এআই ভিডিও দেখে স্বাস্থ্য পরামর্শ নিয়ে উল্টো ঝুঁকিতে পড়ছেন না তো?
সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই আজকাল দেখা যায়, রক্তনালির ভেতর থেকে বিষাক্ত উপাদান ঘষে পরিষ্কার করছে রসুনের কোয়া। হলুদের শিকড় লিভারকে চকচকে করে তুলছে। পালং শাককে এমনভাবে টেনে নেওয়া হচ্ছে কোলনের ওপর দিয়ে, যেন স্পঞ্জ দিয়ে সব ময়লা মুছে ফেলা হচ্ছে।
এই ছোট ভিডিওগুলো নিশ্চয়ই দেখেছেন। এআই দিয়ে তৈরি এসব ভিডিও অদ্ভুত তৃপ্তিকর! পরিষ্কার ভিজ্যুয়াল, সহজ ব্যাখ্যা, আর স্বাস্থ্য মানে শুধু শরীরকে ‘ঠিকভাবে পরিষ্কার’ রাখা—এমন আশ্বাস এসব ভিডিওর ভিত্তি।
কিন্তু ভিডিওগুলোকে কার্যকর মনে হওয়ার পেছনের কারণটাই আসলে এগুলোকে বিভ্রান্তিকর করে তোলে। মানুষের শরীরের জটিল গঠনকে সেখানে ময়লা আর ডিটারজেন্টের কার্টুনে পরিণত করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিলতাকে বদলে দেওয়া হয় চোখে দেখা সহজ ‘নিশ্চয়তা’ দিয়ে। সেখানে হলুদ আর শুধু প্রদাহনাশক গুণসম্পন্ন একটি মসলা থাকে না, সেটি হয়ে যায় লিভার ‘ডিটক্স টুল’। রসুনও আর হৃদরোগ–সম্পর্কিত উপকারিতা থাকা একটি খাবার থাকে না, বরং ধমনির পাইপ পরিষ্কার করার সরাসরি উপায় হয়ে ওঠে।
মেডিকেল শিক্ষার্থী হিসেবে শুরুর দিকেই একটি বিষয় শেখা যায়—মানবদেহ খুব কমই সরল বা একরৈখিকভাবে কাজ করে। এমন কোনো খাবার নেই, যা একাই কোনো অঙ্গকে ‘পরিষ্কার’ করে দেয়। এমন কোনো সর্বজনীন ডিটক্স পদ্ধতিও নেই, যা কয়েকটি খাদ্যাভ্যাসের কৌশল মেনে চালু করা যায়। শরীরবিজ্ঞানের নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ারও কোনো শর্টকাট নেই।
অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঠিক উল্টো ধারণাটাকেই জনপ্রিয় করে তুলেছে—স্বাস্থ্য যেন এমন একটি ধাঁধা, যার সহজ উত্তর হাতের কাছেই লুকিয়ে আছে। এই ধারণা আবেগের দিক থেকে খুব আকর্ষণীয়। এটি মানুষকে নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি দেয়। আর এখানেই এআই–নির্ভর কনটেন্ট জায়গা করে নেয়। এগুলো শুধু ভুল তথ্য ছড়ায় না, এসব তথ্য এমনভাবে উপস্থাপন করে যে বিষয়গুলো স্বাভাবিক মনে হতে থাকে।
কাজেই, এখন ঝুঁকি শুধু এটুকু নয় যে অনলাইন ভুল স্বাস্থ্য-পরামর্শে ভরা। তারচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, এখন খুব দ্রুত আর ব্যাপকভাবে এমন কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে, যেগুলোর সঙ্গে প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের খুব একটা সম্পর্ক নেই। এআই-তৈরি ভিডিওগুলো দেখতে ও শুনতে শিক্ষামূলক কনটেন্টের মতো হলেও, সেখানে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অনুপস্থিত থাকে। অ্যানিমেশন আর টেমপ্লেট ব্যবহার করে এমন অসংখ্য ভিডিও বানানো হচ্ছে, যেগুলো সহজ মেডিকেল ব্যাখ্যার মতো দেখালেও বাস্তব চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
চিকিৎসকদের একটি অভিজ্ঞতা হলো, মানুষ সাধারণত সেই তথ্য দিয়েই নিজের উপসর্গ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে, যেটি সে তখন সবচেয়ে সহজে পাচ্ছে। এখন ক্রমেই সেই তথ্যের উৎস হয়ে উঠছে ছোট ছোট সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিও, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক নন। দীর্ঘদিনের মাথাব্যথাকে বলা হচ্ছে ‘টক্সিন’, ক্লান্তিকে বলা হচ্ছে ‘ঘাটতি’, হজমের সমস্যাকে বানিয়ে ফেলা হচ্ছে ‘কোলন ক্লিনজের সমস্যা’। ফলে সত্যিকারের চিকিৎসা নেওয়ার সময় হওয়ার আগেই রোগ সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি হয়ে যাচ্ছে, যা অনেক সময় সঠিক রোগ নির্ণয় দেরি করিয়ে দিতে পারে।
এটা মানুষের অসচেতনতার কারণে ঘটে—তা বলা যাবে না। বরং এটা ঘটে কারণ এসব কনটেন্ট প্রভাব ফেলতে সক্ষম, মানসিকভাবে আশ্বস্ত করার মতো। যেখানে চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক সময় নিশ্চিত উত্তর দিতে পারে না, সেখানে এগুলো নিশ্চয়তার একটা অনুভূতি দেয়।
এআই দিয়ে তৈরি স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্টকে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হওয়ার আরেকটি কারণ হলো এর ভাষা ও ভঙ্গি। এগুলো একইসঙ্গে আত্মবিশ্বাসী, গুছানো ও ব্যাখ্যামূলক শোনায়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানে আত্মবিশ্বাস মানেই সত্য নয়। বাস্তব চিকিৎসা পরামর্শ সবসময় সতর্ক, শর্তসাপেক্ষ ও পরিস্থিতিনির্ভর হয়। কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞান কখনো সবার জন্য একই সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিতে পারে না।
