ধরলার ভাঙনে হুমকির মুখে লালমনিরহাটের শহররক্ষা বাঁধ

এক সপ্তাহে বিলীন ৩৫০ বিঘা আবাদি জমি।
এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

বাসন্তী রাণীর কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। ধারলার ভাঙনে গত এক সপ্তাহে তার প্রায় ৩ বিঘা আবাদি জমি হারিয়ে গেছে। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে আরও প্রায় ৮ বিঘা জমি।

কৃষি জমি লাগোয়া তার বসতবাড়ী। লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের কুরুল গ্রামের অনেকেই ইতোমধ্যে ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে গেছেন।

বাসন্তীর আশঙ্কা, এভাবেই ভাঙন চলতে থাকলে এক সময় তাকেও গৃহহীন হতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছেন গত সপ্তাহে মোগলহাট ও কুলাঘাট ইউনিয়নের অন্তত ৮টি গ্রামের প্রায় ৩৫০ বিঘা আবাদি জমি বিলীন হয়ে গেছে।

ধরলার ভাঙনে লালমনিরহাট শহররক্ষা বাঁধও হুমকির মুখে পড়েছে। এই উপজেলার মোগলহাট, কুলাঘাট ও বড়বাড়ী ইউনিয়ন ঘেঁষে বয়ে গেছে ধরলা। বন্যা থেকে রক্ষায় ধরলার ডান তীরে রয়েছে ১৮ দশমিক ৫
কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ। এর মধ্যে প্রায় ১০ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার অংশই ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বাঁধের প্রায় ৬০ মিটার এলাকা।

২০১৭ সালে কুলাঘাট ইউনিয়নের শিবেরকুটি এলাকায় শহররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০০ মিটার অংশ ধসে শহরে পানি ঢুকে পড়ে। অনেক এলাকা তলিয়ে যায়। সেই বন্যায় শিশুসহ চারজনের মৃত্যু হয়। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে সদর উপজেলা।

শহররক্ষা বাঁধ ও কৃষি জমি রক্ষায় সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

নদী ভাঙন
ছবি: স্টার

‘নদী বান্ধিতে যে টাকা খরচ হয়, তার চেয়ে ৫০ গুণ বেশি টাকার জমি নদীত চলি যায়। সরকার যায়, সরকার আইসে—কাইও হামার কষ্ট বোঝে না। অ্যালাং নদীটা বান্ধি দিলেও হামারগুলার কিছু ভুঁই বাইচবে,’ বলছিলেন কুরুল গ্রামের কৃষক যাত্রামোহন বর্মণ।

এক যুগ আগে নদী ভাঙনে তার ১০ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছিল। অবশিষ্ট ছিল ৭ বিঘা। গত সপ্তাহে আরও ৩ বিঘা জমি হারিয়েছেন তিনি। বাকি ৪ বিঘাও ভাঙনের মুখে আছে।

নদীর পাড়ে বসে চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘ধরলা নদী হামাকগুলাক শ্যাষ করি ফ্যালাইছে। যেইকনা ভুঁই আছলো তাঙ অ্যালা নদীত চলি যাবার নাইকছে। হামরাগুলা ক্যাং করি বাঁইচমো। মরা ছাড়া হামারগুলার কোনো পথ খোলা নাই।’

অবশিষ্ট বিঘা জমি নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন বুমকা এলাকার কৃষক পুলিন চন্দ্র বর্মণ। গত এক যুগে তিনি হারিয়েছেন ১৩ বিঘা জমি। গত এক সপ্তাহে ধরলার ভাঙন তার আরও ২ বিঘা জমি কেড়ে নিয়েছে।

পুলিন বলেন, ‘আবাদ ছাড়া হামরাগুলা আর কিছুই কইরবার পাই না। অল্প অ্যাকনা জমি আছে, তাকো যদি নদীত যায়, তা হইলে হামারগুলার মরণ ছাড়া কোনো উপায় নাই! জমিই হলো হামারগুলার জীবন, সেই জমি চলি যাবার নাইকছে।’

শহররক্ষা বাঁধ ভেঙে গেলে কয়েক হাজার হেক্টর আবাদি জমি ও হাজারো বসতবাড়ি ক্ষতির মুখে পড়বে, বলেন মোগলহাট ইউনিয়নের ইটাপোতা গ্রামের কৃষক মন্টু মিয়া।

কুলাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ২০১৭ সালে বন্যার স্মৃতি মানুষ এখনো ভুলতে পারেনি।

‘এবারও যদি বাঁধ ভেঙে যায়, তাহলে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে হাজার হাজার পরিবার,’ বলেন তিনি।

যোগাযোগ করা হলে পাউবো লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বলেন, ‘ধরলা নদীর ডান তীর সংরক্ষণ প্রকল্পটি একনেকের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে শহররক্ষা বাঁধ স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং ধরলার ডান তীরের ভাঙনও রোধ করা যাবে।’