শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কেমন হতে পারে?

আয়াজ কাদের ও ফারহীন রহমান

নজিরবিহীন এক পদক্ষেপে অস্ট্রেলিয়া সরকার একটি নতুন আইন পাস করে। এতে ১৬ বছরের নিচের অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। ২০২৪ সালে সাউথ অস্ট্রেলিয়ার প্রিমিয়ার পিটার মালিনাউস্কাসের স্ত্রী জোনাথন হেইডটের লেখা ‘দ্য অ্যানজিয়াস জেনারেশন’ বইটি পড়ে তাকে পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করলে এর সূত্রপাত হয়। বইটিতে বলা হয়েছে, স্মার্টফোনের বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রভাবে কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে।

এর প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি চালু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ছবি বা ভিডিও বিশ্লেষণ করে বয়স অনুমান করা। পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহারের সুযোগও দেওয়া হয়েছে।

প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য শর্ত হলো—যদি তারা ১৬ বছরের নিচের ব্যবহারকারীদের তাদের প্ল্যাটফর্মে থাকতে দেয়, তাহলে কোম্পানিগুলো শাস্তির মুখে পড়বে। সিএনবিসি অস্ট্রেলিয়ার তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার পর দেশটির অনেক শিশু এখন অবসর সময় কাটানোর বিকল্প উপায় খুঁজছে। অন্যদিকে কেউ কেউ নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকা অ্যাপ ব্যবহার করছে বা ভিপিএনের মতো টুল ব্যবহার করে বিধিনিষেধ এড়ানোর চেষ্টা করছে।

অস্ট্রেলিয়ার এই পদক্ষেপ শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ফ্রান্স ও ইন্দোনেশিয়াসহ আরও অনেক দেশ একই পথে হাঁটছে। যুক্তরাজ্যে হাউস অব লর্ডস ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব সমর্থন করেছে। একইভাবে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যেও ১৬ বছরের নিচের ব্যবহারকারীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করে আইন পাস হয়েছে, যদিও তা বাস্তবায়নের দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয় নি।

তাই প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন নিষেধাজ্ঞা কেমন হতে পারে?

আইন হিসেবে পাস হওয়ার পর এমন একটি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে শক্তিশালী প্রয়োগ ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন। সম্ভাব্য একটি উপায় হতে পারে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কোম্পানিগুলোকে নিজ উদ্যোগে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে বলবে। অস্ট্রেলিয়ার মতোই ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ, জন্মসনদের মতো জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা অনলাইন আচরণ বিশ্লেষণ করে বয়স নির্ধারণের ‘এজ ইনফারেন্সিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রযুক্তি নীতিবিষয়ক গবেষক মীম আরাফাত মানব মনে করেন, এরকম আইনের বাস্তবায়ন জটিল সমস্যা তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে নজরদারির প্রয়োজন, যা অতিরিক্ত অনলাইন পর্যবেক্ষণের দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, চ্যাট পর্যবেক্ষণের বিরুদ্ধে নানা মহলের আপত্তি রয়েছে এবং এটি অত্যন্ত জটিল। তাই বাংলাদেশের মতো দেশে এটি বাস্তবসম্মত নয়।

মানব বলেন, পরিচয়পত্র ব্যবহারের বিষয়টি কার্যকর নাও হতে পারে। যেহেতু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো স্থানীয় নয়, তাই তাদের বাধ্য করার মতো পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ সরকারের নেই।

নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যুক্তি

এমন নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য হবে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাসহ স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব রোধ করা।

সাউথ ব্রিজ স্কুলের উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক আলফ্রেড ডি’সিলভা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উন্মুক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সেখানে নানা ধরনের আচরণ ও কার্যকলাপ শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য ক্ষতিকর।

প্রতারণা ও হয়রানি ঝুঁকির পাশাপাশি শিশুরা অনলাইন বুলিংয়েরও শিকার হয়। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী সানজানা আফরিন বলেন, ‘আমাদের দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের প্রলোভনে ফেলার ঘটনা খুবই সাধারণ।’ তিনি বলেন, এখানে শিশুদের জন্য জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে তার সুযোগ নেওয়া হয়। ‘আমি মনে করি এই আইন (নিষেধাজ্ঞা) কার্যকর করলে এমন ঘটনা কমবে এবং শিশুদের সুরক্ষা বাড়বে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহারের আরেকটি চিন্তার বিষয় হলো অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব অ্যাপ এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে ব্যক্তিগত অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর মনোযোগ সর্বোচ্চ সময় ধরে রাখা যায়। ফলে সব বয়সের ব্যবহারকারীই দীর্ঘ সময় ডিভাইসে কাটাতে বাধ্য হন। তরুণ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এটি বাজে ফলাফল, ঘুমের অভাব এবং সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়ার কারণও হতে পারে।

২০২৫ সালে দ্য জার্নাল অব দ্য আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তিমূলক ব্যবহার দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এমনকি আত্মহত্যার চিন্তার সঙ্গেও যুক্ত।

স্কুলগামী শিশুদের পাশাপাশি এই নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য হতে পারে আরও কম বয়সী শিশু, যেমন কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরা। শিশুদের ব্যস্ত রাখার জন্য অভিভাবকেরা অল্প বয়সেই তাদের হাতে ডিভাইস তুলে দেন—এটি এখন সাধারণ বিষয় হয়ে গেছে। তবে এই অভ্যাস তাদের ভাষাগত বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং ভবিষ্যতে নির্ভরশীলতার সমস্যাও তৈরি করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে এত সমস্যা জড়িত থাকায়, নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যুক্তি অমূলক নয়।

