ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক শহরগুলোর জনপ্রিয় খাবার সম্পর্কে জানেন?
বিশ্বকাপ এলে শুধু খেলার মাঠ জেগে ওঠে না, জেগে ওঠে রাস্তাও। তাওয়া গরম হয়, ধোঁয়া ওঠে, কোনো গাড়িতে পতাকা লাগানো মানুষ হর্ন বাজাতে বাজাতে চলে যায়। স্টেডিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার হাতে টিকিট নেই, কিন্তু তার সামনে একটা গ্রিল জ্বলছে—সেটাই তার মঞ্চ!
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হচ্ছে তিনটি দেশের ১৬টি শহরে। এই শহরগুলো শুধু ম্যাচের ভেন্যু নয়—প্রতিটার নিজস্ব রাস্তা আছে, নিজস্ব গন্ধ আছে, নিজস্ব খাবার আছে। ফুটবল যদি হয় উৎসবের ভাষা, তাহলে রাস্তার খাবার হলো সরাসরি, বুকের কাছ থেকে সেই উচ্চারণ।
মেক্সিকো সিটি: যেখানে ইতিহাস তাওয়ায় পোড়ে
এস্তাদিও আস্তেকা তিনটা বিশ্বকাপ দেখেছে। ১৯৭০, ১৯৮৬ ও ২০২৬। এই মাঠেই ম্যারাডোনা একবার ‘হাত দিয়ে’ গোল করেছিলেন, আরেকবার পুরো দলকে একা কাটিয়ে। কিন্তু মেক্সিকো সিটির আসল পরিচয় মাঠের ভেতরে নয় —রাস্তার কোণে, রাত বারোটার পরে, যেখানে একটা তাকোর স্টলে মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তাকোস আল পাস্তোর এই শহরের নিজের সম্পত্তি। গল্পটা অদ্ভুত—লেবাননি অভিবাসীরা একসময় শাওয়ার্মার রেসিপি নিয়ে এসেছিলেন পুয়েবলায়, পরে সেটা ঢুকে পড়ল মেক্সিকো সিটিতে, মিশে গেল আচিওতে পেস্টে, দেশি মশলায়, ভুট্টার টর্তিয়ায়। ঘূর্ণায়মান শিক থেকে পাতলা করে কাটা মাংস, সঙ্গে আনারসের একটুকরো, ধনেপাতা, চুন—মুখে দিলে মধ্যপ্রাচ্য আর মেসোআমেরিকা এক হয়ে যায়।
রাত দুইটায় মেক্সিকো সিটির কোনো গলিতে দাঁড়িয়ে তাকো খাওয়া আলাদা অভিজ্ঞতা। ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু শহরের উত্তেজনা তখনো থামেনি। জার্সি পরা মানুষ, হাসি, তর্ক, আর ধোঁয়া ওঠা তাওয়া—উৎসব তখন শুধু মাঠ থেকে রাস্তায় সরে এসেছে।
লস অ্যাঞ্জেলেস: তাকো একটা ভাষা
লস অ্যাঞ্জেলেসে তাকো বুঝতে হলে একটা কথা মনে রাখতে হবে—এখানে তাকো শুধু খাবার নয়, একটা সাংস্কৃতিক সমঝোতা। বয়স পেরোয়, পাড়া পেরোয়, আয় পেরোয়। হলিউডের বড় প্রযোজক যেটা খান, কনস্ট্রাকশন সাইটের শ্রমিকও সেটা খান—একটু ভিন্ন গলিতে, একটু ভিন্ন দামে, কিন্তু একই তাওয়ায়।
তবে লস অ্যাঞ্জেলেস শুধু তাকোর শহর নয়। ওলভেরা স্ট্রিটে এখনো হাতে বেলা টর্তিয়ার গন্ধ পাওয়া যায়। কোরিয়াটাউনের রাত ভরে থাকে বুলগোগির ধোঁয়ায়। ইস্ট লস অ্যাঞ্জেলেসের কিছু রাস্তা এমন যে সেখানে হাঁটলে মনে হয় সীমান্ত অতিক্রম না করেই মেক্সিকোর ভেতরে চলে এসেছেন। এই শহর একটা রান্নাঘর, যার কোনো দেয়াল নেই। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ নিজেদের রেসিপি নিয়ে এসেছে, আর শহরটা সেগুলোকে জায়গা দিয়েছে।
বিশ্বকাপের সময় লস অ্যাঞ্জেলেসের রাস্তায় ৫০টি দেশের মানুষ হাঁটবে। কেউ স্প্যানিশে কথা বলবে, কেউ কোরিয়ানে, কেউ ইংরেজিতে। কিন্তু খাবারের সামনে দাঁড়ালে ভাষার প্রয়োজন খুব বেশি থাকে না।
নিউইয়র্ক সিটি: হট ডগ থেকে হালাল কার্ট
নিউইয়র্কের রাস্তায় প্রথম যেটা চোখে পড়ে সেটা হট ডগের গাড়ি। মশলাদার সসেজ, তাজা বান, সর্ষে আর কেচাপ—এই শহরের সঙ্গে হট ডগের সম্পর্ক পুরোনো, প্রায় আবেগের। কিন্তু নিউইয়র্ক এর চেয়ে অনেক বেশি কিছু।
