আজকের সময়ে মৃণাল সেন কেন দরকার?
স্বাধীনতা-পরবর্তী কলকাতা মানেই কানে বাজে ‘উত্তাল কলকাতা’ শব্দটি। ছাত্র আন্দোলন, উদ্বাস্তু সংকট, খাদ্য আন্দোলন ও ষাটের দশকের শেষের দিকে নকশালবাড়ী আন্দোলনের অভিঘাত—সবমিলিয়ে কলকাতা পরিণত হয়েছিল এক রাজনৈতিক অগ্নিগর্ভে। দেয়ালে দেয়ালে স্লোগান, রাস্তায় মানুষের মিছিল, পুলিশের দমন-পীড়ন, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের আর্তনাদ কলকাতাকে একইসঙ্গে বিদ্রোহী এবং অস্থির করে তোলে।
সেসব দৃশ্য নিয়মিত উঠে এসেছে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের চলচ্চিত্রে। তবে মৃণাল সেন যেন কলকাতার এই অগ্নিরূপকে একটু বেশি ভালোবেসেছিলেন। আর তাই দর্শকের আত্মতুষ্টিকে আঘাত করে নির্মাণ করেছিলেন একের পর এক কলকাতা-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক সিনেমা।
চলচ্চিত্রের ভূমিকা শুধু বিনোদন দেওয়া নয়। চলচ্চিত্র সময়কে ধরে রাখে, জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে, চিন্তার খোরাক দেয় এবং তথ্য ও বিনোদনের সংমিশ্রণ ঘটায়। এই সব উপাত্তই পাওয়া যেত দ্রোহী চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনের গল্পে, নির্মাণে, পরিচালনায়। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মৃণাল সেন কলকাতার সেই উত্তাল স্থবিরতাকে শৈল্পিক রূপ দিয়েছিলেন। ক্যামেরাকে ব্যবহার করেছিলেন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। মৃণাল সেনের শিল্পবোধকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি ১৪ মে তার ১০৩তম জন্মদিনে।
বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম মৃণালের। দেশভাগের পর পরিবারসমেত পাড়ি দেন কলকাতায়। এরপর ধীরে ধীরে মজ্জায় ঢুকে যায় কলকাতার রূপ, রস, গন্ধ। কলকাতা তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এছাড়াও, ছোট থেকেই দাদা, মা ও বাবা উকিল দীনেশ সেনের মারফতে দেখে এসেছেন লড়াই, বিদ্রোহ, বাম রাজনীতি। বড় বড় নেতা, লেখক, কবি সাংবাদিকদের বাড়িতে আনাগোনা ছিল নিত্ত-নৈমিত্তিক। এ সবকিছুই তাকে সমৃদ্ধ করেছে। এর সবটাই তার সিনেমায় প্রতিফলিত হয়েছে।
সিনেমা বানানোয় যখন হাত দিলেন, তখন ভেঙে দিলেন চলচ্চিত্রের চর্চিত সব রীতিকে। গতানুগতিক ধারার বাইরে ব্রেখটের এপিক থিয়েটারের প্রধান পদ্ধতি ডিস্ট্যান্সিয়েশন বা এলিয়েনেশন এফেক্ট, ডিরেক্ট অডিয়েন্স অ্যাড্রেস, ট্যাবলো এফেক্ট, ফ্রিজ ফ্রেম, জেস্টাস ইত্যাদি ব্রেখটিও চলচ্চিত্রের একাধিক বৈশিষ্ট্য তার সিনেমার নির্মাণশৈলীতে দেখা যায়। তিনি এসব পদ্ধতি এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যেন দর্শক গল্পে বুঁদ না হয়ে বরং সজাগ থাকে, সচেতন থাকে এবং দ্বিধায় পড়ে।
