ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার ফিরছে আধুনিকতার মোড়কে

আয়মান আনিকা

টেবিলের ওপর সাজানো ছাঁচে তোলা এক প্লেট সুজির হালুয়া। দেখতে বেশ সাধারণ, কোনো আড়ম্বর নেই। এমনকি এতে নেই চুইয়ে পড়া ঘি কিংবা চারপাশে জমে নেই চিনির সিরার পরত। বরং সেখান থেকে ভেসে আসছে নারকেল তেলের হালকা সুবাস আর হালুয়াগুলোর ওপরে আলগোছে পড়ে আছে তুলসি পাতা। ফাইজা আহমেদের কাছে এই সাধারণ থালাটিরই রয়েছে বড় গল্প।

তিনি বলেন, ‘সুজির হালুয়া আমার কাছে শৈশবের প্রতিরূপ। আজকাল আমরা সাধারণত যেভাবে ঘি এবং দুধ দিয়ে এই হালুয়া বানিয়ে খাই, আগে শুধু সেভাবেই যে এটি তৈরি হতো, তা নয়। আমি আমার হালুয়া শুধু নারকেল তেল দিয়ে তৈরি করি। আর যেহেতু আমি একজন নিরামিষাশী (ভেগান), তাই এতে দুধ দিই না। আর সুজিটা খুব হালকাভাবে ভেজে নিই, যাতে এটি নরম থাকে।’

নারকেল তেল দিয়ে দুধ ছাড়া এই হালুয়া রান্নার প্রক্রিয়াকে নতুন উদ্ভাবন নয়, বরং রান্নার প্রক্রিয়ার পুনরুদ্ধার বলে মনে করেন তিনি।

Food
ফাইজা আহমেদ। ছবি: সিলভিয়া মাহজাবিন

ফাইজা আহমেদ একজন ফ্যাশন ডিজাইনার, দৃশ্যশিল্পী এবং রন্ধনশৈলী বিষয়ক চিন্তক।

গত এক দশক ধরে তিনি নীরবে প্রশ্ন তুলছেন সেইসব বিষয় নিয়ে, যেগুলো বাংলাদেশ মনে রাখতে চায়, পাশাপাশি যেগুলো বাংলাদেশ ভুলেও যেতে চায়। ২০১৫ সালে যাত্রা শুরু করে তার উদ্ভিজ্জাত রন্ধন উদ্যোগ ‘সঞ্চয়িতা’। খুব সাধারণ একটি ধারণা থেকে জন্ম নিয়েছে এই উদ্যোগ। আর সেই ধারণাটি হলো, ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো যেন কেবল নস্টালজিয়া বা স্মৃতি হিসেবে বেঁচে না থাকে।

ফাইজা বলেন, ‘সঞ্চয়িতার মূল উদ্দেশ্যই ছিল স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোকে পুনরুজ্জীবন দেওয়া।’

তার মতে, ফিউশন ইতিবাচক। কিন্তু ফিউশনের অর্থ এই নয় যে আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারকে বিদায় জানিয়ে দিতে হবে।

Food
ছবি: সিলভিয়া মাহজাবিন

ফাইজা মনে করেন, ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রতি সাধারণ মানুষের যে দৃষ্টিভঙ্গি তার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী পোশাকের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির এক ধরনের মিল আছে। শাড়িকে যেমন আধুনিক জীবনে ‘অসুবিধাজনক’ বলে বাদ দেওয়া হয়, ঠিক তেমনি নতুন নতুন ট্রেন্ডের ভিড়ে অবহেলার শিকার হয় প্রচলিত ও সাধারণ স্থানীয় খাবারগুলো।

তার মতে, এই ঐতিহ্যগুলো ত্যাগ করার ফলে একটি জনপদের মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয় দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি আমাদের নিজস্ব জিনিসগুলো বর্জন করি, তার অর্থ দাঁড়ায় আমরা একটি ধার করা জায়গায় বাস করছি।’

সঞ্চয়িতা এই সমস্যার সমাধানে কাজ করে; পরিচিত কিন্তু অবহেলিত খাবারগুলোকে সমসাময়িক ডাইনিং টেবিলে ফিরিয়ে আনে। ফাইজার অনেক রেসিপির মূলে রয়েছে পুরোনো রন্ধনশৈলী নিয়ে গবেষণা।

ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি নিয়ে গবেষণার সময় ফাইজা জানতে পারেন, প্রথাগতভাবে হালুয়া তৈরির জন্য মাখন বা ঘিয়ের বদলে সরিষার তেলের মতো উপাদান ব্যবহার করা হতো। এই তথ্যটি তাকে সম্পূর্ণ উদ্ভিদ-ভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে সেই রেসিপিগুলোকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে সাহায্য করেছে।