ম্যানহাটনের যেকোনো কোণে একটা হালাল কার্ট আছে। চিকেন ওভার রাইস—হলুদ ভাত, পাতলা করে কাটা মুরগি, সাদা সস, একটু লাল ঝাল—এই রেসিপিটা নিউইয়র্কেই তৈরি হয়েছে এবং নিউইয়র্কেই সবচেয়ে ভালো লাগে। ইহুদি পাড়ার বেগেল, জ্যামাইকান পেটি, ইস্ট ভিলেজের ফালাফেল—এই শহরের রাস্তা মানে একটা সংক্ষিপ্ত পৃথিবী যেখানে সবাই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কিছু না কিছু খাচ্ছে।
বিশ্বকাপের ফাইনাল হবে নিউইয়র্কে। সেই রাতে টাইমস স্কয়ার থেকে শুরু করে সাবওয়ে স্টেশন পর্যন্ত শহরটা ফুটবলের শব্দে ভরে যাবে। মাঠের ফলাফল তখন একটা গল্প হবে, রাস্তায় মানুষের ভিড় আরেকটা।
মায়ামি: কিউবার স্বাদ, ক্যারিবিয়ানের বাতাস
মায়ামি বুঝতে হলে লিটল হাভানায় একবার যেতে হবে। এস্প্রেসোর গন্ধ, কোথাও সালসার শব্দ, দরজার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা ভাজা পর্কের সুবাস। কিউবান স্যান্ডউইচ—রোস্টেড পর্ক, হ্যাম, চিজ, আচার, সর্ষে, একটা লম্বা কিউবান রুটিতে চেপে গরম প্রেসে চাপা দেওয়া—এই একটা খাবার মায়ামির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ।
কিন্তু মায়ামির চরিত্র একমুখী নয়। এখানে ক্যারিবিয়ানের দ্বীপগুলো যেন পাশাপাশি এসে বসেছে। কোথাও জার্ক চিকেনের ধোঁয়া, কোথাও হাইতিয়ান গ্রিও, কোথাও কলম্বিয়ান আরেপা। সমুদ্রের বাতাসের মতোই শহরটার স্বাদও নানা দিক থেকে আসে।
বিশ্বকাপে দক্ষিণ আমেরিকার সমর্থকদের বড় একটা অংশ মায়ামির মধ্য দিয়েই যাবে। তাদের জন্য এই শহর শুধু ম্যাচের গন্তব্য নয়; অনেকের কাছে এটা হবে পরিচিত স্বাদের এক অস্থায়ী আশ্রয়।
টরন্টো: পৃথিবীর একটা ছোট সংস্করণ
টরন্টোকে অনেকে বলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বহুসাংস্কৃতিক শহর। এটা দাবি নয়, প্রায় বাস্তবতা। কেনসিংটন মার্কেটে একবার ঢুকলে বোঝা যায়—এই পাড়া একটু একটু করে গড়েছে ব্রিটিশ শ্রমিক, ইহুদি ব্যবসায়ী, ক্যারিবিয়ান পরিবার আর লাতিন আমেরিকান অভিবাসীরা। প্রতিটা ঢেউ কিছু রেখে গেছে কিছু রেসিপি, কিছু গন্ধ, কিছু অভ্যাস।
মার্কেটের কাছে ‘মার্কেট ৭০৭’—শিপিং কনটেইনারে বানানো ছোট ছোট খাবারের দোকান। একটায় ফিলিপিনো সিসিগ ফ্রাই, পাশেরটায় আফগান রান্না, সামনে জাপানি ওনিগিরি, একটু দূরে জামাইকান জার্ক চিকেন। এই বৈচিত্র্য কোনো মাস্টারপ্ল্যানের ফল নয়; বরং বহু দশকের মানুষের আসা-যাওয়ার ফল।
কানাডার প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ ছিল টরন্টোতে, ১২ জুন। স্টেডিয়ামে জাতীয় সংগীত বেজেছে, আর কয়েক কিলোমিটার দূরে কেনসিংটনের গলিতে মানুষ খাবারের লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মতো করে উৎসব করেছে। শহরটা দুই জায়গায় একই সঙ্গে ধুকপুক করে।
ভ্যাঙ্কুভার: পাহাড়ের পাদদেশে এশিয়ার রাত
ভ্যাঙ্কুভারের রিচমন্ড নাইট মার্কেটে একবার গেলে মনে হয় শহর বদলে গেছে। গ্রীষ্মের রাতে সেখানে বাবল চা, স্কিউয়ারে পোড়া মাংস, তাইওয়ানিজ পপকর্ন চিকেন, জাপানি তাকোয়াকি—এশিয়ার রাস্তার খাবার এখানে এসে আরেকটু বড় হয়েছে, আরেকটু নিজের মতো হয়েছে।
