‘সাগরবিধবা’: স্বামীর ফেরার পথ চেয়ে যাদের দিন যায়

রফিকুল ইসলাম মন্টু

‘নিখোঁজ স্বামীর অপেক্ষায় গেল ১৯ বছর। এতিম ছেলেমেয়েদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন যায়। বছরের পর বছর ধরে অভাব সহ্য করে আসছি। এখনো আশা করি, হয়তো সে ফিরে আসবে, আর আমাদের সব সমস্যা চলে যাবে।’

বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার চরলাঠিমারা গ্রামে, বেড়িবাঁধের বাইরে নিজের জরাজীর্ণ ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন ৪৫ বছর বয়সী মাছুমা বেগম। তার স্বামী হাসান পাহলান ছিলেন পেশায় জেলে। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে জানতেন মাছুমা। এ জন্য সব সময়ই আতঙ্কে থাকতেন। কিন্তু সংসার চালানোর আর তো কোনো উপায় নেই। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সাগরে যেতেন হাসান।

মাছুমার সেই ভয় বাস্তবে রূপ নেয় ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরের রাতে। সেদিন সাগরে যাওয়ার পর আর ফেরেনি হাসান। এর পর থেকেই অপেক্ষায় আছেন মাছুমা।

মাছুমা বলেন, ‘আমার অপেক্ষার শেষ নেই। সিডরের পর কোথাও লাশ পাওয়ার খবর শুনলেই ছুটে যেতাম। কিন্তু স্বামীর লাশ পাইনি। এরপর থেকে পুরো পরিবারের ভার আমার ওপর। বুঝতে পারছিলাম না কীভাবে বাঁচব। আমাদের থাকার জায়গা ছিল না। আয়ও ছিল না। এর মধ্যেই সন্তানদের বড় করতে করতে এতগুলো বছর কেটে গেল।’

শুধু মাছুমা বেগমই নন, বাংলাদেশের পুরো উপকূলজুড়ে এমন অসংখ্য নারী অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন পার করছেন। তাদের অনেকেই সাগরে নিখোঁজ হওয়া স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় আছেন। শুধু ঘূর্ণিঝড়ই নয়, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিম্নচাপ, জলোচ্ছ্বাস ও নানা দুর্ঘটনায় প্রতিবছর অসংখ্য জেলে নিখোঁজ হন। এসব ট্র্যাজেডির পুরো ভার গিয়ে পড়ে মাছুমা বেগমের মতো নারীদের ওপর।

সাগর
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার চর মনোহর গ্রামে নিখোঁজ ছেলে জেলে বাবুল হোসেনের জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে মা রোকসানা বেগম।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগামী বছরগুলোতে সমুদ্রের বিপদ আরও বাড়বে। ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যাজ অবজার্ভড ইন দ্য বে অব বেঙ্গল’ শীর্ষক এক গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনে সাগরে বাড়তে থাকা ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণাতেও দেখানো হয়েছে, সাগরের ওপর নির্ভরশীল জেলেদের জীবন কীভাবে প্রভাবিত করছে জলবায়ু পরিবর্তন।

বরগুনার পাথরঘাটা, পটুয়াখালীর কলাপাড়া, ভোলার চরফ্যাশন, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ এবং কক্সবাজারের কুতুবদিয়াসহ পুরো উপকূলজুড়ে মাছুমা বেগমের মতো অসংখ্য নারীর দেখা মেলে। সাগরের কারণে তাদের জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে।

চরফ্যাশনের চর মনোহর গ্রামে যেন শোক বাসা বেঁধে থাকে। প্রতিটি ঘরে একই গল্প, একই অনিশ্চয়তার ছায়া। ২০২০ সালে এই গ্রামের সাত জেলে সাগরে নিখোঁজ হন। এর পর থেকে গ্রামটিতে আনন্দ নেই। এত বছর পরও সেই ট্র্যাজেডি এখানকার দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে।

