পোড়া রুটি খেলেই কি ক্যানসার হয়?

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

আমাদের প্রতিদিনের বিকেল বা সন্ধ্যার খাবারের তালিকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে আগুনে পোড়ানো পাউরুটি ও ধোঁয়া ওঠা গরম চা।

প্রশ্ন হলো, এই সুস্বাদু খাবার কি স্বাস্থ্যকর? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি নানা ধরনের স্বাস্থ্য জটিলতা তৈরি করতে পারে।

হাতে বেলা রুটি সেঁকতে গিয়ে অনেক সময় পুড়ে যায়, অথবা স্মোকি ফ্লেভার আনতে পাউরুটি আগুনে পোড়ানো হয়। এতে অ্যাক্রিলামাইড নামে একটি রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয়। আর এ নিয়েই যত উদ্বেগ।

ছবি: আসিয়া আফরিন চৌধুরী

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আরও বলছেন, রুটি ছাড়াও অন্য অনেক খাবার উচ্চ তাপমাত্রায় রান্নার সময় অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হতে পারে। আর সেসব পোড়া খাবার খেলে দেখা দিতে পারে স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যানসার হাসপাতালের প্রকল্প সমন্বয়কারী ও বাংলাদেশ স্তন ক্যানসার সচেতনতা ফোরামের প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘পোড়া রুটি খেলেই ক্যানসার হবে বিষয়টি এমন নয়।’

ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, কখনো কখনো মানুষের শরীরে অস্ত্রোপচারের পর সেলাই করা অংশ পুরোপুরি মিলিয়ে যায় না, উঁচু হয়ে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় আমরা এটাকে বলি কিলয়েড।

‘হাতে বানানো রুটি অনেক সময় পুড়ে এমন হয়। রুটির সেই অংশ একটি মাত্রায় খেলে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অল্প হলেও বাড়ে।’

তিনি আরও বলেন, আগুনে পোড়ানো পাউরুটি খাওয়ার সঙ্গে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি সম্পর্ক আছে সেটা সুনির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। এর সঙ্গে অনেক বিষয় জড়িত।

‘তবে পাউরুটি তেলে ভেজে যেসব রেসিপি তৈরি করা হয়, বিশেষত স্ট্রিট ফুডকার্টগুলোতে; সেখানে একই তেল বারবার ব্যবহার করা হয় এবং এই তেল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়,’ বলেন এই বিশেষজ্ঞ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডাক্তার লেলিন চৌধুরী ডেইলি স্টারকে বলেন, যেকোনো ধরনের প্রসেসড ফুড স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। পাউরুটিও একটি প্রসেসড ফুড। এটি পুড়িয়ে খেলে আরও বেশি ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে।

‘কোনো মানুষ যদি এটি নিয়মিত খায়, সে ক্ষেত্রে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে,’ বলেন তিনি।

দোকানে কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে তৈরি চা মোটেই স্বাস্থ্যকর না। এর ভেতরে দুধ থাকে না, বরং ক্ষতিকর চর্বি থাকে।

ডাক্তার লেলিন বলেন, ‘কনডেন্সড মিল্ক বেশি খেলে রক্তে ব্যাড কোলেস্টেরল (রক্তে থাকা চর্বিজাতীয় পদার্থ) বেড়ে যায়। ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।’

‘গরুর দুধ কিংবা প্যাকেটজাত পাস্তুরিত তরল দুধ দিয়ে তৈরি চায়ের সঙ্গে কেউ চাইলে না পুড়িয়ে পাউরুটি খেতে পারেন,’ পরামর্শ দেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্সের অধ্যাপক ড. মো. রুহুল আমিন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘পাউরুটি পোড়ালে যে ব্ল্যাক চারকোল দেখা যায়, সেখানে তৈরি হয় অ্যাক্রিলামাইড। এই রাসায়নিক যৌগ অন্যান্য প্রাণীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রামাণিত হয়েছে। তবে মানুষের শরীরে ক্যানসার তৈরির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।’

তবুও একদম পোড়া অংশ ফেলে দিয়ে রুটির হলুদ অংশ খাওয়া উচিত। তবে খেয়ে ফেললেই যে খুব ক্ষতি হবে—তাও না, কিন্তু নিয়মিত খাওয়া যাবে না।

‘আমি একবার-দুবার খেতে পারি। কিন্তু প্রতিদিন যদি খাই, এটা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হবে,’ বলেন তিনি।

আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুসারে, কিছু পরিস্থিতিতে অ্যাক্রিলামাইড ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। তবে এই গবেষণা এখনো চলছে।

অ্যাক্রিলামাইড কী?

অ্যাক্রিলামাইড একটি রাসায়নিক পদার্থ। বর্জ্যপানি শোধনসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রক্রিয়া ও পণ্য তৈরিতে এটি ব্যবহৃত হয়। রঙ, কাগজ ও নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদান তৈরি; পাশাপাশি কিছু ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রী ও কাপড় তৈরিতেও এটি ব্যবহৃত হয়।

পোড়ানো বা উচ্চ তাপমাত্রার প্রক্রিয়ায় অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হতে পারে। যেমন, তামাক পোড়ালে এটি তৈরি হয়, যে কারণে সিগারেটের ধোঁয়ায় অ্যাক্রিলামাইড পাওয়া যায়।

যারা ধূমপান করেন, তাদের ক্ষেত্রে তামাকের ধোঁয়াই অ্যাক্রিলামাইডের প্রধান উৎস। আর অধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে খাবার থেকে এটি শরীরে প্রবেশ করে। ভাজা বা পোড়ানোর মতো উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না করলে কিছু খাবারে অ্যাক্রিলামাইডের মাত্রা বেড়ে যায়।

অ্যাক্রিলামাইড কি ক্যানসার সৃষ্টি করে?

আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটি জানিয়েছে, ল্যাব টেস্টে দেখা গেছে উচ্চমাত্রায় অ্যাক্রিলামাইড দেওয়া হলে এটি প্রাণীদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। তবে এসব গবেষণার ফলাফল মানুষের ক্ষেত্রে কতটা প্রযোজ্য, তা স্পষ্ট নয়।

কারণ এসব গবেষণায় ইঁদুরকে যে পরিমাণ অ্যাক্রিলামাইড দেওয়া হয়েছিল, তা মানুষের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে গ্রহণ করা পরিমাণের তুলনায় অনেক বেশি।

তবে কয়েকটি গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, বেশি পরিমাণে অ্যাক্রিলামাইড গ্রহণের সঙ্গে মেনোপজের আগে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি সামান্য বাড়ার সম্পর্ক থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত অল্পসংখ্যক গবেষণা থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

ক্যানসারের ঝুঁকিতে পড়তে একজন ব্যক্তিকে কতটা অ্যাক্রিলামাইড গ্রহণ করতে হবে, তাও স্পষ্ট নয়।

২০০২ সালে খাবারে অ্যাক্রিলামাইডের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটি, যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউরোপীয় ফুড সেফটি অথরিটিসহ (ইএফএসএ) আরও অনেক সংস্থা মত দিয়েছে, এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন।