পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠক: কারা থাকছেন আলোচনায়, এজেন্ডা কী
মধ্যপ্রাচ্যে ছয় সপ্তাহের সংঘাত শেষে এখন দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলছে। এ অবস্থায় নতুন করে আবার যুদ্ধে না জড়িয়ে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসতে যাচ্ছেন দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা।
আজ বৃহস্পতিবার সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরার বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে আসে এ বৈঠকের বিস্তারিত তথ্য।
বৈঠক কবে এবং কোথায়
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের আমন্ত্রণে আগামী শনিবার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে যে, শনিবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই আলোচনা শুরু হবে।
ইসলামাবাদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশে অবস্থিত সেরেনা হোটেলকে এই আলোচনার ভেন্যু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
৯ ও ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং পুরো ‘রেড জোন’ এলাকা কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে।
কারা থাকছেন আলোচনায়
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই দলের নেতৃত্ব দেবেন। তার সঙ্গে থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার। ভ্যান্সের উপস্থিতি এই আলোচনার গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইরানের প্রতিনিধি দল
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তেহরানের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেবেন। গালিবাফ একজন সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার হওয়ায় তার উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মধ্যস্থতাকারী
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবেন।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দুই দেশ আলাদা রুমে বসবে এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তারা তাদের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করবেন।
মূল এজেন্ডা
উভয় পক্ষই তাদের সর্বোচ্চ দাবি নিয়ে আলোচনায় আসছে।
ইরানের ১০ দফা
ইরান চায় হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করার দাবিও তালিকায় আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি
হোয়াইট হাউস চায় ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের পুরো মজুদ সমর্পণ করুক। যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো এতে রাজি হয়নি।
লেবানন সংকট
বর্তমানে আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা লেবাননে ইসরায়েলের হামলা। যুদ্ধবিরতির শর্তে লেবাননে হামলা বন্ধের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে ইরান।
কিন্তু ট্রাম্প ও ভ্যান্স স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই যুদ্ধবিরতি লেবাননের জন্য প্রযোজ্য নয়।
কেন পাকিস্তান
পাকিস্তান এমন একটি দেশ যার সাথে ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষেরই সুসম্পর্ক রয়েছে। ইরানের সাথে পাকিস্তানের ৯০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনসংখ্যার বাস পাকিস্তানে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ পাকিস্তান। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের মতো পাকিস্তানে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই, যা ইরানের কাছে পাকিস্তানের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
প্রধান বাধা ও সম্ভাবনা
বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ‘আস্থার অভাব’।
চীনে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইসরায়েল এখানে ‘স্পয়লার’ বা বাধা হিসেবে কাজ করছে। লেবাননে ইসরায়েলের ক্রমাগত হামলা আলোচনা প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করার একটি চেষ্টা হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই পর্যায়ে আমরা কেবল সতর্কতার সাথে আশাবাদী হতে পারি, কারণ আলোচনা অবশ্যই জটিল ও কষ্টসাধ্য হবে এবং ১৫ দিনের সময়সীমার পরও তা বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।’
নিউইয়র্কভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের ফেলো সাহার খানও এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘আস্থার অভাবই সবচেয়ে বড় বাধা। এই মুহূর্তে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই দাবি করেছে যে তারা জিতেছে, কিন্তু এই যুদ্ধবিরতি যদি টিকে থাকে এবং তারা সত্যিই আলোচনায় বসে, তবে সেটাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’
গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফেরের মতে, ইসরায়েলের অনুপস্থিতি একটি কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা।
সম্ভাব্য ফলাফল
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প মেয়াদে কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। পরমাণু ইস্যু ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হতে পারে।
চীনে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ বলেন, ‘পারমাণবিক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি পরিমিত চুক্তি এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য এক ধরনের বহুপাক্ষিক বোঝাপড়া সম্ভব হতে পারে, কারণ উভয় পক্ষই ক্লান্তির লক্ষণ দেখাচ্ছে এবং শত্রুতা থেকে সাময়িক মুক্তি চায়।’
তবে স্থায়ী শান্তির ব্যাপারে তিনি সন্দিহান।
চীনের মতো কোনো দেশ এই চুক্তির ‘গ্যারান্টার’ বা জামিনদার হবে কি না, তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে।
খালিদ বলেন, ‘যেকোনো চুক্তির জন্য সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান রাষ্ট্রগুলো, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে।’
শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর—তিনি কি ইসরায়েলকে লেবাননে হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করবেন, নাকি এই যুদ্ধবিরতি মাঝপথেই ভেঙে যাবে?