নিখোঁজ জাকির হোসেনের স্ত্রী হাসিনা বেগম তার তিন মেয়েকে নিয়ে জরাজীর্ণ দুই ঘরে থাকেন। স্বামীর রেখে যাওয়া তিন লাখ টাকা ঋণের বোঝা এখন তার ঘাড়ে। আরেক নিখোঁজ জেলে আলমগীর রেখে গেছেন ৬০ হাজার টাকার ঋণ। তার স্ত্রী রিফা বেগমের দিন কাটছে চরম অসহায়ত্বে। পরিবারে উপার্জন করার মতো কেউ নেই তার। একই গল্প নিখোঁজ অন্য জেলেদের পরিবারগুলোতে।

সাধারণত জেলেদের নিখোঁজ হওয়ার খবর পত্রপত্রিকায় বড় জায়গা পায় না। কিন্তু এসব ছোট খবরের পেছনে জেলে পরিবারের অসহায়ত্ব আর অনিশ্চয়তার অনেক বড় গল্প লুকিয়ে থাকে। খুব কম মানুষই তাদের খোঁজ রাখেন।

কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ, রামগতি, হাতিয়া ও মনপুরাসগ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি পরিবারই অনিশ্চয়তা আর চরম অর্থ সংকটে দিন পার করছে।

সাগরের বিপদ যত বাড়ছে, মাছের মজুতও তত কমছে। উপকূলীয় জেলেদের জীবন-জীবিকার ওপর এটা মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। মাছ কম পেলেও জেলেদের সাগরে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।

sea
জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে সাগর ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে। এতে চরম ঝুঁকিতে পড়ছে মাছ ধরার ট্রলারগুলো। ছবি: রফিকুল ইসলাম মন্টু

‘ডুইন্ডলিং কোস্টাল ফিশারিজ বায়োডাইভার্সিটি অব বাংলাদেশ: দ্য কজেস অ্যান্ড ইফেক্টস’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত মৎস্য আহরণে অনেক প্রজাতির মাছ দ্রুত কমে যাচ্ছে। দেশের মৎস্য অর্থনীতিতে সামুদ্রিক খাতের অবদান প্রতিবছরই কমছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)-এর মূল্যায়নে প্রায় ২৮ শতাংশ উপকূলীয় মাছ এখন ‘বিপন্ন প্রজাতির’ তালিকায়।

নিখোঁজ জেলের সংখ্যা বাড়ছে

ভোলার চরফ্যাশনের জেলে নুরুদ্দিন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সাগরে মাছ ধরতে যাই। আগে ভয় লাগত না, কিন্তু এখন লাগে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কি না জানি না, তবে সাগর এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অশান্ত। সংকেত ঠিকমতো না পৌঁছানোর কারণে দুর্ঘটনায় পড়তে হয়।’

বাংলাদেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলার মধ্যে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর ও বাগেরহাটে সাগরে যাওয়া জেলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। উপকূলের ১০ লাখের বেশি মানুষ মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত। সাগরে নিখোঁজ জেলের সংখ্যাও বাড়ছে। তবে সামগ্রিকভাবে এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা প্রশাসন নিখোঁজ জেলেদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। তালিকা অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শুধু ওই উপজেলাতেই মাছ ধরতে গিয়ে প্রায় ২০০ জেলে নিখোঁজ হয়েছেন।

এই তালিকা তৈরিতে যুক্ত স্থানীয় সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, ‘নিখোঁজ জেলেদের পরিবারগুলোকে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করতে এই তালিকা করা হয়েছে। এসব পরিবারের চরম কষ্ট আমরা নিজের চোখে দেখেছি। অনেক পরিবারেই উপার্জনক্ষম কেউ নেই। নারীরা খুব কঠিন পরিস্থিতিতে পরিবার চালাচ্ছেন।’

সংক্ষেপিত অনুবাদ, মূল প্রতিবেদন পড়তে ক্লিক করুন এই লিংকে

(লেখক পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং উপকূলীয় সমাজ নিয়ে কাজ করা পুরস্কারজয়ী ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক)