শুভ জন্মদিন, মেসি: মহাকালের মঞ্চে এক চিরতরুণ জাদুকর
অভিজাত অ্যাথলেটদের জন্য ২৭ বছর বয়সটা হলো একেবারে চূড়ান্ত সময়—শারীরিক সক্ষমতা আর রণকৌশলের এক নিখুঁত মেলবন্ধন। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি ২০১৪ সালে এই মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন, অথচ সেই বছরটাই শেষ হয়েছিল ফাইনালের শেষ মুহূর্তে এসে একটি বিশ্বকাপ হারার চরম ক্ষত নিয়ে।
অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে ৩০-এর কোঠায় পা রাখা মানেই হলো খেই হারিয়ে ফেলা, কমে আসা গতি আর শারীরিক ক্ষয়ের কাছে ধীরে ধীরে আত্মসমর্পণ।
তবে এখন মেসির দিকে তাকালে এক গভীর রূপান্তর চোখে পড়ে। বিখ্যাত লেখক জে আর আর টলকিনের উপন্যাসের মতো তারও এক জাদুকরি বিবর্তন ঘটেছে; তিনি যেন ‘ধূসর গ্যান্ডালফ’ থেকে রূপ নিয়েছেন ‘শ্বেত গ্যান্ডালফে’।
২০২২ সালের আগের মেসি ছিলেন সেই ধূসর পরিব্রাজকের মতো—এক ক্লান্ত যোদ্ধা, যিনি কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন দেশের ইতিহাসের পর্বতসম বোঝা। ট্রফি না জিতলে ক্যারিয়ারই অপূর্ণ থেকে যাবে—এমন ঘোরতর মানসিক চাপ আর ফুটবল বোর্ডের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের মতো সব ভয়ঙ্কর দানবদের সঙ্গে তাকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছিল।
অথচ কাতারে তিনি যেন সেই খাদের কিনারা থেকে সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে ফিরে এলেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা অবর্ণনীয় চাপের জীর্ণ আলখাল্লাটা পেছনে ফেলে এলেন, আর তার মাঝে ফুটে উঠল এক দীপ্তিময়, ভারমুক্ত বিশুদ্ধতা।
জীবনে আকস্মিক ওলটপালট অনেক সময় একঘেয়ে চক্র ভাঙার জন্য খুব প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। বার্সেলোনা যখন তার সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করল না, তখন একে স্বর্গ থেকে বিদায়ের মতো মনে হয়েছিল। কিন্তু পেছন ফিরে তাকালে বোঝা যায়, সেটি আসলে এক আশীর্বাদ ছিল।
স্প্যানিশ ক্লাবের সেই ক্লান্তিকর ও অতি-তীব্র ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেয়ে প্যারিস আর মিয়ামিতে তার কাটানো পরের অধ্যায়গুলো শরীর ও মনকে সতেজ রাখার সুযোগ করে দেয়। তিনি যেন নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পেলেন, বিশেষভাবে আলবিসেলেস্তেদের জন্য। আর এই সময়টাতেই কোচ লিওনেল স্কালোনি তার জন্য তৈরি করেছিলেন এক শান্তির নীড়।
ক্যারিয়ারের এই শেষভাগে মেসির পরিসংখ্যান সাধারণ ক্রীড়াযুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখায়; তার ১৮টি বিশ্বকাপ গোলের মধ্যে বিস্ময়করভাবে ১২টিই এসেছে ৩৫ বছর পার হওয়ার পর। এটি আসলে খেলাটার প্রতি তার নিখুঁত ভাবনার এক নির্যাস।
চলমান বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষ কোচ রাল্ফ রাংনিক বলেছিলেন, মেসি মাঠে কেবল ‘হাঁটেন’, অফসাইড পজিশনে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং কাউন্টার-প্রেসিংয়ের সময় রক্ষণভাগে কোনো সাহায্য করেন না। আর গতকালের চিত্রনাট্যটি ছিল ভীষণ মানবিক। তিনি একটা পেনাল্টি মিস করলেন; নিজের এই সাধারণ ভুলের পর চেনা এক তীব্র ক্ষোভ ফুটে ওঠে তার চোখেমুখে।
