আরও দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছে বাংলাদেশ: ২ দশকে অতিরিক্ত গরম দিন বেড়েছে প্রায় ৩ গুণ
বাংলাদেশ আগের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। সেইসঙ্গে বাড়তে থাকা এই তাপমাত্রা হয়ে উঠছে আরও বিপজ্জনক।
তাপমাত্রা মানবদেহের জন্য অস্বস্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, বছরে এমন দিনের সংখ্যা গত দুই দশকে প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। ২০০০ সালে বাংলাদেশে ‘অনুভূত’ বা ‘ফিলস-লাইক’ তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছিল প্রায় ৪৬ দিন। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০ দিনে। অর্থাৎ, এমন দিনের সংখ্যা ১৬৩ শতাংশ বেড়েছে।
একই সময়ে এই হার কম্বোডিয়া ছাড়া বিশ্বের আর কোনো দেশে এত বেশি ছিল না।
এমন তাপমাত্রা যে কেবল অস্বস্তিকর তাই নয়, এই মাত্রায় পৌঁছালে মানবদেহের পক্ষে নিজেকে ঠান্ডা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো আর্দ্র পরিবেশে। এর ফলে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যায় এবং অর্থনীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়।

বিশ্বব্যাংকের ক্লাইমেট চেঞ্জ নলেজ পোর্টালের হিট ইনডেক্স এবং ল্যানসেট কাউন্টডাউনের তাপজনিত স্বাস্থ্যসংক্রান্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দ্য ডেইলি স্টার এসব তথ্য পেয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য থেকেও দেখা যায় যে, দেশে তাপপ্রবাহ কতটা তীব্র ও বিস্তৃত হয়েছে। ইতোমধ্যে এ বছর একদিনে দেশের ৪০টি জেলায় তাপপ্রবাহ হয়েছে। দিনটি ছিল গত ২ জুন। এর আগে মৌসুমের ছোট আকারের তাপপ্রবাহও হয়েছে প্রায় এক ডজন জেলায়।
২০২৫ সালে তাপপ্রবাহ আরও বিস্তৃত হয়ে একসঙ্গে ৪৯টি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল ২০২৪ সালে। সে বছর দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫১টিতে তাপপ্রবাহ হয় এবং শুধু এপ্রিলেই রেকর্ড সংখ্যক দিনে তাপপ্রবাহ ছিল।
আবহাওয়া অধিদপ্তর প্রকৃত বায়ুর তাপমাত্রার ভিত্তিতে তাপপ্রবাহ নির্ধারণ করে। টানা দুই বা তার বেশি দিন দৈনিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে সেটা তাপপ্রবাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে ক্লাইমেট চেঞ্জ নলেজ পোর্টালের ব্যবহৃত হিট ইনডেক্স বা অনুভূত তাপমাত্রা নির্ধারণে বায়ুর তাপমাত্রার পাশাপাশি আর্দ্রতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়, যাতে প্রকৃতপক্ষে কতটা গরম অনুভূত হচ্ছে সেটাও বোঝা যায়।
দ্রুত বাড়ছে, ছড়িয়েও পড়ছে
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে তাপঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বৈশ্বিক হিট ইনডেক্সে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা ছিল এমন দিনের সংখ্যায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল চতুর্থ। কেবল বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ছিল বাংলাদেশের আগে। তবে মরুভূমিপ্রধান এসব দেশের বিপরীতে বাংলাদেশের তাপমাত্রা উচ্চ আর্দ্রতার কারণে আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
উচ্চ আর্দ্রতার কারণে বছরের মধ্যে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি অনুভূত তাপমাত্রার দিনের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে (জুন-সেপ্টেম্বর) দেশজুড়ে আপেক্ষিক আর্দ্রতা নিয়মিতভাবে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশে পৌঁছে যায় এবং কখনো কখনো ৯০ শতাংশেও ওঠে। শীত ও প্রাক-বর্ষায় এ হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম থাকে।
ভারী আর্দ্রতার বাতাসে ঘাম সহজে শুকায় না। ফলে শরীরের পক্ষে নিজেকে ঠান্ডা রাখা কঠিন হয়। এর ফলে অনুভূত তাপমাত্রা প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ও বিপজ্জনক হতে পারে।
আর্দ্রতাজনিত তাপের বৈশ্বিক হটস্পট হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। তবে অতীতে এই পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে সহনীয় ছিল। কিন্তু গত ১৫ বছরে চরম তাপমাত্রার দিন বেশি ঘন ঘন আসছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০১০-এর দশকে বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৯১ দিন অনুভূত তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ১০০ দিনেরও বেশি সময় এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে।
দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু তথ্য বিশ্লেষণেও উদ্বেগজনক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। ১৯৫০-এর দশকে বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৩০ দিনেরও কম সময় হিট ইনডেক্স ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করত। পরবর্তী প্রতিটি দশকে এই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং সময়ের সঙ্গে তা বেড়ে এখন প্রায় চারগুণ হয়েছে।
