১০০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত, হরমুজে হামলা বন্ধে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের আল্টিমেটাম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দেওয়ার পর আজ শনিবার এই চুক্তির শর্ত মেনে চলার দাবি করেছে তেহরান।
তবে ইরান তাকে হত্যার চেষ্টা করলে দেশটির ওপর ‘হাজারো ক্ষেপণাস্ত্র’ নিক্ষেপ এবং ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।
এএফপি বলছে, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পর দুই দেশের সম্পর্কের উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর ফলে যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী শান্তিতে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে হওয়া সমঝোতা হুমকির মুখে পড়েছে। একইসঙ্গে অঞ্চলটিতে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শনিবার নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান সরকার তাকে হত্যা বা হত্যার চেষ্টা করলে দেশটির বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক হামলা চালানো হবে।’
তিনি বলেন, ‘ইরানকে লক্ষ্য করে এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর পরপরই আরও হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হবে।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘ইরানের সব এলাকা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রস্তুত, ইচ্ছুক ও সক্ষম। এ-সংক্রান্ত নির্দেশ ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে এবং তা এক বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। প্রয়োজনে এর মেয়াদ বাড়ানো হবে।’
এর একদিন আগে ইরানের সঙ্গে আরও আলোচনায় সম্মত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে। অথচ মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল ওয়াশিংটন ও তেহরান।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আমাদের আলোচনা চালিয়ে যেতে বলেছে। আমরা এতে সম্মত হয়েছি। তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শেষ।’
এর আগে চলতি সপ্তাহে ন্যাটো সম্মেলনেও যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ইরান সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘তাদের সঙ্গে আলোচনা করা সময়ের অপচয়।’
‘ইরান কথা রেখেছে’
আল জাজিরা জানিয়েছে, ট্রাম্পের বক্তব্যের পাল্টা জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেন, তেহরান এখন পর্যন্ত সমঝোতার শর্ত মেনে চলেছে। বরং যুক্তরাষ্ট্রই সমঝোতা স্মারকের শর্ত লঙ্ঘন করছে।
শনিবার তিনি বলেন, ‘ইরান এখন পর্যন্ত তার কথা রেখেছে। অথচ তথাকথিত মার্কিন অর্থমন্ত্রী সমঝোতা স্মারকের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদের শর্ত লঙ্ঘন করছেন।’
সমঝোতা স্মারকের ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না এবং মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করবে না।
আরাগচি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের আগের অন্যান্য শর্ত লঙ্ঘন ও ভুল পদক্ষেপের পর নতুন করে এই লঙ্ঘন ঘটেছে। বাস্তবতা হলো, উভয় পক্ষকেই সমানভাবে শর্ত মানতে হবে।’
সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা এক দফা সরাসরি বৈঠক করেছেন। কাতারে হয়েছে পরোক্ষ আলোচনা। তবে গত মাসের পর দুই দেশের মধ্যে আর কোনো সরাসরি আলোচনা হয়নি এবং কূটনৈতিক অগ্রগতিরও কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
হরমুজ নিয়ে ইরানকে আল্টিমেটাম
এদিকে অ্যাক্সিওস ও পলিটিকোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ এবং নৌপথটি উন্মুক্ত থাকার বিষয়টি স্বীকার করতে ইরানকে শনিবার পর্যন্ত সময় দিয়েছে ওয়াশিংটন।
বিশ্বের তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধের অন্যতম কেন্দ্র।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় কৌশলগত এ নৌপথ কার্যত বন্ধ করে দেয় তেহরান।
ইরানের দাবি, ওমানের আঞ্চলিক জলসীমা নিয়ে গঠিত হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। এ পথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ফি আদায়ের আগ্রহও প্রকাশ করেছে তেহরান।
তবে যুদ্ধের আগে ইরানের এমন ক্ষমতা ছিল না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, ইরান ও ওমান সাধারণভাবে এ নৌপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ বা জাহাজের কাছ থেকে টোল আদায় করতে পারে না।
চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার পর ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায় তেহরান।
একইসঙ্গে ইরানি তেলের ওপর দেওয়া সাময়িক নিষেধাজ্ঞা ছাড় প্রত্যাহার করেছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়। জুনে দেওয়া ওই ছাড়ের আওতায় আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানকে অপরিশোধিত তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনার জন্য শনিবার ওমান সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির।
মধ্যস্থতার চেষ্টা কাতার ও পাকিস্তানের
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই উত্তেজনার মধ্যেই মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কাতার। ইরানের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের পাল্টাপাল্টি হামলার পর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতারের ভূমিকা জোরদার করতে দেশটির একটি প্রতিনিধিদল তেহরানে গেছে।
মঙ্গলবার কাতারের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) ট্যাংকারে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে দোহা। হামলাটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেও নিন্দা জানায় কাতার। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে তেহরান।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও শুক্রবার কাতারের আমিরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। এসময় তারা সাম্প্রতিক উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গেও কথা বলেছেন শাহবাজ। এসময় তিনি ‘কষ্টার্জিত শান্তি’ রক্ষার আহ্বান জানান।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ কঠোর অবস্থান বজায় রাখার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের অবসান বিশ্বের দেশগুলোর অগ্রাধিকার। তবে সবাইকে বুঝতে হবে, ইরানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে এই সংঘাত কখনও শেষ হবে না।’
ইরানিরা নিজেদের রক্ষায় ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’ বলেও জানান তিনি।
ইরানের গবেষণা অবকাঠামোয় ৩০ কোটি ডলারের ক্ষতি
এদিকে চলমান যুদ্ধে ইরানের গবেষণা অবকাঠামোর প্রায় ৩০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিবিষয়ক প্রেসিডেন্টের ডেপুটি হোসেইন আফশিন।
তিনি বলেন, ‘দেশে এমন সব উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছিল, যেগুলোর কোনো সামরিক ব্যবহার ছিল না। শত্রুরা ইরানের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তবে এসব অবকাঠামো আরও শক্তিশালীভাবে পুনর্নির্মাণ করা হবে।’
হোসেইন আফশিন আরও বলেন, ‘আমরা বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হয়ে উঠতে চাই। কারণ, এ খাতে বিনিয়োগকারী দেশই সফল হবে।’
মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলসেতু চালু
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের গোলেস্তান প্রদেশের আক্কালা কাউন্টির সেই রেলসেতু আবার চালু করা হয়েছে।
গোলেস্তানের গভর্নর আলী-আসগর তাহমাসবি বলেন, হামলার ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে সেতুটি পুনরায় চালু করা ‘শত্রুদের হুমকি ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রদেশের বাস্তব জবাব।’
এর আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, বুধবার ভোরে আক্কালার কাছে একটি রেলসেতুতে হামলা চালানো হয়। এতে গোরগান–ইনচেহ বোরুন রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রেলপথটি তুর্কমেনিস্তান ও মধ্য এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইরানের উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে লেবাননে মার্কিন সামরিক দল
এদিকে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত বন্ধে হওয়া কাঠামোগত চুক্তি বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য লেবাননে একটি সামরিক প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
লেবাননের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানান, আগামী সপ্তাহে ইতালির রাজধানী রোমে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে কারিগরি আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ওই আলোচনার আগে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রতিনিধিরা বৈরুতে পৌঁছেছেন।
গত ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তি হয়। এতে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র লেবাননে সেন্টকম প্রতিনিধিদলের উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ওই মুখপাত্র বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নে ইসরায়েল ও লেবাননের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে সেন্টকম। দুই দেশ এখন চুক্তির ‘বাস্তবায়ন পর্যায়ে’ পৌঁছেছে।
চুক্তির আওতায় ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের জন্য নির্ধারিত প্রথম পরীক্ষামূলক অঞ্চলে কয়েক দিনের মধ্যেই কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন থেকে সাউন্ড বোমা নিক্ষেপ
দক্ষিণ লেবাননের একটি পৌরসভা লক্ষ্য করে সাউন্ড বোমা নিক্ষেপ করেছে ইসরায়েলের একটি ড্রোন।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ লেবাননের টায়ার জেলার আল-মানসুরি পৌরসভায় ইসরায়েলি ড্রোন থেকে সাউন্ড বোমাটি নিক্ষেপ করা হয়।
তবে এ ঘটনায় হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।