তথাকথিত রোমাঞ্চ নয়, তার ছবিতে ঠাঁই পেতো দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রাম, শোষণের রাজনীতি, মধ্যবিত্তের হতাশা, ভদ্রলোকের সংকট আর শহুরে বিচ্ছিন্নতা। আলাদা কোনো বিশেষ চরিত্র নয়, কলকাতা শহরটিই জীবন্ত চরিত্র হিসেবে উঠে আসে মৃণালের অধিকাংশ রাজনৈতিক চলচ্চিত্রে।
মৃণাল সেনের বিখ্যাত কলকাতা ত্রয়ী—ইন্টারভিউ (১৯৭০), কলকাতা ৭১ (১৯৭২) ও পদাতিক (১৯৭৩) সিনেমায় ভিন্ন ভিন্ন তিনটি বাস্তবতা উঠে এসেছে। ইন্টারভিউ চলচ্চিত্রে স্কটিশ কোম্পানিতে চাকরির সাক্ষাৎকারকে ঘিরে স্যুট-টাইয়ের বন্দোবস্ত করতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক মানসিকতা এবং মধ্যবিত্তের সংশয় দেখানো হয়েছে। কলকাতা ৭১ সিনেমায় কলকাতার সেই সময়ের কঠিনতম রূপ, ক্ষুধা, দারিদ্র ও শ্রেণি বৈষম্যের শহর হিসেবে ফুটে ওঠে, বিভিন্ন সময়ের গল্প একসঙ্গে সামাজিক সংকটকে তুলে ধরে। পদাতিক চলচ্চিত্রে ছিল নকশালবাদী নেতার পালিয়ে বেড়ানো, মায়ের মৃত্যু, আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে বিপ্লবী রাজনীতির টানাপড়েন। প্রতিটি গল্প সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে দেখানো হয়েছে। প্রতিটি চরিত্র আজও উজ্জ্বল, আজকের শহুরে বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায় যেন।
মৃণালের ‘কোরাস’ (১৯৭৪) সিনেমাটি আজ ঠিক ততটাই প্রাসঙ্গিক যতটা ছিল সেই চুয়াত্তরে। সাট্যায়ারধর্মী এই সিনেমায় আছে বেকারত্বের হতাশা, তরুণ-তরুণীর হাহাকার, হাজারো শ্রমজীবী মানুষের মিছিল—দরকার একটা চাকরি। একটি গোষ্ঠী শোষণ করে চাকরির বাজার অশান্ত করে রেখেছে—এর একমাত্র পথ এখন বিদ্রোহ।
‘এক দিন প্রতিদিন’ কিংবা ‘এক দিন আচানক’ সমাজে মধ্যবিত্ত পরিবারের অসহায়ত্ব নিয়ে বিভ্রম তৈরি করে। একজন চাকরিজীবী নারীর এক রাত ফিরে না আসা কিংবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের তার ছাত্রীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের গুঞ্জন—পরিবারকে চিন্তাগ্রস্ত করে তোলে। তার মধ্য দিয়ে উঠে আসে মধ্যবিত্তের আত্মসম্মান রক্ষার সংগ্রাম।
এক বড়িতে গাদাগাদি করে থাকা, ধনীদের অহংকার এবং কয়লার চুলোর ধোঁয়ায় পার করা নারীদের দৈনন্দিন জীবনকে স্বাভাবিকরণ করে নিম্নবিত্ত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা কীভাবে রোমান্টিসাইজ করা হয়, তা দেখা যায়—‘চালচিত্র’ সিনেমায়।
