ফুড রিভিউ যেভাবে বদলে দিচ্ছে রেস্টুরেন্টে খাওয়ার অভ্যাস
একসময় নতুন কোনো খাবারের জায়গার খবর মানুষ পেত পরিচিতদের কাছ থেকে। কেউ বলতেন, ‘ওই দোকানের কাচ্চিটা খুব ভালো’, কেউ আবার পরিবার নিয়ে গিয়ে ভালো অভিজ্ঞতার গল্প করতেন। তখন কোনো রেস্টুরেন্ট জনপ্রিয় হতো ধীরে ধীরে, মানুষের মুখে মুখে।
এখন সেই জায়গার বড় অংশ দখল করে নিয়েছে অনলাইন রিভিউ, ফুড ভ্লগ আর ছোট ছোট ভিডিও। কোথায় নতুন বার্গার এসেছে, কোন ক্যাফের কফি ‘সবচেয়ে আলাদা’, বা কোথায় ‘শহরের সেরা’ বিরিয়ানি পাওয়া যায়, এসব এখন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে। আর এর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের খাওয়ার অভ্যাসও।
খেতে যাওয়ার আগে রিভিউ দেখা
এখন অনেকেই নতুন কোথাও খেতে যাওয়ার আগে অনলাইনে খোঁজ করেন। খাবারের ছবি দেখেন, ভিডিও দেখেন, অন্যরা কী বলছে সেটি শোনেন। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি।
অনেক সময় মানুষ খাবারের স্বাদ সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করে ফেলে সেখানে যাওয়ার আগেই। কোনো জায়গা খুব বেশি আলোচনায় চলে এলে সেটি একবার চেষ্টা করার আগ্রহও বেড়ে যায়।
ফলে রেস্টুরেন্ট বেছে নেওয়ার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। আগে মানুষ হয়তো বাসার কাছের বা পরিচিত জায়গাগুলোতেই বেশি যেত। এখন অনেকে শুধু অনলাইনে ভিডিও দেখে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে যাচ্ছে।
খাবার ‘দেখতে কেমন’ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
একসময় খাবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল স্বাদ। এখন সেটির সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি বিষয়, খাবারটি দেখতে কেমন।
কারণ এখন খাবারের ভিডিও আর ছবিও পুরো অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে গেছে। ফলে অনেক রেস্টুরেন্ট খাবারের উপস্থাপনায় আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে। কোথাও অতিরিক্ত চিজ ঢালা হচ্ছে, কোথাও বিশাল আকারের খাবার বানানো হচ্ছে, আবার কোথাও ধোঁয়া বা আগুন ব্যবহার করা হচ্ছে শুধু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য।
অনেক সময় মনে হয়, খাবারটি যতটা না খাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে, তার চেয়েও বেশি তৈরি হচ্ছে ক্যামেরার জন্য।
খাওয়ার অভিজ্ঞতাও বদলে গেছে
এখন অনেক রেস্টুরেন্টেই এমন দৃশ্য দেখা যায়, খাবার টেবিলে এসেছে কিন্তু কেউ খাওয়া শুরু করছেন না। আগে কয়েকটি ছবি তোলা হচ্ছে, ভিডিও করা হচ্ছে, আলো ঠিক করা হচ্ছে।
কেউ কেউ মজা করে বলেন, খাবার ঠান্ডা হওয়ার আগেই সেটির অন্তত দশটা ছবি তুলতে হয়।
আগে বন্ধুদের সঙ্গে খেতে যাওয়া মানে ছিল গল্প করা, সময় কাটানো। এখন সেই সময়ের একটা অংশ চলে যায় ছবি বা ভিডিও তৈরিতে। অনেকেই খাবারের স্বাদের চেয়েও সেটি অনলাইনে কেমন দেখাবে, তা নিয়ে বেশি ভাবেন।
মানুষ কি নিজের পছন্দে খাচ্ছে?
এই প্রশ্নটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ এমন খাবারও খাচ্ছে যেটি তারা খুব পছন্দ করে না। কিন্তু সেটি এত বেশি আলোচনায় যে না খেলে যেন কিছু একটা মিস হয়ে যাবে।
বিশেষ করে ‘সবাই যাচ্ছে’, ‘সবাই খাচ্ছে’, বা ‘সবাই ভিডিও বানাচ্ছে’ এই প্রবণতা মানুষের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলছে। কখনো খাবারের স্বাদের চেয়েও ‘ওই জায়গায় গিয়েছিলাম’ অভিজ্ঞতাটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া
অনলাইনে অনেক ফুড রিভিউ দেখলে মনে হয় প্রায় সব খাবারই ‘অসাধারণ’, ‘জীবনের সেরা’, বা ‘এমন স্বাদ আগে কখনও পাওয়া যায়নি’।
সমস্যা হলো, এমন অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া বারবার দেখতে দেখতে মানুষের প্রত্যাশাও বদলে যায়। ফলে বাস্তবে গিয়ে অনেকে হতাশ হন।
অবশ্য সব রিভিউই যে অসৎ, সেটিও না। অনেক মানুষ সত্যি ভালোবেসে খাবার নিয়ে কথা বলেন। কেউ নতুন ছোট দোকান পরিচিত করে দিচ্ছেন, কেউ নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করছেন। কিন্তু অনলাইনে নজর কাড়ার প্রতিযোগিতায় অনেক সময় স্বাভাবিক মতামতের জায়গা কমে যাচ্ছে।
ছোট ব্যবসার জন্য সুযোগ
এই পরিবর্তনের ইতিবাচক দিকও আছে। আগে ছোট কোনো খাবারের দোকান পরিচিত হতে অনেক সময় লাগত। এখন একটি ভিডিও বা ভালো রিভিউয়ের কারণে ছোট দোকানেও মানুষের ভিড় শুরু হতে পারে। বাংলাদেশে এমন অনেক দোকান আছে, যেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার পর দ্রুত পরিচিতি পেয়েছে।
ফলে অনলাইন অনেক ছোট ব্যবসার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। আগে যেখানে বড় রেস্টুরেন্টের বিজ্ঞাপনের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন ছিল, এখন একটি ভাইরাল ভিডিও অনেক কিছু বদলে দিতে পারে।
খাওয়ার অভ্যাস কি সত্যিই বদলাচ্ছে?
সম্ভবত বদলাচ্ছে। মানুষ এখন শুধু ক্ষুধা মেটানোর জন্য খাচ্ছে না। কোথায় খাচ্ছে, খাবার দেখতে কেমন, সেটি ছবি বা ভিডিওতে কেমন লাগবে, এসবও এখন সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে গেছে।
দিন শেষে খাবার এখনও মানুষকে একসঙ্গে বসায়, গল্প করায়, স্মৃতি তৈরি করে। তবে সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে এখন ক্যামেরা, রিভিউ আর অনলাইন ট্রেন্ডও স্থায়ীভাবে জুড়ে গেছে।