Food
ছবি: সিলভিয়া মাহজাবিন

ফাইজা আহমেদের রান্নাঘর পুরোপুরি নিরামিষাশী বা ভেগান। এখানে কোনো দুগ্ধজাত পণ্য, মধু বা প্রাণিজ উপাদান ব্যবহার করা হয় না।

তার পরিবর্তে নারকেল দুধ, গুড়, বাদাম এবং প্রাকৃতিক তেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় পদগুলো। শুরুতে অনেকে প্রশ্ন করেছিলেন, ঘি বা দুধ ছাড়া ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির স্বাদ বজায় রাখা সম্ভব কি না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোজনরসিকরা এই পদ্ধতিকে সানন্দে গ্রহণ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘যারা নিরামিষাশী নন তারাও এসব খাবার উপভোগ করেন। তারা কোনো কিছুর অভাবও বোধ করেন না।’

সঞ্চয়িতার অন্যতম জনপ্রিয় ডেজার্ট হলো সাবুদানা ক্ষীর, যেটি পরিশোধিত চিনির পরিবর্তে নারকেল দুধ এবং গুড় দিয়ে তৈরি।

এটি তৈরির আগে সাবুদানাগুলো স্বচ্ছ না হওয়া পর্যন্ত ভিজিয়ে রাখা হয় এবং ঘন হওয়া পর্যন্ত জ্বাল দেওয়া হয়। এই ক্ষীর একটি সুষম স্বাদের মিষ্টান্ন, যার ওপর চীনা বাদামের গুঁড়ো ছড়িয়ে পরিবেশন করা হয়।

Food
ছবি: সিলভিয়া মাহজাবিন

ফাইজা খেয়াল করে দেখেছেন, সাবুদানা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। কিন্তু বাংলাদেশি মিষ্টান্ন সাবুদানার ক্ষীরকে অনেকেই সেকেলে বলে মনে করেন। কিন্তু সঞ্চয়িতার বিদেশি ভোক্তাসহ দেশি ভোক্তারাও এর সাধারণ কিন্তু চমৎকার স্বাদের জাদুতে মুগ্ধ হন।

মিষ্টির পাশাপাশি ফাইজা নলেন গুড় মাখানো মিষ্টি খইয়ের মতো দৈনন্দিন নাশতাগুলোকেও নতুন করে টেবিলে ফিরিয়ে আনছেন। তিনি এটিকে আমদানি করা ব্রেকফাস্ট সিরিয়ালের স্বাস্থ্যকর বিকল্প বলে মনে করেন। এমনকি নিজের বাড়িতে তার ছেলের সকালের নাশতা হিসেবেও মিষ্টি খই পরিবেশন করা হয়।

ফাইজা বলেন, ‘আমরা যদি এটি বয়ামে ভরে রাখি, তবে সেটি যেকোনো সময় খাওয়ার মতো একটি খাবার হয়ে ওঠে।’

খাবার তৈরির পাশাপাশি পরিবেশন পদ্ধতিও ফাইজার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দৃশ্যশিল্পের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে তিনি খাবারগুলোকে খুব যত্নের সঙ্গে সাজিয়ে পরিবেশন করেন। যেখানে ব্যবহার করেন ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পাত্র।

এই নান্দনিক উপস্থাপনা তরুণ প্রজন্মকে এমন সব খাবারের প্রতি আগ্রহী করে তোলে, যা হয়তো তারা এড়িয়ে যেত।

Food
ছবি: সিলভিয়া মাহজাবিন

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি আমাদের সাধারণ খাবারগুলোকে সঠিকভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করি, তাহলে মানুষ বুঝতে পারে সেগুলোও কত সুন্দর।’

সঞ্চয়িতা মূলত বাঙালি রন্ধনশৈলীকে নতুন করে আবিষ্কার করার চেয়ে এর হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বেশি আগ্রহী। ফাইজা বিশ্বাস করেন, ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো কেবল পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবের দিনের জন্য নয়। বরং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগুলোর আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে থাকা উচিত।

সঞ্চয়িতার মাধ্যমে ফাইজা আহমেদ দেখিয়েছেন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য সবসময় বিশাল আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো এটি শুরু হয় খুব সাধারণ কোনো পুরোনো রেসিপি যত্ন নিয়ে রান্না করার মাধ্যমে। এরপর বাড়তি যত্ন দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন এবং নতুন করে সেটিকে খাবারের টেবিলে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে।

অনুবাদ করেছেন জ্যোতি রশীদ