এই নিষেধাজ্ঞা সাইবার বুলিং, অনলাইন শোষণ এবং ক্ষতিকর কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি কমাতে পারে। সাক্ষাতকারদাতারা শিশুদের সামনে থাকা ব্ল্যাকমেইল, প্রলোভন ও হয়রানির মতো বাস্তব ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছেন। শিক্ষকেরা আরও বলেন, নিয়মিত ডিজিটাল ব্যবহারের কারণে শিশুদের মধ্যে নির্ভরশীলতা এবং মনোযোগের ঘাটতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ও দুই সন্তানের মা আকলিমা আক্তার সুমি বলেন, ‘বাংলাদেশে যদি এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হলে এটি সঠিক পথে বড় একটি পদক্ষেপ হবে, কারণ শিশুরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক দিকের চেয়ে নেতিবাচক দিকেই বেশি ঝুঁকছে।’

এই দৃষ্টিকোণ থেকে, মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করতে এবং ক্ষতিকর কনটেন্টের সংস্পর্শ কমাতে মাধ্যমগুলোতে প্রবেশাধিকার সীমিত করা সহায়ক হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহিরা এক আত্মীয়ের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘এই প্ল্যাটফর্মগুলোর কারণে শিশুরা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। আমার পরিচিত উদাহরণ হলো আমার চার বছরের আত্মীয়। আমরা জানি ইউটিউব কিডস ভালো হলেও শিশুরা বড়দের ব্যবহারযোগ্য ইউটিউবও খুঁজে পায়। সে নিয়মিত সেখানে ঢুকে এমন ভিডিও দেখে যা আমি বুঝি না এবং তার বয়সের জন্য উপযুক্ত নয় এমন গানও শোনে।’

উদ্বেগের বিষয়

এই প্রতিবেদনে মন্তব্যকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শিক্ষামূলক দিকটিরও গুরুত্ব দিয়েছেন। অনেক শিক্ষার্থী টিউটোরিয়াল, লেকচার এবং আলোচনার মাধ্যমে একাডেমিক সহায়তা পায়। তাই সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দায়িত্বশীলভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কলেজ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পড়ান জান্নাতুল ফেরদৌস। তিনি বলেন, কৌতূহলের বশে অনেক শিশু ইন্টারনেটের এমন জায়গায় চলে যায় যা কম নিয়ন্ত্রিত এবং বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় তারা ভিপিএনের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাও দেখাতে পারে। তাই জান্নাতের মতে, একটি নিষেধাজ্ঞা ইতিবাচক ফল দিতে পারে।

এতে আরেকটি বিতর্কের বিষয় উঠে আসে—বিকল্প মাধ্যম ও ভিপিএনের কারণে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা শিশুদের স্মার্টফোন থেকে পুরোপুরি দূরে রাখতে পারবে না। মানব বলেন, স্মার্টফোন আসক্তি কমাতে শিশুদের বিকল্প শখের সুযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় খেলার মাঠ ও পার্কের অভাব রয়েছে। অনেক শিশুর পড়া বা সিনেমা দেখার অভ্যাস নেই। তাদের কিছু করার দরকার হয়, তাই তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝুঁকে পড়ে। আমাদের তাদের আরও বিকল্প দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থার কারণে অনেক কিশোর-কিশোরী অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ থেকে মুক্তি পেতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে।

অন্যান্য নীতি বা পরিবর্তন

আলফ্রেড বলেন, নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি স্কুলগুলোতে বাধ্যতামূলক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা উচিত, যা বিশেষ কর্মশালার মাধ্যমে তরুণদের দায়িত্বশীলভাবে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেবে। পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, সাইবার বুলিং, ডিজিটাল গোপনীয়তা, তথ্য যাচাই ও ভুল তথ্য শনাক্তকরণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া উচিত। এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক সমস্যার সমাধানে সহায়ক হতে পারে।

বিদেশি কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞার মডেল সরাসরি বাংলাদেশে প্রয়োগ করলে কাঠামোগত ও সামাজিক বাধার মুখে পড়তে পারে। তাই নীতির গুরুত্ব শুধু নিষেধাজ্ঞায় সীমাবদ্ধ না রেখে ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির দিকে দেওয়া উচিত। স্কুলের পাঠ্যক্রমে সঠিক ও তত্ত্বাবধানমূলক শিক্ষা যুক্ত করলে শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি, গোপনীয়তা, সাইবার বুলিং এবং দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করা সম্ভব।

মানব বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঝুঁকি থেকে শিশুদের রক্ষা করতে শক্তিশালী সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা প্রয়োজন। তার মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান নয়। বরং কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মোকাবিলায় সহায়ক এমন একটি শক্তিশালী সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সামাজিক কর্মীর সংখ্যা কম এবং সামাজিক কাজকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয় এবং মানুষকে এগুলো প্রকাশ না করার প্রত্যাশা করা হয়।’

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা কিছু ঝুঁকি কমাতে পারে, তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে এটি কীভাবে নকশা করা ও বাস্তবায়ন করা হয় তার ওপর। বিভিন্ন মতামত থেকে বোঝা যায়, সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকারিতা নির্ভর করবে নিষেধাজ্ঞার চেয়ে বেশি শিক্ষা, সহযোগিতা এবং নিরাপদ ডিজিটাল বিকল্পের ওপর। এই প্রেক্ষাপটে চ্যালেঞ্জটি শুধু শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধ করা নয়, বরং তাদের নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে তা ব্যবহারের দক্ষতা গড়ে তোলা।