কিন্তু সতর্কতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব একটা জনপ্রিয় হয় না। জনপ্রিয় হয় নিশ্চিত ভঙ্গি। আর তাই প্রমাণ না থাকলেও সেই নিশ্চিত কথাগুলোই বেশি ছড়িয়ে পড়ে।
এক্ষেত্রে সব দায় দর্শকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সহজ হতো, কিন্তু তাতে পুরো চিত্রটা ধরা পড়ে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো তৈরি করা হয়েছে মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য, তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করার জন্য নয়। এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট বানানো সহজ। এগুলো দ্রুত ও সহজে ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
অন্যদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভুল সংশোধন ধীর, জটিল এবং অ্যালগরিদমনির্ভর প্ল্যাটফর্মগুলোতে অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়। ফলে এখানে একটি কাঠামোগত অসমতা তৈরি হয়। প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসাবিজ্ঞানকে প্রতিযোগিতা করতে হয় এমন কনটেন্টের সঙ্গে, যেগুলো মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য বিশেষভাবে তৈরি। এর ফল শুধু ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়া নয়, বরং ভুল তথ্যের কাছে সঠিক তথ্যের হেরে যাওয়া।
এর সমাধান তাহলে কী? পুরোপুরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে দূরে সরে যেতে হবে—এটা তো সমাধান হতে পারে না। কারণ এখন মানুষ শেখা ও যোগাযোগের বড় অংশই করে এসব মাধ্যমের মাধ্যমে। তবে স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্টের ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী সন্দেহপ্রবণ মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি, বিশেষ করে যেসব বিষয়ের ব্যাখ্যা সোশ্যাল মিডিয়ায় অস্বাভাবিক সহজ মনে হয়।
নিজেদের একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—এই ব্যাখ্যাটি কি বিষয়টির জটিলতাকে স্বীকার করছে, নাকি সেটিকে একেবারে বাদ দিচ্ছে? বাস্তব চিকিৎসাবিজ্ঞানে খুব কম ক্ষেত্রেই এক লাইনের কারণ ফলাফলের গল্পে ব্যাখ্যা করা যায়। কোনো কিছু যদি সেটাই করার দাবি করে, তাহলে সেটিকে সন্দেহ করা উচিত।
আমরা চিকিৎসাবিষয়ক জ্ঞান কোথা থেকে নিচ্ছি, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সব তথ্যসূত্রের গুরুত্ব এক নয়। পিয়ার-রিভিউড গবেষণা, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এবং প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান তো আর কোনো কারণ ছাড়া গড়ে ওঠেনি। এগুলো তৈরি হয়েছে যাচাই, সংশোধন এবং দায়বদ্ধতার কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে।
অনলাইনে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য যেভাবে বদলে যাচ্ছে, তাতে শিক্ষা আর বিনোদনের সীমারেখা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। যখন কোনো কার্টুন সবজি ৩০ সেকেন্ডে বিশ্বাসযোগ্যভাবে আপনার কোলন ‘পরিষ্কার’ করে ফেলতে পারে, আর সেটি বাস্তব শরীরবিজ্ঞানের চেয়েও বেশি বোধগম্য মনে হয়, তখন আমরা আর শুধু ভুল তথ্যের মুখোমুখি নই। আমরা এমন এক পরিবর্তনের মুখোমুখি, যেখানে মানুষের নিজের শরীরকে বোঝার ধরনটাই বদলে যাচ্ছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান কোনো ভিজ্যুয়াল রূপক বা সহজ সমাধানের তালিকা নয়। এটি এমন একটি শাস্ত্র, যেখানে বিভিন্ন লক্ষণ ও প্যাটার্নকে ব্যাখ্যা করা হয় প্রমাণ, সম্ভাবনা এবং চিকিৎসকদের ক্লিনিক্যাল বিচারবোধের মাধ্যমে—নিশ্চয়তা বা শর্টকাট দিয়ে নয়। যত বেশি আমরা এই জটিলতাকে অ্যালগরিদম–বান্ধব সরলতায় বদলে ফেলছি, তত বেশি আমরা স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রকৃত বোঝাপড়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।
আহনাফ তাহমীদ পূর্ণা: সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী


