ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

ধারাবাহিক সাফল্যের কারণেই বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে এত বিতর্ক?

সামসুল আরেফীন খান

২০২১ সালের ১১ জুলাই। ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে ২৮ বছরের শিরোপা-খরা ঘোচায় আর্জেন্টিনা।

সেই রাতই লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় আক্ষেপের অবসান ঘটায়। ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য সাফল্য অর্জন করলেও জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো শিরোপা জিততে না পারায় বছরের পর বছর সমালোচিত হয়েছেন তিনি। 

২০১৪ থেকে ২০১৬- তিন বছরে টানা তিনটি বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে হেরে ‘সিরিয়াল ফাইনালিস্ট’ তকমা পাওয়া আর্জেন্টিনার জন্য সেই জয় ছিল নতুন এক যুগের সূচনা। এরপর একে একে ২০২২ সালে ফিনালিসিমা, একই বছর কাতার বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে লিওনেল স্কালোনির দল। চলমান বিশ্বকাপেও তারা জায়গা করে নিয়েছে কোয়ার্টার ফাইনালে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে সফল জাতীয় দলগুলোর একটি হয়ে ওঠার পরও আর্জেন্টিনা যতটা না প্রশংসিত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে। তাদের প্রতিটি সাফল্য সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে ভাসিয়েছে, আবার অনেকের দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধও হয়েছে। ফলে স্কালোনির দল বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত দল হওয়ার পাশাপাশি অনেকের মধ্যে মতের বিভক্তিও সৃষ্টি করেছে। 

স্কালোনির অধীনে অবিশ্বাস্য সাফল্য 

আন্তর্জাতিক ফুটবলে সাম্প্রতিক সময়ে খুব কম দলই আর্জেন্টিনার মতো ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে। কাতার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে সবাইকে অবাক করে দিয়ে সৌদি আরবের কাছে হারার আগে ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত ছিল আর্জেন্টিনা। কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমা তো জিতেছিলই, পাশাপাশি কোনো ম্যাচ না হেরে দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বও শেষ করেছিল আলবিসেলেস্তেরা। 

সৌদির কাছে সেই পরাজয় আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ স্বপ্নকে লাইনচ্যুত করে দিতে পারত। উল্টো সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিশ্বকাপ ফাইনাল জিতে নেয় আর্জেন্টিনা।

বিশ্বকাপ জয়ের পরও থেমে থাকেনি তাদের সাফল্যের ধারা। ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপা ধরে রাখার পাশাপাশি দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের পয়েন্ট তালিকাতেও শীর্ষে অবস্থান ধরে রাখে দলটি। ২০১৮ সালে স্কালোনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আর্জেন্টিনা খেলেছে ১০১টি ম্যাচ। এর মধ্যে ৭৮টিতেই জয় পেয়েছে দলটি, আর হার মাত্র ৯টিতে—যা বর্তমান আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাদের আধিপত্যেরই প্রতিফলন। 

আধুনিক যুগের সেরা আন্তর্জাতিক দলগুলোর মধ্যে একটি আর্জেন্টিনা?

গত তিন দশকে আন্তর্জাতিক ফুটবল বেশ কয়েকটি আধিপত্য বিস্তারকারী দলের দেখা পেয়েছে। ১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপ এবং ২০০০ সালে ইউরো জিতে নিজেদের স্বর্ণযুগ গড়ে তুলেছিল ফ্রান্স। এরপর ২০০২ বিশ্বকাপের পাশাপাশি ২০০৪ ও ২০০৭ সালের কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করে ব্রাজিল।

২০০৮ ইউরো, ২০১০ বিশ্বকাপ এবং ২০১২ ইউরো—টানা তিনটি বড় টুর্নামেন্ট জিতে স্পেন তর্কযোগ্যভাবে এই শতাব্দীর সবচেয়ে আধিপত্য বিস্তারকারী দলটির জন্ম দিয়েছে। এরপর ২০১৮ বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে আবারও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ফ্রান্স। 

এই কিংবদন্তি দলগুলোর সাথে এক কাতারেই উচ্চারিত হচ্ছে আর্জেন্টিনার নাম। স্কালোনির অধীনে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতে আলবিসেলেস্তেরা নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা জাতীয় দলগুলোর তালিকায়। আর যদি তারা ২০২৬ বিশ্বকাপও জিতে নিতে পারে, তাহলে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা জাতীয় দলগুলোর আলোচনায় নিজেদের জায়গাটা আরও শক্ত করবে আর্জেন্টিনা।

মেসির লিগ্যাসি 

ক্যারিয়ারের বড় একটি সময়জুড়ে লিওনেল মেসিকে শুনতে হয়েছে একটিই সমালোচনা-বার্সেলোনার জার্সিতে যে সাফল্য তিনি পেয়েছেন, জাতীয় দলের হয়ে তার প্রতিফলন নেই। মেসি ফুটবলের সর্বকালের সেরাদের ছোট্ট তালিকায় জায়গা পাবেন কি না এটি নিয়ে যারা সংশয় প্রকাশ করতো, তাদের কাছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল এই যুক্তিই।  

কিন্তু ধীরে ধীরে এই সংশয় মুখ থুবড়ে পড়েছে। কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ- আন্তর্জাতিক ফুটবলে সম্ভাব্য প্রায় সব বড় শিরোপাই এখন মেসির দখলে। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি আর্জেন্টিনা দলের প্রাণভোমরা। বিশ্বকাপে গোল ও অ্যাসিস্টের একাধিক রেকর্ড নিজের নামে লিখিয়েছেন, আর বড় ম্যাচগুলোতেও নিয়মিত পার্থক্য গড়ে দিচ্ছেন নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে। 

তবে এসবের বাইরে মেসি তাঁর আর্জেন্টিনা সতীর্থদের থেকে যে সম্মান ও ভালোবাসা পান, আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার নজির খুব কমই দেখা গেছে। মাঠে অনেক সময় তার সতীর্থদের দেখে মনে হয়, অধিনায়কের জন্য তারা যেন সর্বস্ব উজাড় করে দিতেও প্রস্তুত। অন্য কোনো তারকাকে ঘিরে এমন নিঃস্বার্থ নিবেদন আন্তর্জাতিক ফুটবলে খুব কমই দেখা গেছে।

যদিও মেসি, দিয়েগো ম্যারাডোনা, পেলে কিংবা রোনালদোকে ঘিরে ‘সর্বকালের সেরা’ বিতর্ক হয়তো কখনোই শেষ হবে না, তবু অনেকের বিশ্বাস, আর্জেন্টিনার জার্সিতে গত কয়েক বছরে মেসি যা কিছু অর্জন করেছেন, তাতে তাঁর সর্বকালের সেরা ফুটবলার তকমা পাওয়ার দাবি আরও শক্তিশালীই হয়েছে। 

সাফল্যের সঙ্গে কেন বাড়ছে সমালোচনাও?

সত্যিটা হলো, আর্জেন্টিনার সাফল্যই তাদেরকে সমালোচনার অন্যতম বড় লক্ষ্য বানিয়ে তুলেছে। 

একসময় আন্তর্জাতিক ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করা ব্রাজিল এখন নিজেদের হারিয়ে খুঁজছে। অন্যদিকে রোনালদোর পর্তুগালও টানা কয়েকটি বিশ্বকাপে প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ। ফলে বর্তমান সময়ে আর্জেন্টিনাই হয়ে উঠেছে সেই দল, যাদের সবাই হারাতে চায়। 

সাফল্যের সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই সমালোচনাও ধেয়ে আসে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্জেন্টিনার ধারাবাহিক সাফল্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্বও। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে রেফারিদের সিদ্ধান্তগুলোকে কেন্দ্র করে।

চলমান বিশ্বকাপেই আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে একটি কঠিন ট্যাকলের পরও মেসি কোনো কার্ড না পাওয়ায় প্রথম প্রশ্ন ওঠে। এরপর মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার নাটকীয় জয়ের ম্যাচেও রেফারির দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয় তুমুল আলোচনা। ম্যাচ শেষে মিশরের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ প্রকাশ্যেই রেফারিংয়ের সমালোচনা করেন। এমনকি কেউ কেউ টুর্নামেন্টের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

তবে এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে ফিফার রেফারিং বিভাগ। তাদের দাবি, ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারিরা ফুটবলের প্রচলিত আইন যথাযথভাবেই প্রয়োগ করেছেন।

তবু এসব বিতর্কের জেরে ফুটবল সমর্থকদের একটি অংশের মধ্যে এমন ধারণা আরও জোরালো হয়েছে যে, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে আর্জেন্টিনা সুবিধা পায়। যদিও এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য বা প্রমাণিত তথ্য সামনে আসেনি।

অতীতের বিতর্কে বেড়েছে সন্দেহ

আর্জেন্টিনাকে ঘিরে বর্তমানের নানা বিতর্কের পেছনে ইতিহাসেরও বড় ভূমিকা আছে। 

দেশটির প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা আসে ১৯৭৮ সালে। তবে সেই সাফল্য আজও পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত নয়। সে সময় জেনারেল হোর্হে রাফায়েল ভিদেলার সামরিক শাসনের অধীনে আয়োজিত বিশ্বকাপকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছিল। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে কখনোই অকাট্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

১৯৮৬ বিশ্বকাপ মানেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিতর্কিত সেই ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল। গোলটি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি। অবশ্য একই ম্যাচে কয়েকজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে করা তার অবিশ্বাস্য একক গোলটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবেও স্বীকৃত।

সাম্প্রতিক সময়েও বিতর্ক পুরোপুরি পিছু ছাড়েনি আর্জেন্টিনার। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তারা পেয়েছিল পাঁচটি পেনাল্টি—যা এক আসরে কোনো দলের পাওয়া সর্বোচ্চ পেনাল্টির রেকর্ড। এরপর থেকেই সমালোচকদের একাংশ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, তবে কি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে আর্জেন্টিনা রেফারিদের থেকে অতিরিক্ত সুবিধা পেয়েছিল? আর্জেন্টিনা ভক্তরা অবশ্য শক্তভাবে দাবি করেন যে প্রতিটি পেনাল্টির সিদ্ধান্তই ভিএআর দিয়ে পরীক্ষা করে নিয়ম অনুযায়ীই দেয়া হয়েছিল, ফলে এখানে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। 

সাফল্য যত বড়, বিরূপ প্রতিক্রিয়াও তত বেশি

ন্যায়সঙ্গত হোক বা না-ই হোক, আর্জেন্টিনাকে ঘিরে আজ যে বিতর্ক তা তাদের সাফল্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বেড়েছে। দলটির প্রতিটি অর্জন যেমন প্রশংসিত হয়, তেমনি তা খুঁটিয়ে বিশ্লেষণও করা হয়। 

আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মতে, এই সমালোচনার বড় কারণ হলো দীর্ঘ সময় ধরে সাফল্যের শীর্ষে থাকা। আর সমালোচকদের মতে, রেফারিং-সংক্রান্ত বিতর্ক এবং কিছু প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত বারবার সামনে আসায় এসব আলোচনা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। 

সম্ভবত বাস্তবতা এই দুই অবস্থানের মাঝামাঝি কোথাওই হবে। 

কারণ গত পাঁচ বছরে আর্জেন্টিনার সাফল্যকে কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু রেফারিং সিদ্ধান্ত দিয়ে মাপা যায় না। লিওনেল স্কালোনির অধীনে দলটির ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলা, শক্তিশালী রক্ষণভাগ এবং চাপের মুহূর্তে সেরা ফুটবল উপহার দেওয়ার সক্ষমতা তাদের এই প্রজন্মের অন্যতম সেরা আন্তর্জাতিক দলে পরিণত করেছে।

কেউ পছন্দ করুক বা না করুক, মেসি এবং আর্জেন্টিনা এখন এমন জায়গায় পৌঁছে গেছে, যেখানে তাদেরকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত তাদের লিগ্যাসি নির্ধারণ করবে ইতিহাস। আর ইতিহাস সাধারণত বিতর্কের চেয়ে চ্যাম্পিয়নদেরই বেশি মনে রাখে।