২০১০-এর দশকে এই বৃদ্ধির হার হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। আগের দশকের তুলনায় ২০১০-এর দশকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হিট ইনডেক্সের দিন বৃদ্ধির সংখ্যা ৩০০। ২০২০-এর দশকেও এই ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে। এই দশকে বছরে গড়ে এমন দিনের সংখ্যা প্রায় ১০৮।
আঞ্চলিক চিত্রেও দেখায়, এই পরিবর্তন কতটা বিস্তৃত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই খুলনা বিভাগের তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি। সেখানে ১৯৫০-এর দশকে বছরে গড়ে প্রায় ৫১ দিন অতিরিক্ত তাপমাত্রা থাকলেও ২০২০-এর দশকে তা বেড়ে প্রায় ১৩২ দিনে পৌঁছেছে।
ঐতিহাসিকভাবেই চট্টগ্রাম বিভাগে অন্যান্য বিভাগের তুলনায় তাপমাত্রা কম থাকত। কিন্তু, এখন সেখানেও অতীতের সবচেয়ে উষ্ণ অঞ্চলগুলোর চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রবিউল আউয়াল এই চরম তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য বৈশ্বিক তাপমাত্রার বৃদ্ধিকে দায়ী করেছেন। গতকাল শনিবার দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ জলবায়ু পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী, আগামী কয়েক দশক এই প্রবণতা চলতে থাকবে।’
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি
ল্যানসেট কাউন্টডাউনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রতি ১ হাজার মৃত্যুর মধ্যে চারটির বেশি ঘটেছে তাপমাত্রাজনিত কারণে। আগের ১২ বছরের তুলনায় এই হার ৩৩ শতাংশ বেশি।
বয়স্ক মানুষ এক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের গ্র্যানথাম রিসার্চ ইনস্টিটিউট অন ক্লাইমেট চেঞ্জের ২০২৩ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ১ হাজার ৪৩০ জন তাপজনিত কারণে মারা গেছেন।
চরম তাপমাত্রা হিটস্ট্রোক ও অবসাদ সৃষ্টি করে এবং হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও হাঁপানির মতো রোগকে আরও জটিল করে তোলে। এতে বাইরে কাজকর্ম ও চলাচলও সীমিত হয়ে আসে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে একজন মানুষ বাইরে অবস্থানকালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ দশমিক ২ ঘণ্টা চরম তাপজনিত সমস্যায় পড়েছেন। এই সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল শুধু কম্বোডিয়া।
২০২৪ সালে বিশ্বব্যাংক পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে বিষণ্নতার ঝুঁকি ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং উদ্বেগের ঝুঁকি ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে যায়। নারীরা এক্ষেত্রে বেশি প্রভাবিত হন।
চরম তাপমাত্রার প্রভাব অর্থনীতিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের একই গবেষণা অনুযায়ী, শুধু ২০২৪ সালেই তাপজনিত শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে বাংলাদেশে প্রায় আড়াই ২ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এর অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১৩৩ থেকে ১৭৮ কোটি ডলারের মধ্যে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের সমান। এই ক্ষতির বড় অংশই হয়েছে শ্রম উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে।
ল্যানসেট কাউন্টডাউনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাপজনিত চাপের কারণে বাংলাদেশের একজন শ্রমিক গড়ে প্রায় ৩৯১ কর্মঘণ্টা হারিয়েছেন। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মাত্র ১০টি দেশে এরচেয়ে বেশি বার্ষিক কর্মঘণ্টা ক্ষতি হয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষিশ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ২০২৪ সালে চরম তাপমাত্রার কারণে তারা গড়ে ৭৩২ কর্মঘণ্টা হারিয়েছেন। আট ঘণ্টার কর্মদিবস হিসাব করলে তারা প্রায় ৯২ দিন কোনো কাজ করতে পারেননি। নির্মাণশ্রমিকদের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৮৫ ঘণ্টা এবং সেবাখাতের কর্মীদের প্রায় ১১১ ঘণ্টা।
দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল শ্রমিকের ক্ষেত্রে কর্মঘণ্টা হারানোর অর্থ সরাসরি আয় কমে যাওয়া। উদাহরণস্বরূপ, একজন কৃষিশ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা হলে ৯২ কর্মদিবসের হিসাবে বছরে তার আয় কম হয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার টাকা। মাসের হিসাব করলে প্রতি মাসে তার আয় কম হয়েছে প্রায় ৪ হাজার টাকা।
এ দেশে কোটি কোটি মানুষ দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল। কাজেই এ ধরনের কর্মঘণ্টা হারানোর অর্থ হলো, তাদের পারিবারিক আয় কমে যাবে এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
গতকাল ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় ৫০ থেকে ৬৫ বছর বয়সী চারজন রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য ডেইলি স্টার। তারা জানিয়েছেন, চরম গরমের সময় যাত্রী পরিবহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে, এমন দিনে তারা কম যাত্রী পরিবহন করতে পারেন এবং তাদের কর্মঘণ্টাও কমে যায়।
