৫০ দিন বাকি

সুন্দরতম পরাজয়

রামিন তালুকদার
রামিন তালুকদার

একটি দল ছিল, যারা মাঠে নামলে মনে হতো তারা খেলতে আসেনি, তারা এসেছে এক অদৃশ্য ক্যানভাসে রঙ ছড়াতে। বল তাদের পায়ে থাকত না, যেন তাদের চিন্তার ভেতর দিয়ে বয়ে যেত। প্রতিটি পাস ছিল একেকটি বাক্য, প্রতিটি দৌড় একেকটি ছন্দ, আর প্রতিটি আক্রমণ যেন এক অসমাপ্ত কবিতার পরের লাইন। সেই কবিতার প্রধান কবি ইয়োহান ক্রুয়েফ, যার চোখে খেলা ছিল ভবিষ্যৎ দেখার এক অদ্ভুত ক্ষমতা।

এই দলটি ছিল নিয়ম ভাঙার দল। তারা বলত, ফুটবল কোনো স্থির চিত্র নয়, এটি চলমান এক সঙ্গীত। একজন ডিফেন্ডার সামনে উঠে এসে আক্রমণ গড়ে তুলছে, আর ফরোয়ার্ড নেমে এসে রক্ষণ সাজাচ্ছে। এই অদলবদল, এই নিরন্তর গতিশীলতা যেন সময়ের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করছিল। এর নাম ‘টোটাল ফুটবল’, কিন্তু এর গভীরতা ছিল তার থেকেও বেশি। এটি ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা, যেখানে প্রতিটি খেলোয়াড় নিজেই একটি সম্পূর্ণ বিশ্ব।

এই দর্শনের স্থপতি রাইনাস মিচেলস, যিনি খেলাটিকে এক যান্ত্রিক শৃঙ্খলা থেকে টেনে এনে দিয়েছিলেন এক শিল্পীর স্বাধীনতা। কিন্তু সেই স্বাধীনতা কখনো বিশৃঙ্খলা হয়ে ওঠেনি; বরং তা ছিল এক নিখুঁত সমন্বয়, যেন অর্কেস্ট্রার প্রতিটি যন্ত্র ঠিক সময়ে সুর তুলছে।

১৯৭৪ বিশ্বকাপে এই নেদারল্যান্ডস দল ছিল এক বিস্ময়ের নাম। তারা শুধু ম্যাচ জেতেনি, তারা প্রতিপক্ষের আত্মবিশ্বাস কেড়ে নিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়া তাদের সামনে ছিল অসহায়, আর্জেন্টিনা যেন পথ হারিয়ে ফেলেছিল। আর ব্রাজিল, তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন, তাদের ছায়াও খুঁজে পায়নি। প্রতিটি ম্যাচ যেন এক নতুন রূপকথা, যেখানে ডাচরা ছিল জাদুকর।

তবু রূপকথারও শেষ আছে, কিন্তু সব শেষ সুখের হয় না।

যদিও ফাইনালের বাঁশি বাজার পর প্রথম মিনিটেই ছিল ডাচদের চূড়ান্ত মহড়া। জার্মানির খেলোয়াড়রা বল স্পর্শ করার আগেই, ডাচদের পায়ে পায়ে বল ঘুরল টানা ১৬ বার। যেন তারা কোনো প্রতিপক্ষের সাথে নয়, নিজেদের সাথেই খেলছে এক মোহনীয় পাসিং গেম।

ক্রুইফ যখন বল পায়ে জার্মানির ডি-বক্সে আছড়ে পড়লেন, তখন তাকে আটকাতে গিয়ে ফাউল করে বসা ছাড়া উলি হোনসের আর কোনো উপায় ছিল না। পেনাল্টি। জোহান নেসকেনস যখন বলটা জালে জড়ালেন, ঘড়ির কাঁটায় তখনো দ্বিতীয় মিনিট চলছে। গ্যালারি স্তব্ধ, স্বাগতিকরা হতভম্ব। আর মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে কমলা রঙের দেবতাদের হাসি।

সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এ যেন এক পূর্বনির্ধারিত গল্প, যেখানে শেষ হাসি ডাচদেরই। কিন্তু ফুটবল কখনোই পুরোপুরি কবিতার মতো নয়; সেখানে হঠাৎ করেই গদ্য ঢুকে পড়ে।

জার্মানরা ধীরে ধীরে নিজেদের ফিরে পায়। পল ব্রেইটনার পেনাল্টি থেকে সমতা ফেরান। খেলার গতি বদলে যায়, ছন্দ বদলে যায়। আর তারপর আসে সেই মুহূর্ত। একটি ছোট্ট সুযোগ, এক সেকেন্ডের ফাঁক, যা ধরতে ভুল করেননি জার্ড মুলার। তার শট, তার নিখুঁত অবস্থান। ২-১। সেই গোল যেন এক তীক্ষ্ণ ছুরি, যা ডাচ স্বপ্নকে কেটে দেয় নিঃশব্দে।

পিছিয়ে পড়া ডাচরা দ্বিতীয়ার্ধে মরিয়া হয়ে উঠল। কমলা রঙের ঢেউ বারবার আছড়ে পড়তে লাগল জার্মানির পেনাল্টি বক্সে। কিন্তু সেপ মায়ারের দুর্ভেদ্য দেয়াল আর ভাঙা সম্ভব হলো না। প্রতিটা আক্রমণ যেন পাথরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছিল। সময় যত গড়াচ্ছিল, ডাচদের জাদুকরী পায়ের ছন্দে ততটাই মিশে যাচ্ছিল এক অজানা হাহাকার। মাঠের কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়ছিল এক অসমাপ্ত রূপকথার বিষাদ।

রেফারি জ্যাক টেইলরের শেষ বাঁশি যখন বাজল, ক্রুইফ তখন মাঠের মাঝখানে নিশ্চল দাঁড়িয়ে। কাঁধ দুটি ঝুলে পড়েছে, শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ঘাসের দিকে।

বিশ্বকাপটা উঠেছে ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের হাতে, কিন্তু অদ্ভুত এক নীরবতা গ্রাস করেছে গোটা ফুটবল বিশ্বকে। ডাচরা যেন অন্য এক জগতে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের চোখে প্রশ্ন নেই, অভিযোগ নেই, শুধু এক গভীর নীরবতা, যেন তারা জানে, তারা যা সৃষ্টি করেছে, তা কোনো ট্রফির মাপে মাপা যায় না।

সেদিন জয়ীদের উল্লাসের চেয়ে, পরাজিতদের সেই বিষাদমাখা মুখগুলোই যেন বেশি মোহনীয় হয়ে ধরা দেয় সবার চোখে। ট্রফিটা জার্মানরা জিতলেও, ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়টা চিরতরে কিনে নিয়েছিল ডাচরা।

কারণ সেদিন, তারা শুধু একটি ম্যাচ হারায়নি, তারা জিতেছিল এক অদ্ভুত অমরত্ব।

তাদের জন্য ‘পরাজয়’ শব্দটি ঠিক মানানসই মনে হয় না। বরং মনে হয়, এটি ছিল এক অসমাপ্ত সিম্ফনি, যার প্রতিটি সুর আজও বাতাসে ভাসে।

আর সেই সিম্ফনির নাম, সুন্দরতম পরাজয়।