে যান। এরপর যখন, যে মুহূর্তে মনে হয়, ‘তার সঙ্গে ঠিক আর এগোনোর কিছু নেই’, তখনই বিরতি টানা। সে বিরতি নিয়ে কারুর মধ্যে কোনো খেদ থাকারও তেমন সুযোগ নেই। কেননা এই বিষয়টিতে দুদিক থেকেই অভ্যস্ততা এসে গেছে। এমন সহজভাবেই ন্যানোশিপের মাত্রাজ্ঞান পরিমাপ করা যায়।

তবে এত ‘সহজ’ বিষয়টি কি আদতেও অতটা সহজ? কারণ মানবমনের অলিগলিতে তো আজও নক্ষত্ররাজির চাইতে বেশি রহস্য মাখা থাকে। তা সে যত আধুনিক পরিসরেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকুক না কেন। কোনো কোনো মন এখনো প্রাচীন শিলালিপির মতো লিখে যেতে চায় তার সবকটা প্রেমের ইতিহাস।

কেননা সবসময় এই দুটো মানুষের রোমান্টিক চিন্তা-চেতনা বা প্রেম নিয়ে আদর্শিক জায়গা এক নাও হতে পারে। এমনটা হওয়া খুবই স্বাভাবিক যে ন্যানোশিপ শুধু এক পক্ষের জন্য সুবিধাজনক প্রমাণিত হচ্ছে এবং অপরপক্ষকে দিয়ে যাচ্ছে সমূহ মানসিক উদ্বেগ। সেক্ষেত্রে শুরু থেকে স্পষ্টতা না থাকলে যে কারো মনের পক্ষেই বিপদ ঘটাটা অসম্ভব কিছু নয়। কারো জন্য ক্ষণিকের আলাপ, অন্যজনের জন্য যদি বেশ দীর্ঘস্থায়ী কোনো ক্ষত সৃষ্টি করে তারপর তেমন কোনো আয়োজন ছাড়াই বিদায় জানানোর মতো হয়—তবে গল্পটা ভীষণই একপাক্ষিক হয়ে রয়ে যায়।

সিচুয়েশনশিপ আর ন্যানোশিপ কি এক?

না, আধুনিক প্রেমের অভিধানের এই দুটো শব্দ ও বিষয় অনেকটা কাছাকাছি হলেও এতে কিছু পার্থক্য রয়েছে। সিচুয়েশনশিপে শরীরী ও আবেগীয়ভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি থাকা আবশ্যক। অন্যদিকে ন্যানোশিপে এর কোনোটিরই আবশ্যিকতা থাকে না। এর স্থায়িত্ব সিচুয়েশনশিপের চাইতে অনেক বেশি কম এবং সংকল্পের দিক দিয়ে আরও হালকা।

তবে দুটোতেই যে বিষয়টি এক, তা হচ্ছে একে অপরকে নিয়ে নিশ্চিত না থাকা এবং ভবিষ্যতের কোনো প্রতিশ্রুতির দিকে না যাওয়া। সিচুয়েশনশিপ থেকে স্থায়ী সম্পর্কে যাওয়ার সম্ভাবনা ন্যানোশিপ থেকে কিছুটা হলেও বেশি থাকে। তবে নিশ্চয়তা কোনোটিতেই নেই। আর সেইসঙ্গে নেই নিশ্চয়তার আশা বা ভরসাও।

তাই নিজের মধ্যে যদি প্রচণ্ড আঁকড়ে ধরার স্বভাব না থাকে, তবেই এমন সম্পর্কে জড়ানো ভালো। নইলে খুব কম সময়ের উপভোগ্যতার বিনিময়ে আবার পেতে হবে মানসিক ভোগান্তির ঝামেলাও, যা থেকে সেরে ওঠা যেকারো জন্যই চ্যালেঞ্জের।