কিন্তু ৯৫ মিনিটের মাথায় এই জাদুকর তার বা পায়ের দুটি চিরচেনা ঝলকানিতে সব হতাশা দূর করে দেন এবং টুর্নামেন্টের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ওঠেন। নিজেকে নতুনভাবে চেনাবার জন্য পুরনো খোলস প্রতিনিয়ত ঝেড়ে ফেলা এই মানুষটি যেন নিজের জন্মদিন উপলক্ষে নিজেকেই এক আগাম উপহার দিলেন।
রাংনিকের কৌশল ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ মাঠে মেসির ওই নিশ্চলতা আসলে ছিল শিকারীসুলভ।
প্রাচ্যের এক চিরন্তন দর্শন বলে, ‘তুমি যদি কেবল তোমার শরীর দিয়ে কাজ করো, তবে তোমার ক্ষমতা থাকবে সীমাবদ্ধ। কিন্তু তুমি যদি তোমার সচেতনতা বা বোধশক্তি দিয়ে কাজ করো, তবে তোমার উপস্থিতিটাই সম্পূর্ণ বদলে যাবে।’
মেসি তার তরুণ বয়সের সেই অতি-মানবিক গতিকে বিদায় জানিয়ে এখন মাঠের পরিস্থিতি বোঝার এক অনন্য ক্ষমতা অর্জন করেছেন। তার শৈশবের আদর্শ এবং স্কালোনির সহকারী পাবলো আইমার একবার চমৎকার করে বলেছিলেন, ‘সবশেষ মেসি-ই সবসময় সেরা মেসি।’ সমালোচকেরা একসময় যেটিকে অলসতা বলে ভুল ব্যাখ্যা করতেন, সেটি আসলে খেলাটার ওপর তার নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ। তিনি মাঠে হাঁটেন, কারণ তিনি সবার আগে সবকিছু দেখতে পান; আর ঠিক যে ক্ষুদ্রতম মুহূর্তে ম্যাজিকটা দরকার, সেটির জন্যই তিনি নিজের শক্তি জমিয়ে রাখেন।
২০০৭ সালের ডিসেম্বরে তার মা সেলিয়া মেসির শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘আমরা যখন তাস খেলতাম, তখন কেউ তার সঙ্গে খেলতে চাইত না। কারণ আমরা জানতাম যে আজ হোক বা কাল, ও ঠিকই চালবাজি করবে... বন্ধুদের মাঝে ও ছিল এক রাজপুত্রের মতো; বল পায়ে তার দক্ষতার কারণেই ও সবার নেতা বনে গিয়েছিল। ও ছিল অনন্য।’
কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই দুষ্টু রাজপুত্র আজও রয়ে গেছেন। বল পায়ে ও যখন মাঠে থাকে, তখন একটা শিশুর মতোই নিখাদ আর গভীর মনোযোগ নিয়ে খেলে; যা বর্তমানের এই অতি-যান্ত্রিক ফুটবল খেলায় এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা ফিরিয়ে আনে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফুটবল বিশ্ব খুঁজে বেরিয়েছে ‘পরবর্তী ম্যারাডোনা’কে—যে নির্মম তকমাটা থেকে বের হতে খোদ মেসিকেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। আর আজ দুনিয়া খুঁজছে ‘পরবর্তী মেসি’কে। তবে তিনি যা অর্জন করেছেন এবং যেভাবে শিল্পের তুলিতে নিজের ক্যারিয়ারকে সাজিয়েছেন, তা দেখার পর একটা প্রশ্নই মনে জাগে—যার ওপর ‘পরবর্তী মেসি’ হওয়ার চাপ আসবে, তার ওপর প্রত্যাশার বোঝাটা না জানি কত ভয়ঙ্কর হবে!
মাঠে তার প্রতিটি স্পর্শ, ফাঁকা জায়গায় তার অনায়াস মুভমেন্ট আর ঘাসের ওপর রেখে যাওয়া জাদুকরি ছোঁয়া আমাদের এক অনিবার্য সমাপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা আসলে এক অপূর্ব সুরের মূর্ছনার শেষভাগ উপভোগ করছি।
আজ ২৪ জুন, ৩৯ বছরে পা দিয়েও সেই চিরসবুজ কিশোর কেবল খেলেই যাচ্ছেন। যতক্ষণ না মাঠের সবুজ ক্যানভাসকে বিদায় জানানোর সেই অমোঘ ক্ষণটি আসে, যখন তিনি শেষবারের মতো বুটজোড়া তুলে রেখে ফুটবল দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করবেন এবং রূপকথার কোনো অমর রাজ্যে চিরতরে হারিয়ে যাবেন।