এবার হজে যে বিষয়টি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ

তীব্র গরমের পূর্বাভাস
স্টার অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে চাপা উত্তেজনার মধ্যেই পবিত্র হজ পালনের জন্য সৌদি আরবের মক্কায় জড়ো হচ্ছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসল্লিরা।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও পুরো অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি এবার হজযাত্রীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র গরম। এ অবস্থায় হজ ঘিরে বেশকিছু নতুন সতর্কবার্তা দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

বার্তাসংস্থা এএফপি ও আরব নিউজের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বছর হজ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান।

গত ৮ এপ্রিল থেকে শর্তসাপেক্ষে দু’পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চললেও যেকোনো সময় আবারও যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসল্লিদের অংশগ্রহণে এবারের হজ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়।

জেদ্দার কিং আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন হজযাত্রীরা। ১১ মে ২০২৬। ছবি: এএফপি

সৌদি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৫ মে থেকে শুরু হচ্ছে পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা। শেষ হবে ৩০ মে। ইতোমধ্যে হজ পালনের জন্য ১২ লাখের বেশি মুসল্লি সৌদি আরবে পৌঁছেছেন।

জার্মানি থেকে হজ করতে পরিবারসহ মক্কায় আসা গৃহিণী ফাতিমা (৩৬) এএফপিকে বলেন, ‘এখানে আসা নিয়ে আমাদের মনে এক মুহূর্তের জন্যও দ্বিধা ছিল না। আমরা জানি, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাতেই আছি।’

কঠোর নিষেধাজ্ঞায় কী আছে

ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রভাব হজের আনুষ্ঠানিকতায় যেন কোনো বাধা সৃষ্টি না করে, সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

উমরাহ পালনের অংশ হিসেবে মক্কায় মুসল্লিরা। ২১ মে, ২০২৬। ছবি: এএফপি

ইতোমধ্যে হজযাত্রীদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা প্রচার করেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সৌদির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বার্তায় বলা হয়েছে, হজ চলাকালে কোনো রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক পতাকা বহন কিংবা স্লোগান দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবার হজে কোনো ধরনের অস্থিরতা এড়াতে সৌদি ও ইরান উভয়পক্ষই সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।

সৌদি পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ উমর করিম এএফপিকে বলেন, ‘যুদ্ধ সত্ত্বেও সৌদি আরব ও ইরান নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা উন্মুক্ত রেখেছে।’

এ বছর এপ্রিলের শেষ থেকে ইরানি হজযাত্রীরাও সৌদি আরবে আসতে শুরু করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, কয়েক হাজার ইরানি এবারের হজে অংশ নেবেন।

তীব্র গরমের পূর্বাভাস

ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ছাড়াও এবার হজযাত্রীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র গরম। সপ্তাহজুড়ে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ইতোমধ্যে পূর্বাভাস দিয়েছে সৌদি আবহাওয়া দপ্তর।

এক বাংলাদেশি হজযাত্রীকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন সৌদির উম্ম আল-কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অনুষদের এক শিক্ষার্থী। ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালে হজের সময় তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর গরমে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

সেই অভিজ্ঞতার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ এবার ছায়াযুক্ত স্থান বাড়ানো এবং অতিরিক্ত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগসহ নানা ব্যবস্থা নিয়েছে।

সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হজযাত্রীদের সহায়তার জন্য ৫০ হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী ও ৩ হাজার অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

গরমের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। ছবি: সংগৃহীত

তীব্র গরম ও যুদ্ধের শঙ্কা সত্ত্বেও মক্কায় পৌঁছে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন অনেক মুসল্লি।

৪৭ বছর বয়সী আহমেদ আবো সেতা এএফপিকে বলেন, ‘হজ ছিল আমার সারাজীবনের স্বপ্ন। অবশেষে সেটি পূরণ হতে যাচ্ছে।’

হজ ঘিরে সৌদির যত উদ্যোগ

তীব্র গরমে হজযাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য দিতে যানজট কমানোর পাশাপাশি সড়ক শীতলীকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন, মক্কা-মদিনা মহাসড়কে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশ্রামাগার তৈরি, বিভিন্ন পয়েন্টে পানি সরবরাহ ও ভিড় ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

সড়ক শীতলীকরণ প্রকল্প

মক্কার তিনটি মেট্রো স্টেশন এলাকার তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে ইতোমধ্যে সড়ক শীতলীকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সৌদি সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।

মক্কা-মদিনা সড়কে যান চলাচল পর্যবেক্ষণ করছেন একজন কর্মকর্তা। ছবি: সংগৃহীত

প্রকল্পটি আল-মাশায়ের আল-মুকাদ্দাসাহ মেট্রো লাইনের তিনটি স্টেশনে মোট ১৪ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে তৈরি। এখানে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সূর্যের বিকিরণ রোধ এবং সড়কের তাপ শোষণ করার ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে পিচঢালা রাস্তার উপরিভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে আসে। এতে অতিরিক্ত ভিড় থাকলেও গরম কম অনুভূত হবে।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশ্রামাগার

মক্কা ও মদিনার সংযোগকারী হিজরত সড়কে ‘বিশেষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবু’ চালু করেছে কর্তৃপক্ষ।

২ পবিত্র নগরীর মধ্যে যাতায়াতকারী হজযাত্রী এবং ওমরাহ পালনকারীদের সফর আরও নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গরমে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বিশেষ ছাতা। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্রামাগারে হজযাত্রীদের জন্য হালকা খাবার ও ঠান্ডা পানীয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন সচেতনতামূলক ও নির্দেশনামূলক লিফলেটও বিতরণ করা হচ্ছে।

পানি সরবরাহ কেন্দ্র

হজযাত্রীদের হাঁটার পথজুড়ে ২ হাজার ৪০০টিরও বেশি আধুনিক ওয়াটার পয়েন্ট বা পানি সরবরাহ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে হজযাত্রীরা সার্বক্ষণিকভাবে ঠান্ডা ও শতভাগ বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি পাবেন।

হজযাত্রীদের চলাচলের পথে আধুনিক পানির পয়েন্ট। ছবি: সংগৃহীত

এ ছাড়া, সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য ড্রোন ও এআই প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।