মৃণাল সেনের একাধিক সিনেমা ছিল আত্মসমালোচনামূলক। যেমন: ‘আকালের সন্ধানে’ (১৯৮০) ’৪৩-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করতে এসে বিবেকের কাছে পরাজিত হয় কলাকুশলী। কারণ সামনেই আকালে নারীর অসহায় মুখ, বয়স্ক ও শিশুর জরাজীর্ণ দেহ, ঘরে ঘরে আকালের দৃশ্য। কিংবা ‘খারিজ’ (১৯৮২) সিনেমায় দরিদ্র চাকরের আচমকা মৃত্যু, ন্যায়বিচারের আশা, পরিবারের সদস্যদের বিবেকের দংশন সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত করে তোলে। এই সিনেমাগুলোর মাধ্যমে কলকাতার ভদ্রলোক সমাজের মধ্যকার সংকট ও ‘ভণ্ডামি’কে প্রশ্ন করেছেন মৃণাল।
এছাড়াও ভুবন সোম, মহাপৃথিবী, পুনশ্চ খান্দার, আকাশ কুসুম, জেনেসিস তার অনবদ্য সৃষ্টি। জীবদ্দশায় মোট ৩১টি সিনেমা উপহার দিয়েছেন মৃণাল তার দর্শকদের। সিনেমাগুলো জায়গা করে নিয়েছে মানুষের অন্তরস্থলে, বাংলা চলচ্চিত্রকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্মান।
আশ্চর্য হলেও সত্য যে, কয়েক দশক বাদেও আজকের পৃথিবীতেও এই প্রশ্নগুলো অচেনা লাগে না। বরং এই সময়ে মৃণাল সেন যেন আরও বেশি প্রয়োজন। বর্তমান সময়েও একই পরিস্থিতি বিরাজমান। যেমন যুদ্ধ চলছে, আছে আকালের সম্ভাবনা, এমনকি কোথাও কোথাও আকাল দেখা দিয়েছে, ধনী-গরিবের বৈষম্য আছে, দুর্বলের ওপর সবলের শোষণ আছে, পুঁজিপতিদের আগ্রাসন তীব্র হচ্ছে, শিক্ষিত যুবদের বেকারত্বের হতাশা ঘরে ঘরে, মধ্যবিত্তের আত্মরক্ষার ভাবনা এখনো তুঙ্গে।
কিন্তু এসব কি আমাদের ভাবাচ্ছে?
দুনিয়া মেতে আছে কনটেন্টে। আমরা দ্রুতই বিনোদিত হই, দ্রুতই ভুলে যাই। অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দনীয় কনটেন্ট দেখাচ্ছে। ফলে আমরা অস্বস্তিকর এবং প্রশ্নবিদ্ধ বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি, জেনে বুঝেও উপলব্ধি করছি না সত্যকে। কোনো বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে, প্রতিক্রিয়া জানালেও আমরা প্রশ্ন করতে ভুলে যাচ্ছি। এখানেই মৃণাল সেন তার শিল্পের মাধ্যমে ধাক্কা দিতে পেরেছিলেন। তার চলচ্চিত্র দর্শককে স্বস্তি দিত না, তিনি দর্শককে অস্বস্তির মধ্যে ফেলতেন, ভাবতে বাধ্য করতেন, তার বিবেককে প্রশ্ন করতেন, পরাজিত করতেন।
বর্তমানের তরুণ নির্মাতাদের জন্য মৃণাল সেন গুরুত্বপূর্ণ। তারা চাকচিক্য ও প্রচারণার ভিড়ে গল্পকে হালকাভাবে তুলে ধরছে। সকলে স্রোতে গা ভাসিয়ে যাচ্ছে, সাংঘর্ষিক যেকোনো কিছুকে এড়িয়ে যাচ্ছে। মতাদর্শ ও বাস্তব যে সাংঘর্ষিক হতে পারে, তা মৃণাল দেখিয়েছেন। একজন চলচ্চিত্রকারের দায়িত্ব শুধু সিনেমা নির্মাণে থেমে নেই, সিনেমার গঠন, গণমানুষের সিনেমা নির্মাণে রয়েছে। চোখে আঙুল দিয়ে সমস্যাকে দেখাতে হবে, সিস্টেমকে প্রশ্ন করতে হবে। ঠিক যেমনটি করে গেছেন অবিভক্ত বাংলার মৃণাল সেন।