সাক্ষাৎকার দেওয়া রিকশাচালকদের একজন মোহাম্মদ আজাদ বলেন, ‘গরমের মধ্যে প্রতিবার যাত্রী টানার পরই আরাম করা লাগে। যেদিন গরম বেশি থাকে, সেদিন যাত্রীও কম টানতে পারি। আয়ও ২০০-৩০০ টাকা কম হয়।’
উদ্বেগজনক পূর্বাভাস
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দশকগুলোতে বাংলাদেশে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হিট ইনডেক্সযুক্ত দিনের সংখ্যা আরও বাড়বে। মাঝারি বা ‘মিডল-অব-দ্য-রোড’ জলবায়ু পরিস্থিতির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রতি বছর এ ধরনের অতিরিক্ত ৩২টি দিন দেখা যেতে পারে। এই পূর্বাভাসে ধরা হয়েছে, সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন মধ্য শতাব্দী পর্যন্ত অতীতের ধারা অনুসরণ করবে এবং এরপর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে।
এমনকি পরিস্থিতি সবচেয়ে ভালো হলেও, অর্থাৎ ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্ব নেট-শূন্য কার্বন নির্গমনে পৌঁছালেও বাংলাদেশে বছরে অন্তত অতিরিক্ত ২৩ দিন তাপমাত্রা থাকবে ৩৫ ডিগ্রির বেশি। আর জীবাশ্ম জ্বালানির এমন উচ্চমাত্রার ব্যবহার একইভাবে চলতে থাকলে এই সংখ্যা ৪১ দিন পর্যন্ত বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে। এই শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত খুলনা সবচেয়ে বেশি তাপপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু, এরপর বরিশাল অঞ্চল খুলনাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০৮০-এর দশকে এই দুই বিভাগেই বছরে প্রায় ২০০ দিন চরম তাপমাত্রা অনুভূত হতে পারে।
এর জন্য শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি নয়, আর্দ্রতাও বড় ভূমিকা রাখছে। খুলনা ও বরিশালে বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বাড়তে থাকায় ‘অনুভূত’ তাপমাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে এবং এর ফলে গরম আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
এর কারণ কী
ল্যানসেট কাউন্টডাউনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে রেকর্ড হওয়া ৮৬টি তাপপ্রবাহের মধ্যে ৫১টির জন্য দায়ী জলবায়ু পরিবর্তন। বাংলাদেশে চরম তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে চিহ্নিত করা হলেও বিশেষজ্ঞরা ও গবেষণা বলছে, স্থানীয় কারণগুলোরও এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
যেমন: দ্রুত নগরায়ণ তাপমাত্রার প্রভাব বাড়িয়ে দিচ্ছে, বিশেষ করে ঢাকার মতো শহরে। কংক্রিটের ভবন, সড়ক ও অবকাঠামো তাপ শোষণ করে ধরে রাখছে। ফলে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ নামে পরিচিত একটি প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে শহরগুলো আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় অনেক বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে আগের তুলনায় দ্রুত হারে বৃক্ষ-আচ্ছাদিত জায়গাও কমে যাচ্ছে।
গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বছরে গড়ে ১০ হাজার ৯০৬ হেক্টর বনভূমি হারিয়েছে। প্রতিবছর এই পরিমাণ বেড়েই চলেছে। ২০০০-এর দশকে যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ হাজার ৩৯৪ হেক্টর, ২০২০-এর দশকে সেটা ১৭ হাজার হেক্টরেরও বেশি হয়েছে।
বন উজাড়ের প্রভাবে এক বছরের মধ্যে সরাসরি তাপমাত্রা বেড়ে না গেলেও দীর্ঘমেয়াদে বৃক্ষ-আচ্ছাদিত এলাকা কমে যাওয়ায় দেশের প্রাকৃতিক শীতলীকরণ ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে সময়ের সঙ্গে তাপমাত্রার তীব্রতা বাড়ছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের পরিচালক গোলাম রব্বানী বলেন, মানবিক ও শিল্প কার্যক্রম বৃদ্ধির সঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতাও দেখা যায়।
গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘নিঃসন্দেহে নগরায়ণের কারণে স্থানীয় তাপমাত্রা প্রভাবিত হয়। শিল্প কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, যানবাহন বৃদ্ধি, ঘনবসতিপূর্ণ নির্মাণকাজ ও জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি—সবকিছুই নগর পরিবেশে অতিরিক্ত তাপ যোগ করে।’
তিনি বলেন, শহরের বিভিন্ন এলাকায় এসব কার্যক্রমের মাত্রা ভিন্ন হওয়ায় শেরেবাংলা নগর, ফার্মগেট ও যাত্রাবাড়ীর মতো এলাকার তাপমাত্রাও আলাদা আলাদা হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘বন উজাড়ের ফলে ইভাপোট্রান্সপিরেশন বা বৃক্ষ ও উদ্ভিদের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা নিঃসরণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কমে যায়। এগুলো সাধারণত আশপাশের পরিবেশকে শীতল রাখতে সাহায্য করে। সবুজ আচ্ছাদন কমে গেলে এই শীতলীকরণ প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাপমাত্রা আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।’