ওয়াশিংটন-তেহরান শান্তি আলোচনাকে পুনরুজ্জীবিত করতে চায় ইসলামাবাদ
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত থামাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় পাকিস্তান।
মূলত ইসলামাবাদের উদ্যোগে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি শান্তি সমঝোতা স্মারক সই হয়। তবে বিভিন্ন ঘটনায় সেই স্মারক অকার্যকর হয়ে পড়ে।
অচল হয়ে পড়া শান্তি প্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে পাকিস্তান। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি।
আজ বুধবার এই তথ্য জানিয়েছে পাকিস্তানের গণমাধ্যম ডন।
মঙ্গলবার দিনের শুরুতে তেহরানে পৌঁছানোর পর নাকভিকে স্বাগত জানান ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইস্কান্দার মোমেনি।
পরে তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেন।
এই সফরে দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা বিস্তারিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করবেন বলেও সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।
তেহরান থেকে একটি কূটনৈতিক সূত্র ডনকে জানায়, নাকভির সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়া।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় ওমান নেতৃত্ব নেওয়ায় পাকিস্তানের এই উদ্যোগ অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল।
ওমান-ইরান আলোচনায় অগ্রগতির খবর ইসলামাবাদের সামনে জুনের চুক্তি থেকে উদ্ভূত বৃহত্তর শান্তি প্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ তৈরি করেছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
সম্প্রতি ইসলামাবাদ আরাগচি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান মধ্যস্থতাকারী বাঘের গালিবাফকে যত দ্রুত সম্ভব ইসলামাবাদ সফরের আমন্ত্রণ জানায়।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার বলেন, দুই ইরানি নেতা ‘উপযুক্ত সময়ে’ ইসলামাবাদ সফর করবেন।
তবে ইরানি নেতাদের পাকিস্তান সফরের অপেক্ষায় থাকছে না ইসলামাবাদ। নাকভির এই সফরের মাধ্যমে তারা মধ্যস্থতার উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে চাইছে।
জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক ভেস্তে যাওয়ার পর পারস্য উপসাগর, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ না চললেও ওই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে নাকভি দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ককে ‘শক্তিশালী, দীর্ঘস্থায়ী ও অবিচ্ছেদ্য’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের সার্বিক উন্নয়নে ইসলামাবাদের ‘দৃঢ় সংকল্প ও ইচ্ছার’ কথাও জানান।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানও উল্লেখ করেন, ইরান-পাকিস্তান সম্পর্ক দুই দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তায় অবদান রাখবে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর এই গুরুত্ব দেওয়ার ঘটনা এমন সময়ে ঘটল, যখন পাকিস্তান কয়েক দিন আগে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে।
ইসলামাবাদ বারবার জোর দিয়ে বলেছে, এই চুক্তির ধরন প্রতিরক্ষামূলক এবং এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়।
সোমবার পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার তার ইরানি সমপক্ষ আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কথা বলেন এবং চুক্তিটির মূল বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার এবং আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তায় অবদান রাখার চুক্তিটির উদ্দেশ্যের ওপর জোর দেন।
হরমুজের ভবিষ্যৎ
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতবিরোধ থেকেই মূলত শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এরপর থেকে ইরান ও ওমান হরমুজ দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন একটি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে। আলোচনায় সম্ভাব্য নতুন নৌপথ এবং সেটির ব্যবস্থাপনার পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে তেহরান বরাবরই বলে এসেছে, ওমানের সঙ্গে সমঝোতা কেবল একটি কারিগরি বা প্রাথমিক পর্যায়ের বন্দোবস্ত হবে। শুধু এই উদ্যোগের মাধ্যমে জলপথটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসবে না।
এ বিষয়ে ইরান তাদের অনড় অবস্থান নিশ্চিত করেছে। তারা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে। এগুলোর প্রতিকার না হওয়া পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালি খুলবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।
সূত্র জানান, ইরান জোর দিয়ে বলেছে, এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র বৈধ কাঠামো হলো ওই সমঝোতা স্মারক, কারণ দুই দেশের প্রেসিডেন্ট এতে সই করেছেন।
তাই সুনির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয় নতুন করে ব্যাখ্যা করে পুনরায় আলোচনা না করে, যেভাবে এটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল সেভাবেই বাস্তবায়ন করতে হবে।
সূত্র আরও জানান, হরমুজ আবারও খুলে দেওয়ার উদ্যোগের আগে তেহরান এই প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রমাণও চাইছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান মৌখিক প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য নিশ্চয়তা চায়, বিশেষ করে ওয়াশিংটন সমঝোতা স্মারকের অধীনে থাকা নিজেদের দায়বদ্ধতায় ফিরতে প্রস্তুত কি না, সে বিষয়ে।
ট্রাম্পের সমালোচনা
এদিকে, মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনায় অংশ নিতে আসা ইরানের প্রতিনিধিদের ‘কূটকৌশলী’ ও ‘অসৎ’ আখ্যা দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম রিয়েল আমেরিকাস ভয়েসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা খুবই কূটকৌশলী। কারণ তারা কোনো বিষয়ে সম্মত হওয়ার পর বাইরে গিয়ে সংবাদমাধ্যমকে বলে যে তারা কখনো এ ধরনের কোনো কিছুতে সম্মত হয়নি। তারা খুবই অসৎ মানুষ।’
তিনি আরও বলেন, ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতি ভালো অবস্থায় নেই।
ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে অপেক্ষা করে ‘এভাবেই চলতে দিতে পারে’ অথবা ‘তাদের ওপর খুব, খুব কঠোরভাবে আঘাত হানতে পারে’।
তিনি বলেন, তৃতীয় বিকল্প হলো ‘অর্থনৈতিকভাবে তাদের পরাজিত করা—তবে আমরা ইতোমধ্যে সেটা করছি’।
তিনি দাবি করেন, চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে ইরানের অর্থনীতি।
‘তারা ঋণ নিতে পারে না। আমরা তাদের অর্থ নিয়ন্ত্রণ করি...তাদের কাছে অনেক অর্থ ছিল, কিন্তু এখন আমাদের হাতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ...আমিই তাদের ব্যাংকার’, যোগ করেন তিনি।