ভ্যাঙ্কুভারের জনসংখ্যার বড় একটা অংশ এশিয়া থেকে আসা। চীনা, কোরিয়ান, জাপানি, ভিয়েতনামি—এসব কমিউনিটি শহরের খাবারে যে ছাপ ফেলেছে সেটা রাস্তায় বের হলেই টের পাওয়া যায়। পাহাড় আছে পেছনে, সমুদ্র আছে সামনে—আর মাঝখানে একটা শহর, যেটা দীর্ঘদিন ধরে নানা মহাদেশের মানুষের জন্য প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করেছে।
বিশ্বকাপের সময় এই শহরে ফুটবলের উচ্ছ্বাস যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে রাতের বাজারের আলো। দুটো মিলেই তৈরি করবে ভ্যাঙ্কুভারের নিজস্ব উৎসব।
ডালাস ও হিউস্টন: একই রাজ্য, দুই রকম রাস্তা
ডালাস মানে টেক্স-মেক্স। ব্রেকফাস্ট তাকো, স্মোকড ব্রিস্কেট, ধীরে রান্না করা বারবিকিউ—এগুলো এখানে শুধু খাবার নয়, পরিচয়ের অংশ। টেক্সান বলতেই মানুষ এগুলোর কথা ভাবেন। ডালাসের স্টেডিয়াম পুরো বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ আয়োজন করবে। ফুটবল এখানে অতিথি হয়ে আসছে না; শহরটা অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে।
হিউস্টন একটু অন্য রকম। এই শহরের ২৮ শতাংশ মানুষ বিদেশে জন্মেছেন, ১৪৫টির বেশি ভাষায় কথা বলা হয়। ভিয়েতনামি অভিবাসীরা চার দশক ধরে মিডটাউন আর বেলায়ার করিডোরে রান্নার একটা পুরো দুনিয়া গড়েছেন। তারা স্থানীয় ক্রফিশের সঙ্গে নিজেদের রান্না মিলিয়ে তৈরি করেছেন ভিয়েত-কাজুন ক্রফিশ—এটা এখন হিউস্টনের নিজস্ব খাবার, সারা আমেরিকায় পরিচিত।
শনিবার বিকেলে হিউস্টনের কোনো ফুড ট্রাক পার্কে দাঁড়ালে ভেনেজুয়েলান আরেপার পাশে ইথিওপিয়ান ইনজেরা পাবেন, কোরিয়ান-মেক্সিকান ফিউশন ট্রাকের সামনে লাইন দেবেন পশ্চিম আফ্রিকান পরিবার। শহরটা যেন একটা চলমান মানচিত্র, যেখানে সীমান্তগুলো রাজনৈতিক, কিন্তু খাবার সেগুলোকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না।
রাস্তা যখন কথা বলে
এই শহরগুলোর মধ্যে একটাই মিল আছে—প্রতিটা শহরে মানুষ এসেছে অন্য কোথাও থেকে এবং আসার সময় রান্না সঙ্গে নিয়ে এসেছে।
মেক্সিকো সিটির তাকোয় লেবানন আর মেক্সিকো মিলে আছে। হিউস্টনের ক্রফিশে ভিয়েতনাম আর লুইজিয়ানার দক্ষিণ একসঙ্গে। টরন্টোর একটা গলিতে আফগানিস্তান আর ফিলিপাইন পাশাপাশি। ভ্যাঙ্কুভারের রাতের বাজারে হংকং আর কানাডা মিলে একটা নতুন জায়গা তৈরি হয়েছে যেটার আলাদা কোনো নাম নেই।
বিশ্বকাপে ৪৮টা দল আসবে। কিন্তু রাস্তায় আসবে পুরো পৃথিবী।
কেউ জার্সি পরে আসবে, কেউ পতাকা হাতে। কেউ ম্যাচ দেখতে, কেউ শুধু উৎসবের অংশ হতে। স্টেডিয়ামের ভেতরে নব্বই মিনিটের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু স্টেডিয়ামের বাইরে মানুষ একই লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার কিনবে, একই টেবিলে বসবে, একই শহরের রাত ভাগ করে নেবে।
ফুটবল মানুষকে একসঙ্গে আনে—এই কথাটা বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু রাস্তার খাবার সেই কথাটাকে আরও সহজ করে দেয়। কারণ একটা গোল নিয়ে তর্ক হতে পারে, একটা দলের সমর্থক আরেক দলের সমর্থকের সঙ্গে ঝগড়া করতে পারে, কিন্তু ভালো খাবারের সামনে দাঁড়ালে মানুষ সাধারণত একটু নরম হয়ে যায়।
মাঠে জেতে একটা দল। কিন্তু রাস্তায় সবাই জেতে।
